অতসী সান্ত্বনাৰ্থে বলে, তখন কি আর আপনার মেয়েরা আসবেন না?
আসবে। মায়ের এই ইটকাঠটুকুর ভাগ বুঝতে আসবে। আর এসে তিন বোনে ঝগড়া করবে আমি একা কেন করব বলে। মেয়ে সন্তান পরের মাটি দিয়ে গড়া মা! তোমার মেয়ে নেই রক্ষে।
অতসী কষ্টে গলায় স্বর এনে বলে, ওদের সঙ্গে আপনি কথা বলুন মাসীমা, আমি করতে রাজি আছি।
হরসুন্দরী ইতস্তত করে বলেন, অবিশ্যি নার্সের কাজ বলতে যা বোঝায় তার সবই করতে হবে বাছা। তবে কিনা জাতে বামুন–
অতসী দৃঢ়স্বরে বলে, জানে বামুন হোন কায়েত হোন, কিছু এসে যায় না মাসীমা, কাজ করব বলে যখন প্রস্তুত হয়েছি, তখন সবই করব।
হরসুন্দরী সপুলকে বলেন, তবে তাদের তাই বলিগে?
হঠাৎ জানলার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে থাকা ছোট মানুষটা ছিটকে এদিকে মুখ ফিরিয়ে চীৎকার করে ওঠে, না, বলবে না।
বলব না? হরসুন্দরী হকচকিয়ে যান।
না না! তোমার এখানে আসার এত কি দরকার?
সীতু!
তীক্ষ্ণ তীব্র গলায় একটি সম্বোধন করে অতসী। যেমন গলায় বোধকরি কোনদিনই সীতুকে ডাকে নি। মৃগাঙ্কর সংসারে সীতুকে নিয়ে অনেক যন্ত্রণা ছিল অতসীর, কিন্তু সীতুকে শাসনের বেলায় কোথায় যেন কানায় কানায় ভরা ছিল অভিমানের বাষ্প, তাই কখনো গলায় এমন নীরসতার সুর বাজে নি।
সীতু মাথা নীচু করে ফের জানলায় গিয়ে বসে। সে জানলার সঙ্গে তার অস্ফুট স্মৃতির কোথায় যেন একটা মিল আছে। জানলার ওপিঠটা একটা সরু পচা গলি, বছরে দুদিন সাফ হয় কিনা সন্দেহ, দুদিকের বাড়ির আবর্জনা পড়ে পড়ে জমা হতে থাকে।
এ বাড়িতে উঠোনের মাঝখানে চৌবাচ্চাও একটা আছে, আর কলের মুখে লাগানো নল বেয়ে জল পড়ে পড়ে সেটা ভরতে থাকে সারাদিনে। সীতুর স্মৃতির সঙ্গে অনেক কিছু মিল আছে এ বাড়ির।
কিন্তু সীতু?
সে কি তবে এতদিনে স্থির হয়েছে, সন্তুষ্ট হয়েছে? তার বিদ্রোহী মন শান্ত হয়েছে?
এসে পর্যন্ত তেমনি এক অবস্থাতেই ছিল সীতু। মা ডেকেছেন সীতু খাবে এসো, সীতু নিঃশব্দে উঠে এসে খেয়েছে। মা বলেছে সীতু বেলা হয়ে যাচ্ছে ওঠ, এর পরে আর কলতলা খালি পাবে না, সীতু উঠে গিয়ে সেই পাঁচ শরিকের কলের থেকে মুখ ধুয়ে এসেছে। কোন প্রতিবাদ কোন দিন ধ্বনিত হয়নি তার কণ্ঠ থেকে।
আজ সীতুর গলায় সেই পুরনো তীব্রতা ঝলসে উঠল।
অতসী হরসুন্দরীর দিকে চোখ টিপে ইশারায় বলে, ওর কথা ছেড়ে দিন, আপনি ব্যবস্থা করুন।
হরসুন্দরী বোঝেন–বালক ছেলে, মাকে ছেড়ে থাকার কথায় বিচলিত হয়েছে। পরম আনন্দে তিনি চক্রবর্তী গিন্নীর কাছে সুখবর দিতে ছুটলেন। বুড়ি এমনি একটি ভদ্র গৃহস্থঘরের মেয়ের জন্যেই হা-পিত্যেশ করে বসে আছে। হরসুন্দরী জোগাড় করে দেওয়ার গৌরবটা নেবেন।
.
সারাদিন নর্দমার ধারে বসে বসে স্বাস্থ্যটা নষ্ট করে কোন লাভ আছে?
অতসীর এই প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই সীতু জানলা থেকে নেমে এসে ঘরের প্রায়ান্ধকার কোণে পাতা চৌকীটায় গিয়ে বসে।
অতসী বলে, কাল তোমায় স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে যাব। হেডমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছি আমি, ওপরের মাসীমার তিনি চেনা লোক, কাজেই ভর্তি হতে বেশি অসুবিধে হবে না। তবে একটি কথা তোমাকে শিখিয়ে রাখছি সত্যি কথা নয়, মিথ্যা কথা। হ্যাঁ, এখন অনেক মিথ্যা কথা তোমায় শেখাতে হবে আমাকে, বলতে হবে নিজেকে। নইলে কোথাও টিকতে পাব না। তুমি বলবে, এর আগে তুমি কোন স্কুলে পড় নি, বাড়িতে মায়ের কাছে পড়েছ। মনে থাকবে? বলতে পারবে? স্কুলে পড়েছিলে জানতে পারলেই এ স্কুল তোমার পুরনো স্কুলের সার্টিফিকেট চাইবে। জিজ্ঞেস করবে, কেন ছেড়ে এসেছ? সেখানের রেজাল্ট দেখি। তা হলে কি বিপদে পড়বে বুঝতে পারছ? সে স্কুলে তোমার নাম সীতেশ রায় নয়, সীতেশ মজুমদার, তা মনে আছে বোধ হয়? কি কাজের কি ফল তোমাকে বোঝাবার বয়স নয়, কিন্তু তুমি বুঝতে পারো, বুঝতে চাও, তাই এত করে বুঝিয়ে শিখিয়ে রাখলাম। আর যা করো করো, দয়া করে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট কোর না।
আমিও ভুলে যেতে চেষ্টা করব রায় ছাড়া আর কোনদিন কিছু ছিলাম আমি, ভুলেও যাব আস্তে আস্তে। যাক আরও একটা কথা শোনোপরশু থেকে আমি মাসীমার দেওয়া সেই কাজে ভর্তি হবো। তোমাকে সকালবেলা স্কুলের ভাতটা মাসীমার কাছেই খেতে হবে। সেই ব্যবস্থাই করেছি।
আমি খাব না।
সীতেশের গলায় বিদ্রোহ। কিন্তু সে বিদ্রোহে কি আর্দ্রতার ছোঁয়া?
অতসী নরম গলায় বলে, খাব না বললে তো রোজ চলবে না, একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে।
তুমি ওপরের বুড়ির কথা শুনলে কেন? ওই বিচ্ছিরি কাজ নিলে কেন?
অতসী মৃদু হেসে বলে, বিচ্ছিরি ছাড়া সুচ্ছিরি কাজ কে আমায় দেবে বল? আমি কি বি. এ., এম. এ., পাশ করেছি? আর কাজ না করলে
না না না, তুমি কাজ করবে না। তুমি ঝি হতে পাবে না। বলে সহসা জীবনে যা না করে সীতু, তাই করে বসে। উপুড় হয়ে পড়ে উথলে উথলে কেঁদে ওঠে।
নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থাকে অতসী, সান্ত্বনা দিতে ভুলে যায়। অমনি করে উপুড় হয়ে পড়ে কেঁদে ভাসাবার জন্যে তার অন্তরাত্মাও যে আকুল হয়ে উঠেছে।
খুকু খুকু! খুকুমণি! কতদিন তোকে দেখি নি আমি! কী করছিস তুই মা মরা হয়ে গিয়ে। কে তোকে খাওয়াচ্ছে খুকু, কে ঘুম পাড়াচ্ছে? মা মা করে খুঁজে বেড়ালে কী বলছে তোকে ওরা? মা নেই, মা মরে গেছে। মা চলে গেছে, আর আসবে না! শুনে কেমন করে কেঁদে উঠছিস তুই খুকু সোনা। খুকু তুই কেমন আছিস? খুকু তুই কি আছিস?
