১ম–কোনো কোনো শাশুড়ী নিজের মেয়েদেরকে ভালোবাসেন–পরের মেয়ে অর্থাৎ বধূদেরকে দুই চোখে দেখতে পারে না।
২য়–সেটিও ভালো নয়। তবে বধূদের বিশেষ করে স্মরণ রাখতে হবে যেন তাদের দোষে শাশুড়ীর সঙ্গে কোনো বিরোধ না হয়। গুরুজনের কাছে বিনয় স্বীকার করা। উত্তম-শাশুড়ীর কোনো দোষ-ত্রুটি নিয়ে ভাবা, গোস্বা করা বা আন্দোলন করা ভদ্ৰমেয়েদের কাজ নয়। শাশুড়ী ও বধূদের মধ্যে বিরোধের একটি কারণ হচ্ছে অভাবী। অভাব চিরদিন থাকে না–অভাবে যারা অসহিষ্ণু হয়, সহিষ্ণু হয়ে উন্নতির চেষ্টা করে না–তাদের মধ্যেই ঝগড়া ফ্যাসাদ দেখা দেয়। পরের মেয়েকে নিয়ে চিরদিন ঘর করতে হয়–সুতরাং তাদেরকে অবিশ্বাস করা ভালো নয়। তারা তো অতিথি বৌ নয়-শাশুড়ী যদি তাদেরকে বুকে করে না রাখেন, তবে তারা কীসের বলে টিকে থাকবে?
.
দেশলাই-এর আগুন
২য় বন্ধু কহিলেন–সময়ের পূর্বে ক্রুদ্ধ হয়ো না, কারো সঙ্গে বিবাদ বাঁধিও না। শক্তিহীনের ক্রোধের শেষ ফল মৃত্যু-সর্বস্বান্ত হওয়া। সংসারে কাজ করতে হলে লোকের সঙ্গে ঝগড়া হবেই–তবে কখনও সীমা অতিক্রম করো না। নিজের অবস্থা ও শক্তি বুঝে লোকের সঙ্গে বিবাদ করো–অযথা আস্ফালন করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা ঠিক নয়। শক্তিমান ও ক্ষমতাশালী হয়ে দুর্বলের উপর অত্যাচার করতে হবে তা বলছি না, তবে তখন দুর্বত্তের সঙ্গে, শয়তানের সঙ্গে বোঝাঁপড়া করবার যোগ্যতা জন্মে? সহিষ্ণু হওয়া উত্তম-ধীরে ধীরে কাজ করতে থাক্ শক্তি সঞ্চয় করে, যে আজ দা নিয়ে তোমার মাথা কাটতে এসেছে, তোমাকে ব্যথিত ও অপমানিত করছে, দশ বৎসর পরে সে শক্তিহীন ও দুর্বল হয়ে তোমার চরণে এসে আশ্রয় নেবে। তখন প্রতিশোধের আনন্দে তাকে চেয়ে দেখো না–ক্ষমা প্রেমে তাকে আশ্রয় দিও–তারই নাম মহত্ত্ব। মনে মনে বহু বৎসর ধরে ক্রোধ করে রাখা ঠিক নয় ক্রোধকে দমন করা কঠিন। কিন্তু তবু বলি ক্রোধ দমন কর। মানুষের মূল্য কেউ চাপা দিয়ে রাখতে পারবে না। কেউ যদি তোমাকে উপহাস করে বা শালা’ বলে গালা-গালি দেয় নীরবে চুপ করে থাক।-তোমার কোনো মূল্য যদি থাকে তবে শীঘ্রই তোমার আসন উচ্চ হবে, মানুষ তোমাকে সমাদর করবেই। কেউ কেউ তোমার গুণ সম্বন্ধে অন্ধ হতে পারে। জগতের মানুষ তোমার গুণ, কার্য শক্তি, সহিষ্ণুতা ও পরিশ্রমের মূল্য দেবেই। যারা তোমাকে নীচু ছোট বলে উপহাস করেছিল তারাই তোমার কৃপার ভিখারি হবে।
.
ভূঁইফোড় মানুষ
১ম বন্ধু কহিলেন–বন্ধু, কোনো কোনো ইতর ভূঁইফোড় লোকের কথা শুনে মনে বড় রাগ হয়। কাল যাকে হাতে ধরে মানুষ করলাম, যাকে নেংটা হয়ে খেলা করতে দেখলাম, তার বেয়াদবি এবং দাম্ভিক ব্যবহার অসহ্য মনে হয়। ইচ্ছা হয় শাস্তি দি, কড়া কথাই শুনাই।
২য় বন্ধু–তা ঠিক নয়। মানুষ যৌবনে পদার্পণ করে, যখন সবে ছেলেবয়স অতিক্রম করে মানুষ হয়ে ওঠে–তখন সে জগৎকে, মানুষকে তৃণ জ্ঞান করে। অধিকাংশ লোকেরই এরূপ ভুল হয়-এমনকি, যারা শিক্ষিত ও বিশিষ্ট লোক তারাও জ্ঞানের প্রথম উন্মেষে অতিশয় মতসর্বস্ব হন। কারও কথা সহ্য করতে পারেন না। এই তো গেল সাধারণ লোকের অবস্থা-এ হচ্ছে মানুষের স্বভাব। এদের ভুল-ত্রুটি দোষ বা এদের সঙ্গে ব্যবহার করতে যেয়ে বুদ্ধিমান লোকের কখনও বিরক্ত হন না। মানুষের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে যেতে হয়। সংসারে বহু মানুষের সঙ্গে না মিশলে, অনেক অভিজ্ঞতা ও আঘাত-বেদনা না পেলে মানুষও হয় না–নিজের দোষ ও দৈন্য বুঝতে পারে না। অল্প বয়সে বা যুবক বয়সে অজ্ঞাতসারে অনেক দোষ করেন, যা বুঝতে পারেন অনেক বিলম্বে।
‘ভূঁইফোড়’ অর্থাৎ হঠাৎ বেড়ে ওঠে, তাদের ব্যবহার অনেক সময় খুব অপ্রীতিকর হয়–কিন্তু তাই বলে, প্রকাশ্যে কাউকে ভূঁইফোঁড়, ছোটলোক বা ইতর–এসব বলতে নেই। যে যেমন আছে, তা মনে মনে অনুভব করতে হয়। বাইরে সকলের সঙ্গেই ভদ্র ব্যবহার করা নিয়ম, কাউকে ছোটলোক বা ইতর–এসব বলতে নেই। বাইরে সকলের সঙ্গেই ভদ্র ব্যবহার করা নিয়ম, কাউকে ছোটলোক, কমজাত বলে মুখের উপর গালি দেওয়া কোনোমতে দ্ৰতা নয়। এরূপ করলে মানব সমাজের বড়ই ক্ষতি হয়। প্রেমের দ্বারা জগতের কল্যাণ ও মানুষের মঙ্গল সম্ভব। একটি উদ্ধত যুবক বা কোনো ভূঁইফোড় যদি নিজেকে মহামান্য মনে করে বা অসত্যের মতো ব্যব রি তবে, তার সংস্রব পরিহার করে চলতে পারে, কিন্তু কোনোমতে তার সঙ্গে অভদ্র ও নিষ্ঠুর ব্যবহার করে না, কারণ মনুষ্যত্বের ধর্ম তা নয়। বয়স্ক লোকদের স্বভাব তা নয়। একটু থামিয়া কহিলেন, কোনো কোনো সময় মানুষ সালাম না করলে মনে রাগ হয়। সালাম না করলে কারোর উপর ক্রুদ্ধ হয়ো না বরং তার সঙ্গে অধিক অধিক প্রেমের সঙ্গে কথা বলে। তবে একথা সত্য যে, সালাম কাজটি ভালো, বিশেষ প্রবীণ আত্মীয়ের কদমবুসি করাও উত্তম। ধনী দেখে সম্মানের জন্য ব্যস্ত হওয়া, আর.দরিদ্রকে উপেক্ষা করা ঠিক নয় বরং দরিদ্র ভদ্রলোককেই অধিক সম্মান কর। মন যদি কাউকে সম্মান করতে না চায়, লোক দেখাদেখি করে সম্মান করো না। . জমিদার, ধনী, রাজকর্মচারী অপেক্ষা মানব-প্রেমিক, দেশ-সেবক, সাহিত্যিক, পণ্ডিতকে সব সময় অধিক সম্মান করো। কখনও চাটুকার নীচ ব্যক্তিদের মতো স্বার্থের গন্ধে কারো খোশামোদ করো না–বাইরে চাকচিক্য দেখে জিনিসকে অবজ্ঞা করো না।
