পরদিন প্রেসে পৌঁছেই রতন লাইনো বিভাগে গেল। অমিয় তখন কাজে ব্যস্ত। মুখ তুলে একবার তাকাল শুধু।
‘অমিয়দা একটা খুব দরকারি কথা ছিল। টিফিনে চায়ের দোকানে আসবে?’
‘যাব।’
সঞ্জিতবাবুর চায়ের দোকানে রতন আগেই গিয়ে কোণের টেবলে বসেছিল। অমিয় আসতেই সে হাত তুলে জানান দিল।
‘কী দরকার বল।’ অমিয় মুখোমুখি বসে বলল।
রতন তৈরিই ছিল। কীভাবে শুরু করবে মনে মনে এতক্ষণ সেটাই হাতড়ে গেছে। যেভাবে বিয়েটা হল তা শুনলে অমিয়দা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে। মিথ্যা কথা তাকে বলতেই হবে। সেটাই সে সকাল থেকে বারবার বানাবার চেষ্টা করেছে। চায়ের দোকানে বসেও ভেবেছে বটতলার বিয়ের কথাটা তাকে চেপে যেতে হবে।
‘অমিয়দা, সেদিন আমার সঙ্গে যে মেয়েটাকে দেখেছিলে-‘
‘তাকে বিয়ে করবি তো?’
‘হ্যাঁ…মানে করে ফেলেছি।’
অমিয় অবাক হয়ে রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘হঠাৎই, কাউকে বলার সময়ই পেলুম না।’
‘কবে করলি?’
‘পরশু।’
‘রেজিস্ট্রি করে?’
‘হ্যাঁ।’ রতন হাঁফ ছাড়ল। রেজিস্ট্রির কথাটা একদমই তার মনে আসেনি। বটতলা আর রেজিস্ট্রিতে তফাতই বা কী! পুরুত আর সাক্ষীরা তো ছিলই।
‘তা হঠাৎ রেজিস্ট্রি কেন, বাড়িতে গোলমাল?’
‘হ্যাঁ, অন্য জাত বলে বাড়িতে রাজি হয়নি, মেয়ের বাড়ির লোকেরা ওর অন্য জায়গায় বিয়ে প্রায় পাকা করে ফেলেছিল। তাই আর দেরি করলুম না। কিন্তু মুশকিল হয়ে শিবিকে এখন রাখব কোথায়?…কম ভাড়ায় যা হোক একটা ঘর দেখে দাও না অমিয়দা। আমার অবস্থা তো জানো। রতন টেবলে রাখা অমিয়র হাত চেপে ধরল।’
‘বাড়ি ছাড়বি?…কিন্তু ঘর তো বলামাত্র পাওয়া যায় না। খোঁজ করতে হবে, লোকজনকে বলতে হবে।’
‘তুমি একটু চেষ্টা করলেই হবে অমিয়দা, এখুনি না পেলে শিবি বড়ো বিপদে পড়ে যাবে। বিয়ের কথা এখনও কেউ জানে না। জানাজানি হয়ে গেলে কী যে হবে!’
‘তোর বাজেট কত?…সেইমতো খোঁজ নিতে হবে তো।’
‘হাজার তিনেক।’
মুখ বাঁকাল অমিয়। ‘অত কম টাকায় সেলামিটেলামি দিয়ে ভালো জায়গায় কী ঘর পাওয়া যায়!’
‘দরকার নেই ভালো জায়গার, মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই এখুনি চাই। টিনের চাল, খোলার চাল যেমনই হোক।’
‘আচ্ছা দেখি, জানিসই যখন বাড়িতে এ বিয়ে মেনে নেবে না তখন আগে থেকে বাসা ঠিক করিসনি কেন? নতুন বউকে নিয়ে কোথায় আরাম করে থাকবি, তা নয় টিনের চাল খোলার চালের ঘরের কথা মুখে আনছিস। বউমা থাকতে পারবে?’
‘ও বলেছে ঝুপড়ি বস্তি সব ওর কাছে রাজপ্রাসাদ।’
‘হুঁ।’ অমিয় আবার মুখ বাঁকাল।
ছদিন পর অমিয় চায়ের দোকানে রতনকে ডেকে পাঠাল।
‘শোন, একটা ঘরের খবর পেয়েছি, পাশের পাড়া হরনাথ লেনে। রোববার সকালে আমার সঙ্গে বাড়িতে দেখা করবি, সঙ্গে করে নিয়ে যাব। বাড়িওলা দোতলাতেই থাকে, মুখোমুখি কথা বলে নিবি অবশ্য ঘর যদি পছন্দ হয়।’
‘তুমি ঘর দেখেছ?’
‘না।’
‘কত চেয়েছে?’
‘বলেনি কিছু। তবে একটা কথা আগেই বলে রাখি, ঘরটার বদনাম আছে।’ অমিয় স্থির দৃষ্টিতে রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে ধরে রেখে বলল,
‘তুই ভূতে বিশ্বাস করিস?’
রতন অবাক হয়ে বলল, ‘না। এ কথা বলছ কেন?’
‘ঘরটা আট মাস খালি পড়ে আছে, কেউ ভাড়া নিতে চায় না। যে লোকটা থাকত তার লিভারে ক্যানসার হয়, বউ ছিল, আর একটা আলু পেঁয়াজের দোকান মানিকতলা বাজারে। ক্যানসার জানিস তো কর্কট রোগ, অসহ্য যন্ত্রণা হয়। ট্রিটমেন্ট করতে গিয়ে দোকানটা বেচে দেয়। একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়, শেষকালে সহ্য করতে না পেরে লোকটা গলায় দড়ি দেয় রাতে রান্নার জায়গায়। ভোরে ঝুলন্ত বডি দেখে বউ লোকজন না ডেকে নিঃসাড়ে কোথায় যে চলে যায় কেউ আজ পর্যন্ত তার হদিশ করতে পারেনি।’ কথাগুলো বলে অমিয় চা খাওয়ায় মন দিল। রতনের শুনতে খারাপ লাগছিল এইভাবে মারা যাওয়ার কথা শুনে।
‘খুব কষ্ট পেয়ে মারা গেছে।’ বিষাদ মাখানো স্বরে সে বলল,
‘লোকটার শ্রাদ্ধশান্তি হয়নি, গয়ায় পিণ্ডি দেওয়াও হয়নি। পাড়ার লোক বলে ঘরে প্রেত আসে, মাঝেমাঝে দরজা খোলা আর বন্ধের আওয়াজ শোনা যায়। বউকে খুব ভালোবাসত তাই নাকি খুঁজতে আসে। পাড়ার একটা লোক পরীক্ষা করতে এক রাত ঘরে কাটিয়ে ছিল, সে নাকি মাঝরাতে রান্নাঘরে কান্নার শব্দ শুনেছে। …এবার বল, ঘরটা পেলে নিবি?’
‘নোব…কলকাতার মতো শহরে, হাজার হাজার লোকের মধ্যে ভূত? গ্রামে শ্মশান-টশান কি পোড়োবাড়ি হলেও নয় কথা ছিল! তুমিও কি এ সব বিশ্বাস করো অমিয়দা?’
‘আমার কথা বাদ দে! কলকাতার থ্রি-ফোর্থ লোক গ্রাম থেকে এসেছে, তারা এ সব বিশ্বাস করে…কিন্তু বউমা থাকতে রাজি হবে তো?’
‘কেন রাজি হবে না? আমি থাকতে পারলে সেও থাকতে পারবে।’ রতনের মনে পড়ে গেল কথাগুলো: ‘দূরে কোথাও চলে যাই, যেভাবে রাখবে সেভাবেই আমি থাকব।’ ভূত থাকুক কী পেত্নিই থাকুক, এই ঘরটা পেলে সে নেবেই। মাথা গোঁজার একটা জায়গা তার এখন ভীষণ দরকার। শিবিকে ব্যাপারটা না বললেই হল, পরে যদি ওর কানে যায় তখন দেখা যাবে।
রবিবার পর্যন্ত সে টানটান হয়ে কাটাল। মা থমথমে মুখে ঘোরাফেরা করে, তার সামনে আসাটা এড়িয়ে যাচ্ছে। ‘খেতে আয়’, ‘কখন বেরোবি’, ধরনের কথা ছাড়া অন্য একটি কথাও বলেনি। কাকার আচরণ দেখে সে বুঝেছে মা ওকে কিছু বলেনি। ঘর পেলেই সে নিঃশব্দে চলে যাবে, এখানকার কোনো জিনিস সে সঙ্গে নিয়ে যাবে না। নেবার মতো অবশ্য কিছুই তার নেই। নতুন জিনিসপত্তর দিয়ে সে নতুনভাবে তার জীবন শুরু করবে, স্বাধীনভাবে। যদি ঘর পায় তাহলে শিবিকে খবর দিতে হবে।
