হরসুন্দরী প্রতি কথায় বলেন, তোমার মেয়ে নেই মা বাঁচোয়া। নিজের মেয়েদের প্রতি দুরন্ত অভিমানের বশেই হয়তো বলেন, কিন্তু তিনি কেমন করে বুঝবেন তার এই সান্ত্বনাবাক্যে অতসীর বুকের ভিতরটা কী তোলপাড় করে ওঠে, জননীহৃদয়ের সমস্ত ব্যাকুলতা কেমন করে ষাট ষাট করে ওঠে।
সারাদিনের বেঁধে রাখা মন রাতে বাঁধ মানে না। নিঃশব্দ ক্রন্দনে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলতে চায়।
আলাদা চৌকীতে সীতু।
ঘরে জায়গা কম, এ চৌকী যতটা স্বল্পপরিসর হওয়া সম্ভব ততটা স্বল্প, পাশ ফিরতে পড়ে যাবার ভয়। তবু রাত্রির অন্ধকারে অতসীর মনে হয় যেন তার কোলের কাছে একটা বিশাল শূন্যতা! সেই শূন্যতা অতসীকে গ্রাস করে ফেলতে চাইছে, অদৃশ্য দাঁত দিয়ে অতসীকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাইছে।
বুকের মধ্যেটা মুচড়ে মুচড়ে ওঠে। সর্বশরীরে সেই মোচড়ানির যন্ত্রণা অনুভব করে অতসী। যেন দেহের কোথাও ভয়ঙ্কর একটা আঘাত করতে পারলে কিছুটা উপশম হবে। চীৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে তার। চীৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, খুকু খুকু, তোর মা নেই। তোর মা মরে গেছে, বুঝলি?
মৃগাঙ্ক কি খুকুকে নিজের কাছে নিয়ে শোন?
ঝাপসা করে এইটুকু শুধু ভাবতে পারে অতসী, এর বেশি নয়। মৃগাঙ্কর কথা ওর থেকে বেশি ভাববার ক্ষমতা অতসীর নেই।
ভয়ঙ্কর ক্ষতের দৃশ্যটা যেমন ঢাকা দিয়ে রাখতে চায় মানুষ, দেখতে পারে না, তেমনি সেই ভয়ঙ্কর চিন্তাটাকে সরিয়ে রাখে অতসী, ঢেকে রাখে আতঙ্ক দিয়ে।
শুধু রাত্রে যখন সীতু ঘুমিয়ে পড়ে, যখন আবছা অন্ধকারে ওর রোগা পাতলা ছোট্ট দেহটাকে একটা বালক ছাড়া আর কিছু মনে হয় না, তখন তীক্ষ্ণ অস্ত্রাঘাতের মত একটা প্রশ্ন অতসীকে কুরে কুরে খায়–আমি কি ভুল করলাম? আমার কি আরও ধৈর্য ধরা উচিত ছিল?
কিন্তু ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করবার মত অবস্থা কি ঘটে নি?
.
সকাল হতে না হতেই সমস্ত চিন্তা আর সমস্ত প্রশ্নে যবনিকা টেনে দিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটতে হয় মনিববাড়ি। ছটার মধ্যে গিয়ে পৌঁছতে না পারলেই অনুযোগ সুরু করে বুড়ি, আজ তোমার এত দেরি যে আতুসী? কতক্ষণে মুখ ধোওয়াতে আসবে বলে রাত থেকে দুয়োরের পানে তাকাচ্ছি। দেরি না হলেও অনুযোগটা তার উদ্যত।
অনিদ্রা রোগীর রাত বড় দীর্ঘ। সকালের আলোের আশায় পলক গোনে সে।
অতসী তর্ক করে না, প্রতিবাদ করে না, এই একটু দেরি হয়ে গেল দিদিমা। উঠুন, মুখ ধুয়ে নিন। বলে তৎপরতা দেখায়।
তারপর কাজ আর কাজ।
মুখ ধোওয়ান, বিশুদ্ধ কাপড় পরিয়ে তাকে জপ আহ্নিক করতে বসানো, নিজে স্নান করে এসে তবে তাকে খাওয়ানো, ওষুধ খাওয়ান। ঠিক রোগী নয়, বলতে গেলে রোগটা জরা, তবু ওষুধ খেতে ভালবাসেন চক্রবর্তী গিন্নী। ভালবাসেন সেবা খেতে। তাই হাত খালি হলেই তেল মালিশ করতে হয় বসে বসে। আর বসে বসে শুনতে হয় তার ছেলের প্রশংসা আর ছেলের বৌয়ের নিচ্ছে। এই শোনাটাও একটা বিশেষ কাজ।
এই কাজ আর অকাজের অবিচ্ছিন্ন ধারার মধ্যে তলিয়ে থাকে চিন্তা ভাবনা। মনে করবার অবকাশ থাকে না অতসী কে, অতসী কি, অতসী এখানে কেন। যেন এই খামখেয়ালি বড়লোক বুড়ির খাস পরিচারিকা, এইটাই অতসীর একমাত্র পরিচয়।
মানুষটা খিটখিটে নয়, এইটুকুই পরম লাভ। মিষ্টিমুখে সারাক্ষণ খাঁটিয়ে নেন। মালিশ হলেই বলেন, অ আতুসী, মালিশের তেলের হাতটা ধুয়ে দুটো পান ছাচ দিকি খাই। পান ছাচা হলেই বলবেন, আতুসী দেখ তো বিছানায় পিঁপড়ে হয়েছে না ছারপোকা? চব্বিশ ঘণ্টা কী যে কামড়ায়।
সন্ধ্যাবেলা সব মিটে গেলে, চলে যাবার সময় পর্যন্ত ডাক দেন, আতুসী, মশারীটা ভাল করে খুঁজেছ তো? কাল যেন একটা মশা ঢুকেছিল মনে হচ্ছে।
আসল কথা সারাক্ষণ একটা মানুষের স্পর্শ আর সান্নিধ্যের লোভ! সংসার যার পাওনা চুকিয়ে দিয়েছে, অবস্থা যাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে, তার হয়তো এমনিই হয়। মানুষের সঙ্গ লালসা, এমনিই চক্ষুলজ্জাহীন করে তোলে তাকে। এই কাজের জগতে বার্ধক্যকে সঙ্গ দেবে এমন দায় কার? তাই ওই সঙ্গ দেওয়াটাই যার ডিউটি, তাকে পুরো ভোগ করে নিতে চান চক্রবর্তী গিন্নী সুরেশ্বরী।
আবার ভাল কথাও বলেন বইকি!
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অতসীর জীবনকাহিনী শুনতে চান তিনি, চান আহা করতে। চান অতসীর আত্মপরিজনকে কটুবাক্যে তিরস্কার করতে। বলেন, এই বয়সে, এই ছবির মতন চেহারা, কোন প্রাণে তারা একলা ছেড়ে দিয়েছে। এই যাই ভাল আশ্রয়ে এসে পড়েছ তাই রক্ষে। নইলে কার খপরে যে পড়তে! আবার বলেন, ছেলেকে তো কই একদিন আনলে না আতুসী! দেখতে চাইলাম!
অতসী বলে, আসবে না দিদিমা। বড় লাজুক।
সুরেশ্বরী বলেন, আহা আসতে আসতেই লজ্জা ভাঙবে। আনলে চাইকি আমার আনন্দর নেকনজরে পড়ে যেতে পারে। তখন তোমার ওই ছেলের বই খাতা জুতো জামা কোন কিছুর অভাব হবে না। আনন্দর যে আমার বড় মায়ার শরীর, গরীবের দুঃখ একেবারে দেখতে পারে না।
অতসী কাঠের মত শক্ত হয়ে যাওয়া হাতে অভ্যস্ত ভঙ্গীতে মালিশ চালিয়ে যায়, আর সহসা এক সময় বলে ওঠেন সুরেশ্বরী, কাজ করতে করতে থেকে থেকে তোমার যে কী হয় আতুসী, যেন কোথায় আছে মন কোথায় আছে দেহ। একটু মন দাও বাছা। মাস গেলে কম গুলি করে তো গুনতে হয় না আমার আনন্দকে, এই বুড়িমার আরাম স্বস্তির জন্যে!
