কিন্তু আমার ভাবনা এদের নিয়েও নয়। আমি ভাবি তাদের কথা, যারা এই টু পার্সেন্টের মধ্যেও আসে না। সত্যবান পূর্বপ্রসঙ্গে ফিরে গেলেন, আমি ভাবি, মারসোর মতো খুনিকে নিয়ে। আপনি তো আউটসাইডার পড়েছে, আমাকে বলেছিলেন? আচ্ছা বলুন তো, মারসো কেন খুন করল। কী অপরাধ ছিল আরব ছেলে দুটোর। সে তো তাদের চিনতই না। ডস্টয়েভস্কির খুনিদের তবু একটা সাফারিং ছিল। মারসোর তাও নেই। এর প্রেম নেই, দুঃখ নেই, জিজ্ঞাসা নেই—জিঘাংসা তো ছিলইনা। প্রতীতি নেই, কাজেই ভাল-মন্দ নেই। হৃদয়ের ঝড় আর বাইরের ঝড় মিলেমিশে তার মধ্যে কবেই একাকার হয়ে গিয়েছে। এই যদি তার অবস্থা হয়, তাহলে এখান থেকে তো এভরিথিং ইজ পারমিটেড। তাই নয় কি? কেননা, জীবনই তাকে জীবন থেকে বের করে দিয়েছে। আর, এজন্য সে দায়ী নয়! আরব ছেলে দুটোকে খুন করে, সে তো তার জীবনের ভেতরে থাকার সার্বভৌম অধিকারকেই প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছে তাই না বাবু? একে শাস্তি দেবে কোন আহাম্মক।
আমাদের একজন বিদ্বান সেক্রেটারি, আই এ এস পার্থসারথি চৌধুরি, বোধহয় ঠাট্টা করেই আমাকে বলেছিলেন, মারসো ওয়াজ সিম্পলি স্ট্রাক বাই দা ডেজার্ট সান। বোধহয় আমারই বোঝার ভুল। তার পার্সোনাল লাইব্রেরির ১৫০০০বই-এর মধ্যে বসে আমি তাকে সিরিয়াসলি বলেছিলাম, না, সার। রাসকোলনিকভ খুন করেছিল অন্ধকার ঘরে। সূর্য ছিল না।
কৌশিক তুই আমাকে বললি না কেন রে! আমি তোকে নিয়ে যেতাম।
কৌশিকের মুখময় একটা হাসির আভা জেগে উঠে কোথাও মিলিয়ে গেল, আমি দেখতে পেলাম। যদিও জন্মমুহূর্তেই তার মৃত্যু।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আচ্ছা, একে এবার ছেড়ে দিই? সত্যবান অনুমতি চাইলেন। হাত নেড়ে ইঙ্গিত করলেন ধুতি-শার্ট পরা দুজন পালোয়ানকে। নিয়ে যাও।
গম্ভীর ইরেক্ট ভঙ্গিতে কৌশিক উঠে দাঁড়াল। একবার স্ট্রেচ করে নিল শরীরটা। তারপর ওদের সঙ্গে মার্চ করে কিছুটা গেল। তারপর ঘুরে দাঁড়াল।
সঙ্গে সঙ্গে, হাতলে দুই থাবায় ভর রেখে, সত্যবান চেয়ার থেকে ঊধ্বাঙ্গ কিছুটা তুলে, স্থির।
চশমাটা। কৌশিক বলল।
ভঙ্গিটা দেখুন।ওর চলে যাবার দিকে তাকিয়ে সত্যবান বললেন, যেন কোনও অন্যায়ই করেনি। চারটে ছেলে। অ্যাটিচিউড কিন্তু একটা। যে, উই হ্যাভ মেড ইট। আমরা পারি। এবং পেরেছি। আমরা ব্ৰহ্মকমল এনেছি। কী আর বলব। মাথা নেড়ে কিছুটা হতাশভাবে, কিছু বা দুঃখিত, বললেন, সচ্ছল, শিক্ষিত পরিবারের কৃতী ছাত্র সব। খুন করলেও এরা ভাবে, তা ঠিক আর পাঁচটা খুনের মত নয়। কিছুটা রেসপেক্টেবল!
ওরা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সুইং ডোরের দুলুনি থেমে আসে। টেবিলের ওপর আমার অশৃঙ্খলিত হাতদুটি রেখে, সেদিকে তাকিয়ে আমি বললাম–
দেখুন, সত্যবানবাবু–
বলুন।
দেখুন, মানে আমি … যাক গে, থাক।
না-না। বলুন না। একটা লিমকা খান। দারওয়াজা, এক লিমকা ল্যাও। নিন, বলুন–
দেখুন, সত্যবাবু। দীপ্তিকে তো আমিও খুন করতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু পারেননি।
না। কেদারে হোক, বদ্রীতে হোক, এবার আমি দীপ্তিকে খুন করতাম।আমি ধীরে ধীরে বলি, দীপ্তি ফিরে আসত না।
ওগো তোমরা কে কে চা খাবে, উঠে পড়। কারণ, এরপর সাড়ে আটটার আগে আর চা হবে না…
হ্যাঁ। এটা, ইন বিটুয়িন লাইনস, আপনার ডায়েরিতে আমি লক্ষ্য করেছি। আইভি সোম আসার পর থেকেই কমবেশি এই লাইনে আপনি ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু, সত্যবান হাসতে লাগলেন, করেননি। বা, করতে পারেননি। বা, দেরি করে ফেলেছেন। তার আগেই যে করার, সে কাজ করে দিয়ে গেছে। প্রেমিক বলুন, বিশ্বাসঘাতক বলুন, খুনি বলুন–সকলকেই ইন লাইফ, ওয়ান হ্যাজ টু অ্যাক্ট। তাই না — বাবু?
বহুদিন আমি আইভিকে ফ্ল্যাটে এনেছি, যখন ওরা নেই। দীপ্তির নিজের হাতে পেতে যাওয়া বিছানা ইউজ করেছি।
আমি সব জানি। শি হ্যাজ কনফেসড এভরিথিং। টানা দশটি বছর ধরে আপনি মিস সোমের সঙ্গে অ্যাফেয়ার চালিয়ে গেলেন, অথচ, স্ত্রী তা টেরও পেলেননা এত বিশ্বাস করতেন আপনাকে…
যে এটা পারে, এতটা ক্ললেস রাখতে পারে গোটা ব্যাপারটা–আই এগ্রি, হি ইজ আ পোটেনশিয়াল মার্ডারার। হি ইজ ওয়ান, ইনডিড। হি কুড হ্যাভ, অলমোস্ট সার্টেনলি, মেড আ ক্ললেস পারফেক্ট মার্ডার।
তাহলে আমাদের লাইন অফ ডিফারেন্সটা কোথায়? প্রায় তো নেই-ই। আমি কেন শাস্তি পাব না?
নেই মানে? সত্যবান হাসতে হাসতে বললেন, হেল অ্যান্ড হেভেন ডিফারেন্স। বললাম তো। আপনি ভেবেছিলেন, কিন্তু, করেননি। বা, পারেননি। আরে মশায়, আপনার মতো লোকরা, আগেই তো বলেছি আপনাকে, শুধু ভাবে। শুধু ভেবে যায়। কিছু করে না। ইউ পিপল সিম্পলি রিড নিউজপেপার্স অ্যান্ড ফরনিকেট। অ্যান্ড টক। অ্যান্ড দ্যাট ইজ অ্যাবাউট অল। আপনারা কিছু করেন না। …অথচ, এদের দেখুন। এরা খুন করল। বসে বসে এক প্যাকেট ফান মাঞ্চ খেল। চতুর্দিকে ক্লু ছড়াতে ছড়াতে এরা কেদার আর বদ্রীনাথের দিকে গেল। হেমকুণ্ডসাহেব থেকে ব্রহ্মকমল আনল। এটাও তো একটা আদর্শ হতে পারে, দিগন্ত পেরিয়ে একটু বেশি দূরে যাওয়ার এই ইচ্ছা। অন্তত, এখনও যাদের গোঁফ ওঠেনি ভাল করে, সেই কিশোরদের কাছে? একটা স্বপ্ন হতে পারে। একটা মূল্যবোধ হতে পারে। আর আদর্শ যোগ হলেই তো সে শহিদ, তাই না –- বাবু?
এদের কীরকম শাস্তি হবে? বেনাবনে মুক্ত ছড়াবার হতাশা ফুটে উঠল সত্যবানের মুখে। সাত কাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা কার বাবা? বিরক্তমুখে বললেন, ওরা জুভেনাইল কোর্টে প্রোডিউসড হবে। এই তিন, চার কি পাঁচ বছর করে, আর কত। গলা কেটেছেসঞ্জয়। কিন্তু কৌশিকের হাতে সাফোকেশানে মিসেস বসুরায়ের আগেই মৃত্যু হয়। ওর একটু বেশি হতে পারে। মেরে কেটে ছয় ম্যাক্সিমাম? কারেকশান হোমে খুব একটা খারাপ থাকবে না।
