হ্যাঁ, এটুকু স্পষ্ট কথা তিনি বলেন। নিজের গৌরব গরিমা বাড়াতেই বলেন।
তা এটুকু না সইলে চলবে কেন?
উদয়াস্ত খিটখিট করলেই কি সইতে হত না? মনিব খিটখিটে বলে একশ পঁচিশ টাকার চাকরিটা ছেড়ে দিত? তাই কেউ দেয়? ঘরে যার ভাত নেই?
ওদিকে এদিক ওদিক থেকে সুরেশ্বরীর ছেলের বৌয়ের সঙ্গে চোখোচোখি হয়ে গেলেই তিনি হাতছানি দিয়ে ডেকে সহাস্যে বলেন, কেমন কাজ চলছে?
অতসী মৃদু হেসে বলে, ভাল।
তা ভাল না বলে আর উপায় কি। বলি এক মিনিট বসতে শুতে পাও কোনদিন? ইস তা আর নয়, ওই চীজটিকে আমার জানতে বাকী আছে কিনা। চব্বিশ ঘণ্টা খালি ফরমাস আর ফরমাস। বাবাঃ! তা বাপু আমি মুখফেঁড় মানুষ বলে ফেলি। এমন চেহারাখানি তোমার, এমন মিষ্টি মিষ্টি গলা, তুমি মরতে এই অখদ্যে কাজ করতে এলে কেন? সিনেমায় নামলে লুফে নিত।
অতসী উত্তর দেয় না, শুধু কান দুটো যে তার কত লাল হয়ে উঠেছে সেটা নিজেই অনুভব করে।
ভদ্রমহিলা আবার হেসে হেসে বলেন, একটা তো ছেলেও আছে তোমার শুনেছি। তোমার মতনই সুন্দর হবে নিশ্চয়। মায়ে ছেলেয় নেমে পড়। আজকাল ছোট ছেলের চাহিদা ও লাইনে খুব। হাড়ির হাল থেকে রাজার হাল হবে। নইলে এই দাসীবৃত্তি করে ছেলেকে আর কতই মানুষ করে তুলতে পারবে? তার চাইতে ও লাইনে অগাধ পয়সা।
অতসী মৃদুস্বরে বলে, আপনারা হিতৈষী, আপনারা অবিশ্যি যা ভাল তাই বলবেন, দেখব। ভেবে।
হিহি করে হাসেন ভদ্রমহিলা আর বলেন, তোমার মতন অবস্থা আমার হলে ওসব ভাবাভাবির ধার ধারতাম না, কবে গিয়ে হিরোইন হতাম। ভাল থেকে হবেটা কি? কেউ তোমায় ভাত দেবে, না সামাজিক মানমর্যাদা দেবে?
ভদ্রমহিলার মতবাদকে অযৌক্তিক বলা যায় না।
না, তুমি ছাড়া আপনি এবাড়িতে কেউ বলে না অতসীকে। বাসনমাজা ঝিটাও বলে, তুমি আবার এখন কলে পড়তে এলে? সরো বাপু সরো, আমায় বাসন কখানা ধুয়ে নিতে দাও আগে।
সুরেশ্বরীর চা দুধ খাওয়া পাথরের বাটি গেলাস অতসীকেই মেজে নিতে হয়, সুরেশ্বরীর নির্দেশ। সেই দুটো হাতে করে অপেক্ষা করতে হয়ে অতসীকে যুগযুগান্তর কলের আশায়।
সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরে কোনদিন দেখে সীতু আধময়লা বিছানাটায় গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কোনদিন দেখে হ্যারিকেনের আলোর সামনে রক্তাভ চক্ষু মেলে পড়া করছে। বেশিক্ষণ পারে না তখুনি গুটিয়ে শুয়ে পড়ে। লাইট নেই।
বারো টাকা ভাড়া ঘরে লাইট থাকে না। ওই দামে কোঠা ঘর পাওয়া গেছে এই ঢের।
অতসী এসে কাপড় ছাড়ে, হাত পা ঘোয়, উনুনে আগুন দিয়ে রুটি তরকারি করে ডাক দেয়, সীতু ওঠ, খাবার হয়েছে।
সীতু আস্তে আস্তে উঠে খেতে বসে।
না বসে উপায়ই বা কি?
খিদেয় যে পাকযন্ত্র শুদ্ধ পরিপাক হয়ে থাকে। ইস্কুল থেকে এসে কে হাতের কাছে খাবার জুগিয়ে দেবে?
অতসী মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলে, কৌটায় মুড়ি থাকে, নাড়ু থাকে, পাঁউরুটি আনা থাকে, কিছু খাস না কেন সীতু?
সীতু গম্ভীর ভাবে বলে, খিদে পায় না।
এমনি করে কাটে দিন আর রাত্রি।
.
কয়েকটা মাস গড়িয়ে যায়।
সুরেশ্বরী আর একটু অপটু হতে থাকেন। আর সুরেশ্বরীর ছেলের বৌ রোজ একবার করে অতসীকে প্ররোচনা দেন-ছেলেকে সিনেমায় না দিলে তোমার কাছে এখানেই নিয়ে এসে রাখো না। সারাদিন তোমার চোখে চোখে থাকবে।
অবশেষে একদিন অতসীকে সুরেশ্বরীর কাছ থেকে আড়ালে ডেকে আসল কথাটা পাড়ে সুরেশ্বরীর ছেলের বউ, কই গো, তোমার ছেলেকে একদিন আনলে না?
অতসী একবার ওই মদগর্বমণ্ডিত মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নীচু করে বলে, ছেলে লাজুক, আসতে বললে আসতে চাইবে না।
বাঃ, দিব্যি তো কথা এড়াতে পারো তুমি! বউ যেন ঝাঁজিয়ে ওঠে, আসতে বললে আসতে চাইবে কি না চাইবে, আগে থেকেই বুঝছ কি করে?
অতসী চোখ তুলে মৃদু হেসে বলে, ছেলে কি চাইবে না চাইবে মায়ে বুঝতে পারে বইকি।
হু। ভদ্রমহিলার মুখখানি থমথমে হয়ে ওঠে। বোধকরি তার সন্দেহ হয় শাশুড়ির নার্সের এটি তার সন্তানহীনতার প্রতি কটাক্ষপাত। কিন্তু এখন একটি মতলব নিয়ে কথা সুরু করেছে সে, প্রথম নম্বরেই মেজাজ দেখিয়ে কাজ পণ্ড করলে লোকসান। তাই আবার কষ্টে মুখে হাসি টেনে বলে, আহা, বেড়াতে আসার নাম করে.ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে আসবে একদিন। মানুষের বাড়ি মানুষ বেড়াতে আসে না?
অতসী কষ্টে মৃদু হেসে বলে, তা একদিন নিয়ে এসেই বা লাভ কি?
যাক আলোচনাটা অনুকূলে আসছে, বউ হৃষ্ট হয়ে ওঠে। মুচকি হেসে বলে, একদিন থেকেই চিরদিন হয়ে যেতে পারে, আশ্চর্য কি!
অতসী একথার অর্থ গ্রহণে অক্ষম হয়েই বোধকরি চুপ করে চেয়ে থাকে।
সুরেশ্বরীর ছেলের বৌ, যার নাম নাকি বিজলী, সে ঠোঁটের কোণে একটু বিজলীর চমক খেলিয়ে বলে ওঠে, তুমি বাবু বড় বেশি সরল, কোন কথা যদি ধরতে পারো। বলছিলাম তুমি তো ওই হরসুন্দরী বামনীর ভাড়াটে। যা বাহারের বাড়ি তার, দেখেছি তো! সেই ভাঙা ঘরেরও কোন না পাঁচ সাত টাকা ভাড়া নেয়, সেখানে ওই ভাড়া গুনে নাই বা থাকলে? এখানে আমার এতবড় বাড়ি, নীচের তলায় কত ঘরদোর পড়ে, ছেলে নিয়ে অনায়াসে এখানে এসে থাকতে পারো।
তাই কি আর হয়! বলে কথায় যবনিকা টেনে চলে যেতে উদ্যত হয় অতসী। কিন্তু বিজলী তাকে এখন ছাড়তে রাজী নয়, তাই ব্যগ্রভাবে বলে, দাঁড়াও না ছাই একটু। বুড়ি আর তোমাবিহনে এক্ষুনি গলা শুকিয়ে মরছে না। তাই কি আর হয় বলছ কেন? এতে তো তোমারই সুবিধে, আর–গলা খাটো করে বিজলী আসল কথায় আসে, দুদিক থেকেই তোমার হাতে কিছু পয়সা হয়। ঘরভাড়াটা বাঁচে, আর তোমার ছেলে যদি বাবুর ফাই-ফরমাসটা একটু খাটতে পারে তাতেও পাঁচ সাত টাকা–।
