এখানে-ওখানে গিয়ে আমি টুকটাক কেদারবদ্রীর খবর জোগাড় করতে লাগলাম। যেখানেই যাই, বিশেষত কেদার প্রসঙ্গ একবার তুলি। কেদারই টাফ। গৌরীকুণ্ড ৬০০০ মিটার। কেদার সাড়ে ১১। গৌরী টু কেদার একটানা বিরতিহীন চড়াই। পথ ১৫ কিলোমিটার। সরু, ঘোড়ার গু আর শ্যাওলায় পিচ্ছিল পাকদণ্ডীর হাঁটা পথ। পথের পাশে ডানদিক জুড়ে পাতাল।
যদি ডান্ডি না পাওয়া যায় ভাল।দীপ্তি ঘোড়ায় মরে গেলেও চাপবেনা জানিয়েছে। তাহলে গৌরীকুণ্ড থেকে ফিরে আসবে। এক আমি যদি কান্ধা দিয়ে নিয়ে যাই, সেকথা স্বতন্ত্র।
বুলবুল! বুল ছাড়া কী, আমি যেদিন টেলিফোন ভবনে গেলাম, তরফদার তখন সহকর্মী কাঞ্জিলালকে চিৎকার করে বোঝাচ্ছে, ওয়ার্ল্ড কাপে মারাদোনার ওই সেকেন্ড গোলটা! পাঁচজনকে গুতিয়ে যেভাবে গোলটা দিল, শিং না থাকলে, দু-পেয়ে মানুষের পক্ষে ও-গোল দেওয়া সম্ভব? হঠাৎ আমাকে দেখে বলে উঠল, কী ব্যাপার। বিলটা এনেছ?
গত মাসে ভুতুড়ে টেলিফোন-বিল এসেছে। তিন হাজার তিনশো তিরিশ টাকা। তদন্ত সাপেক্ষে অ্যাভারেজ বিল দেবার অর্ডার কদিন আগে তরফদার করিয়ে দিয়েছে।
আরে,না-না। বিল নয়।আমি বললাম, তা, তোমাদের কী নিয়ে ফাইট? ট্যাকটিক্স ভার্সাস পাওয়ার ফুটবল?
না-না। প্রাক্তন নকশাল নেতা সিরিয়াসলি জানাল, আমাদের কথাটা শুরু হয়েছিল হাউ টু শেক-অফ কাঁধ ঝাঁকিয়ে, দিস ব্লাডি বামফ্রন্ট। এই নিয়ে। আবার বলল, বিলটা আনলে না কেন?
আমি বিল আনিনি। এসেছি, ও রিসেন্টলি গেছে শুনে, কেদার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে। জেনে, ওর মুখচোখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। কোথা কেদার আর কোথায় বিল হাতে স্পেশাল কমপ্লেন সেলের নায়ারকে তেল-মারা।
কেদার যাচ্ছ? বলে ড্রয়ার থেকে একতাড়া ছবি বের করে সে টেবিলে রাখল, এই দ্যাখো। লাস্ট অক্টোবরের কেদার। কেদার, বদ্রিনারায়ণ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী–চারো ধামের ছবি! বাট কেদার ইজ কেদার। সিম্পলি আনবিটেবল! আহা–হ্যাঁ। তুষার রায়ের শেষ কবিতাটা মনে আছে তোমার–
ঘণ্টার শব্দ শুধু ভেসে আছে তিব্ৰতী গোস্ফার।
ব্যস আর কেউ নয়, কিছু নয়, শুধুই তুষার,
ফার ও পাইনবনে তুষার ঝরছে শুধু, শুধুই তুষার..
বোধহয় একটু মিসকোট করলাম। কিন্তু, একজন কবির শেষ কবিতার শেষ লাইনের শেষ শব্দ নিজের নাম দিয়ে… পৃথিবীর সাহিত্যে এমন দৃষ্টান্ত দুটো দেখাতে পারবে? লিখছে কখন? না, যখন হেভি হেমোপটিসিস হচ্ছে–মুনলাইট গ্রোভের সাদা বেসিন লালে-লাল করে দিচ্ছে দার্জিলিঙে–
তরফদার সাহিত্য ভালবাসে, নিজেও লেখেটেখে। তুষার রায় ছিল ওর বন্ধু।
লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল ডান হাতের রোঁয়া বাঁ-হাতের তালু দিয়ে সস্নেহে শোয়াতে শোয়াতে ও প্রসঙ্গে ফিরে এল, আর পথের সৌন্দর্য… কী করে বোঝাব তোমাকে। তুলনা হয় না। পাহাড়ের গায়ে যে কত রকমের সবুজ। পরপর দশটা হয়ত শেড দেখতে পাবে সবুজের…
তবে বিউটির শুরু তোমার রামবাড়া চটির পর থেকেই। তারপর তো শুধুই তুষার… শুধু তুষার রায়ের শেষ কবিতা।
বুঝলাম, ভুল জায়গায় এসেছি। আর যাই হোক, তরফদারের কাছে কোনও ইনফর্মেশান নেই। অন্তত এখন। লাঞ্চের সঙ্গে, গোটা দুই বিয়ার আজ সে নির্ঘাত পেঁদিয়েছে।
তবে তরফদারও ট্রাভেল এজেন্টের বকলস গলায় বাঁধতে বারণ করল। সে একটা চিঠি করে দিয়ে বলল বিড়লার হেড অফিসে যেতে ওই যেনীলাট হাউসের পাশে। ডালহৌসিতে। কেদার ও বদ্রীতে বিড়লার গেস্ট হাউসে যথাক্রমে দুটি ঘর সে বুক করতে বলল।
অ্যাটাচড বাথ আছে নাকি? আমি ভয়ে ভয়ে বলি।
আছে মানে? উইথ গিজার অ্যান্ড এভরিথিং। বিয়ারের ফেনার চেয়েও উচ্ছ্বসিতভাবে তরফদার টেবিলে ঘুসি মারল। বলল,
বাংলো মন্দিরের একদম গায়ে। নিচে মন্দাকিনী। মন্দিরের একেবারে পিছন থেকে উঠে গেছে চিরতুষার–কেদার পাহাড়।
০৬. এক প্লেট ল্যাংড়া, কটি সন্দেশ এবং …রু আফজা!
তার জন্যে রাখা ১০ ভাগ দিয়ে দীপ্তি যদি শেষ পর্যন্ত উড়িয়ে না দেয়, তাহলে আমরা নিজেরাই যাচ্ছি স্বাধীনভাবে কমবেশি ৯০ ভাগ এরকম মনস্থ করে রাত ৯টা নাগাদ বাড়ি ফিরে দেখি, দীপ্তির দাদার গুরুদেব এবং যদিও এখনও দীক্ষা নেয়নি, তথাপি দীপ্তিরও পূজ্যপাদ শ্রীবাগীশ্বর ভট্টাচার্য এক প্লেট কাটা ল্যাংড়া ও কয়েকটি সন্দেশের সামনে বসে আছেন। পাশেই। এক গ্লাস রু আফজা, আইস-কিউবগুলো সব এখনও গলে যায়নি।
হরিদ্বার সেরে উনি এখন সবে কণখলে।
এ-সব দেবীপুরাণের কথা, বুঝলে মা। গুরুদেব বলছেন, সেই যখন ভগীরথ গঙ্গাকে নিয়ে আসছেন। খল নামে এক দানব থাকত এখানে। ঋষিদের যজ্ঞ নষ্ট করত। সারাদিন প্রস্তরস্থূপ হয়ে পড়ে থাকে। সন্ধ্যায় প্রকটিত হয় তার রাক্ষসরূপ। ভগীরথ শঙ্খধ্বনি করে গঙ্গাকে নিয়ে পৌঁছলেন এখানে। স্রোতধারা থেকে এক ফোঁটা জল গিয়ে লাগল প্রস্তরস্থূপে। ব্যস, খল উদ্ধার হয়ে গেল!কণ মানে কণিকা। আর খল তো শুনলে। এই দুয়ে মিলে কণখল। আনন্দময়ী মার আশ্রম এখানেই।
একটা সন্দেশ ভেঙে মুখে দিয়ে বললেন, এ কী, এ তো গিরীশের!
সত্যিই বুঝি তাই। দীপ্তি, কী করে বুঝলেন চোখে ওঁর বিভূতির দিকে তাকিয়ে। গিরীশ প্রসঙ্গ রহস্যাবৃত রেখে, সাধকোচিত প্রসন্ন হেসে উনি ফের হরিদ্বারে ফিরে এলেন। চৈতিকে বললেন, হরিদ্বারে মথুরাবালার দোকানে মালাই সন্দেশ খেতে ভুলো না যেন।
বলতে বলতে ঈষভাবে পাছা তুলে, ছোট করে, প্রায় নিঃশব্দে, উনি উইন্ড পাস করলেন মাত্র একবার।
