সে এক রাউন্ড বলল। ম্যানার্স-জ্ঞান থাকলে এটার দাম সে নিশ্চয়ই, অন্তত দিতে চাইবে।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফিরতে রাত বারোটা হয়ে গেল।ক্লাব থেকে চন্দন নিয়ে গিয়েছিল এলফিনে। থার্ড রাউন্ড থেকে সব খরচ সে করেছে।
এত আগ্রহ নিয়ে জীবনে বোধহয় কারুকে কিছু বলিনি, বলতে চাইনি, যেভাবে, ঝুঁকে, বেঁকে, টেবিলে মাথা রেখে, কখনও তুলে, দীপ্তিকে বলছিলাম, জানো, ওরা আটকে পড়েছিল। বদরীতে। সাতদিন বেরুতে পারেনি। ঘ্যচ্যাং! বরফ কলের দরজা পড়ে গিয়েছিল। বদ্রীনাথে আটকে পড়েছিল ওই ওরা।কারা আমি মনে করতে পারি না কিছুতে। তাই তিন আঙুল তুলে বলি, তিনশ ইদুর! ঘোড়াসুদ্ধ একটা মেয়ে, ওদের দলের, খাদে পড়ে। গেল…
টিকিট কেটেছ? গায়ে হাত দিও না।
টিকিট? কাল কাটব। ও হ্যাঁ, আমরা গাভোয়ালের বাসে যাচ্ছি। বুঝলে। বেস্ট ট্রাভেল এজেন্ট। বুঝলে। সব ব্যাবোস্তা করে এস্ছি।
মালে কত টাকা ওড়ালে আজ–ফের?
চোদ্দ টাকা। যাসস্…স্ট্যাক্সি ভাড়া! সগৌরবে এত বলে আমি বোধকরি ফের গায়ে হাত দিয়েছিলাম। গায়ে হাত দিয়েছিলাম বলতে, মূলত, কাছেই তো ডেকেছিলাম। তাই না? স্ত্রী পাঠকরা কী বলেন? মারতাম তো আর না। আদরই করতাম। ভালবাসতে গেলে, যারা ভালবাসার বাইরে, তারা একটু মদ খায়। তাদের খেতে হয়। নইলে তাদের খুন করতে হয় বৌকে। স্বামী মদ খায় না বলে যাঁরা নিশ্চিন্ত, তাদের জানাই, বৌ খুন তারাই বেশি করে। যারা টিটোটেলার। স্ট্যাটিসটিক্স তাই বলে। আস্ক লালবাজার বধূহত্যা স্কোয়াড। ওরা কনফার্ম করবে।
মর মুখপোড়া। ড্রিল মাস্টারের ছেলে!
দীপ্তি আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে শোবার ঘরে চলে গেল। সারারাত মেঝেয় পড়ে থাকলাম। তবে মিথ্যে কথা কেন বলব? পাখাটা ফুলফোর্সে চালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। যে জন্যে সে রাতে প্রগাঢ় ঘুম হয়।
সকালে বাজার গেলাম। ওই একটা ছেলের কাছেই আমি মাছ কিনি। নাম সন্ন্যাসীচরণ ভক্ত। আজ ওর স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, হেডমাস্টার বন্ধুবাবু খলবলে নর্দমার দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছেন, ও সন্ন্যাসী, তোমার একটা শিঙ মাছ নর্দমায় পড়ল যে!
থাকুক স্যার কিছুক্ষণ ওখানে, হেসে সন্ন্যাসী উত্তর দেয়, নেকাপড়া শিখুক।
দীপ্তি অধ্যাপিকা। অনার্সে উচ্চ-দ্বিতীয় এবং এম-তে প্রথম শ্রেণী পেয়েছিল। আমার তখনও রাগ যায়নি। হ্যাঙওভার কাটেনি। মাছটা মাদি নাকি?
০৮. সুহানা সফর
সফরসূচি শেষ পর্যন্ত এইরকম ঠিক হল :
১৭ মে – ডুন এক্সপ্রেস।
১৯ মে–ভোরে হরিদ্বার।
১৯-২০ মে – হরিদ্বারে দুদিন। হর-কি-পাউড়িতে সন্ধ্যারতি দর্শন ও চৈতির প্রদীপ ভাসানো। কণখল : আনন্দময়ী মার আশ্রম। রোপওয়েতে মনসা পাহাড়। নীল ধারা। ভারতমাতা মন্দির। পবন মন্দির (কাচওয়ালা)। মথুরাবালার মালাই সন্দেশ।
২১-২২ মে—হৃষীকেশ। শিবানন্দ আশ্রম। লছমনঝোলা। স্টিমারে গীতা ভবন। পরমার্থ ভবন ঘাটে লোহার চেন ধরে স্নান (নইলে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে)। ছাইবাবার ঝোপড়ি।
২৩ মে – মুনি-কি-রেতির সংযুক্ত বাস আড্ডা থেকে ভোর ৬.৩০ মিনিটে গাড়োয়াল নিগমের বাস (GTT 7009)।
২৩-৩০ মে – চিলা—পাউড়ি বদ্রী-কেদার। টেন্ট কলোনি। এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় কিছু নেই। (আপলোগ গোড়ায়াল নিগমকা সাত রোজকা মেহমান হ্যায়।)
৩১ মে–হৃষীকেশ। মুনি-কি-রেতিতে ওরা ছেড়ে দেবে।
১ জুন – মুসৌরি। (একদিনের বেশি নয়। দিল্লির সামার ক্যাপিটাল। হেজিপেজি হোটেল এখন ৪০০ টাকা। গলা কেটে নেবে।)
২ জুন – দেরাদুন থেকে ডুন এক্সপ্রেস।
৪ জুন – কলকাতা। যাবার আগের দিন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন মতো দীপ্তির মাথা ধরা থেকে জ্বরজারি, সর্দিকাশি, মায় ফুড পয়েজনের যাবতীয় ওষুধ কিনে, কর্পোরেশন থেকে পাওয়া কলেরার ভুয়ো সার্টিফিকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছি। কিছু কেনাকাটি এখনও বাকি আছে।দীপ্তি সেজন্যেই আসবে। যেমন, দুটো হাওয়া বালিশ (একটা আছে), টর্চের ব্যাটারি, ক্যামেরার ফিল্ম। যেমন, পকেটওলা ড্রয়ার, যদি পাওয়া যায়। হাজার দশেক টাকা ক্যাশ সঙ্গে যাচ্ছে, বেশিটা দীপ্তি সেখানে রাখবে। শায়া ও শালোয়ারে সে ইতিমধ্যে ইনসাইড পকেট করে নিয়েছে। ট্রাভেলার্স চেক? ধূর, ওদিকে ব্যাঙ্ক-ফ্যাঙ্ক কোথা? টাকা আমার কাছে থাকবে না। হারিয়ে ফেলব। গত বছরে একদিন,হ্যাঁ, সপ্তমীর দিন, এক প্যাকেট উইলস ফিল্টার কিনে, হা, রাসবিহারীতে চোদ্দ টাকা ফেরত নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। মনে নেই? কনট্রাসেপটিভস? ছিঃ। স্বর্গে গিয়েও ধান। ভানবে? চেঁকি কোথাকার।
৬টায় আসার কথা মেট্রোর সামনে।
চৈতি যোধপুর পার্কে মামার বাড়িতে। সেখান থেকে ওকে তুলে ফেরা। ৮টা বেজে গেল, দীপ্তির দেখা নেই। বাড়ির ফোন খারাপ। যোধপুরে ফোন পেয়ে চৈতি বলল, সে কী। তুমি সোজা বাড়ি চলে যাও। আমি আজ এখানেই থেকে যাচ্ছি। কিন্তু, তুমি আমাকে ফোন করবে। ফোন না পেলে এখানে এসে খবর দিয়ে যাবে। যত রাতই হোক। বুঝলে?
চৈতি একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছে মনে হল।
০৯. নো এন্ট্রি
রাসবিহারী গুরদোয়ারায় উৎসব। চেতলা সেন্ট্রাল রোডে নো এন্ট্রি।
ট্যাক্সি সদানন্দ রোডে ঢুকে ঘুরপথ দিয়ে ব্রিজে উঠল। ড্রাইভার বলছিল, দেখুন সার। এরকম একটা ইমপর্টেন্ট রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে।
আমি বললাম, ইমপর্ট্যান্ট নয়? সাউথ আর এনটায়ার সাউথ-ওয়েস্ট, আলিপুর, হেস্টিংস, খিদিরপুর, বেহালা–সব কিছুকে তো এই একটা রাস্তাই কানেক্ট করছে।
