ওয়ার্ডের অপর প্রান্তে, একটা বেড ঘিরে একদল ছাত্র। ডাঃ রায়েরই এক অ্যাসিস্টেন্ট লেক্চারার রুগী সম্পর্কে ছাত্রদের কী যেন বোঝাচ্ছেন। ডাঃ রায় সোজা সেখানে গিয়ে উপস্থিত। ছাত্ররা ওঁকে দেখেই দু’পাশে সরে দাঁড়াল। রুগীর কাছে এসেই ডাঃ রায় ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন—‘কী হে, কী ব্যাপার। এখানে এত জটলা কিসের।’
অ্যাসিস্টেন্ট লেকচারার বললেন—‘স্যার, এটা সিরিয়াস কেস, নিউমোনিয়া বলেই বোধ হচ্ছে। অক্সিজেন দিতে বলেছিলাম, দেওয়া হচ্ছেও। কেসটা একটু পিকিউলিয়র বলেই ছাত্রদের ওয়াচ করতে বলছিলাম।’
ডাক্তার রায় রুগীর আরো খানিকটা কাছে এসে বললেন—‘নিউমোনিয়া বলে বোধ হচ্ছে? তা নিউমোনিয়া হল কেন?’
এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই এবং ডাঃ রায় কোনো উত্তর আশাও করেননি। অভ্যাসমত দুই হাত পিছনে আবদ্ধ রেখে রুগীর মুখের দিকে দেখলেন। রুগী তখন শিবনেত্র হয়ে পড়ে আছে, নাকে অক্সিজেনের নল গোঁজা। ঠোঁট দুটো খোল, খাবি খাচ্ছে। ছাত্ররা তখন রুগীর চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে। ডাঃ রায় রুগীর বুকে টোকা দিলেন, ফুলে-ওঠা পেটটাও বাজিয়ে দেখলেন। পর-মুহূর্তেই বললেন—‘নিউমোনিয়া ঠিকই। তবে আমাশা থেকে ওর লিভার খারাপ হয়ে অ্যামেবিক অ্যাবসেস হয়েছে। ট্যাপ করে পুঁজ বার করে দাও, ভাল হয়ে যাবে।’
অ্যাসিস্টেন্ট লেকচারার এ-কথা শুনে থতমত খেয়ে গেল। ছাত্ররাও হতবাক্। লেকচারার বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন—‘তাহলে স্যার···’
কোনো কিছু মন্তব্য না করে ডাক্তার রায় গট্ গট্ করে চলে গেলেন। লেকচারারের প্রশ্ন আর শেষ হতে পারল না। পরে জানা গিয়েছিল যে, রুগীর পেট ট্যাপ করে প্রায় এক পাইন্ট পুঁজ বার করা হয়েছিল এবং রুগী বেঁচেও উঠেছিল।
ইতিমধ্যে হাসপাতালময় রাষ্ট্র হয়ে গেছে ডাক্তার রায় ভিজিটে এসেছেন। যে যেখানে ছিল হন্তদন্ত হয়ে সবাই ছুটতে ছুটতে এসে হাজির। হাউস ফিজিসিয়ান, অ্যাসিস্টেন্ট দু’জন, স্টাফ নার্স, এমন কি সুপারিন্টেন্টে পর্যন্ত। ডাঃ রায় ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে লম্বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রুগীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। আমরা দু’জন গুটিগুটি সেই ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে।
হঠাৎ দেখা গেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের সেই ফিজিসিয়ান হন্তদন্ত হয়ে আসছেন। তাঁকে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম যে বৈদ্যনাথের কথা বলবার জন্যেই আসছেন। ডাঃ রায়কে বলামাত্রই তিনি বললেন—‘চলো, একবার দেখে আসি।’
সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে যাবার পথে রুগী সম্পর্কে হাউস ফিজিসিয়ানের কাছে যা কিছু জানবার জেনে নিয়ে বৈদ্যনাথের কাছে এসে দাঁড়ালেন ডাক্তার রায়। অভ্যাস মতো আবার দুই হাত পিছনে আবদ্ধ রেখে বৈদ্য-নাথের চোখ আর মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে দেখলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন—‘তা হলে পা-টা অ্যাম্পুট করাই স্থির করলে?’
‘হ্যাঁ স্যার, কিন্তু অ্যানেসথেটিক স্ট্যাণ্ড করতে পারবে না বলেই আমাদের সকলের ধারণা। আপনি কী পরামর্শ দেন।’
তখনো একদৃষ্টিতে বৈদ্যনাথের রোগযন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার রায়। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন—‘অ্যানেসথেটিক হয়তো স্ট্যাণ্ড করতে পারবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলের পা-টা গেলে ও দাঁড়াবে কার জোরে?’
এ-কথা বলেই ডাক্তার রায় বৈদ্যনাথের একেবারে কাছে এগিয়ে এসে একটা হাত ধরে বললেন—‘তুমি একটু উঠে দাঁড়াতে পারবে? আমার হাত ধরেই ওঠো।’
অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েই বৈদ্যনাথ ডাঃ রায়ের হাতে ভর দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
ডাঃ রায় বললেন—‘জোড়পায়ে দাঁড়াও আর হাত দুটি একত্র করে সামনের দিকে প্রসারিত করে দাও তালু দুটো চিত করে।’
অঞ্জলি দেওয়ার মতো বৈদ্যনাথ দাঁড়াল। পকেট থেকে কলমটা বার করে ডাঃ রায় বৈদ্যনাথের হাতের চেটোর উপর বোলাতে লাগলেন, মাঝে মাঝে ঠুকেও দেখলেন। তারপর বললেন—‘কোনো সেনসেশন বোধ করছ? শিরশির করছে?’
বৈদ্যনাথ বললে—‘না, সে রকম কিছু বোধ করছি না। তবে পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা।’
‘ঠিক আছে। শুয়ে পড়।’
বৈদ্যনাথ বিছানায় শুয়ে পড়তেই মাথার তালুতে দু-চার বার থাবড়া মেরে ডঃ রায় বললেন—‘এবার?’
বৈদ্যনাথ ঘাড় নেড়ে জানালে, এবারেও সে কিছু বোধ করছে না।
বৈদ্যনাথকে আর কিছু প্রশ্ন না করে ডাঃ রায় হাউস ফিজিসিয়ানকে বললেন—‘টিটেনাস ইনফেকশন হয়নি। মনে হচ্ছে রোগটা পেরিফেরাল নিউরাইটিস। ওকে অবিলম্বে আমার ওয়ার্ডে বদলি করে দাও।’
হাউস ফিজিসিয়ানের কাছ থেকে একটা প্যাড নিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন ডাঃ রায়, সেই সঙ্গে যা-যা করণীয় তাও বলে সোজ। গাড়িতে উঠে বসলেন।
॥ চার ॥
সাড়ে তিন মাস বৈদ্যনাথকে থাকতে হয়েছিল এই হাসপাতালে। এই সাড়ে তিন মাস হাসপাতালের জীবন বৈদ্যনাথকে আরেক মানুষে রূপান্তরিত করেছিল। ওয়ার্ডের প্রত্যেক রুগী থেকে শুরু করে সুপারিন্টেণ্ডেন্ট, হাউস ফিজিসিয়ান, স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড মাস্টার, ওয়ার্ড বয় সবার মায়ামমতা স্নেহত্ন অকুণ্ঠ এবং অযাচিত ভাবে পেয়ে নিঃসঙ্গ বৈদ্যনাথ মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার আর এক নতুন আস্বাদ পেয়ে ধন্য হল। তার একটা কারণও ছিল। ডাঃ রায় প্রতিদিন ওয়ার্ডে এসে বৈদ্যনাথের কাছে বেশি সময় কাটাতেন এবং শুক্রবার কোনরকম ত্রুটি যাতে না হয় সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করে দিতেন। সবাই জানত এই রুগীর প্রতি ডাঃ রায়ের একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে এবং সে কারণেই সুপারিন্টেণ্ডেন্ট থেকে ওয়ার্ড বয় সবাই বৈদ্যনাথের বিশেষ যত্ন নিত।
