সে প্রায় তিরস্কারের মতো। ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার মতো। তখনই বুঝেছি, সময় হয়নি। এ জীবনে না-ও হতে পারে। অসুখ। ভীষণ অসুস্থ আমি। এর নাম ভবরোগ। এ রোগ সারবে কীসে! দাওয়াই আছে। কীরকম? স্বাতী নক্ষত্রের জল পড়বে মড়ার মাথার খুলির ওপর। সেই জল একটা ব্যাং খেতে যাবে। সেই ব্যাংকে একটা সাপে তাড়া করবে। ব্যাংকে কামড়াতে গিয়ে সাপের বিষ ওই মড়ার মাথার খুলিতে পড়বে, আর সেই ব্যাংটি পালিয়ে যাবে। সেই বিষজলের একটু খেতে হবে।
এ তো অসম্ভব। না অসম্ভব নয়। ঈশ্বরের শরণাগত হয়ে, ব্যাকুল হয়ে ডাকতে হবে। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে হবে। সেই ব্যাকুলতা আমার নেই। মহাপুরুষ দেখেই বুঝেছেন, এর থাক। আলাদা, জাত আলাদা। ব্যাঙ্কের কাউন্টারে নোট ভাঙাবার কায়দায়, মর্কট বৈরাগ্য ভাঙিয়ে ঈশ্বরপুরিয়া পেতে চায়।
পণ্ডিতমশাই হঠাৎ খিলখিল করে হাসতে লাগলেন। তারপর কোনওরকমে দাঁড়িয়ে, টলতে টলতে বেরিয়ে গেলেন। ছোটদাদু বললেন, হৃদকমলে বড় ধুম লেগেছে। মজা দেখিছে আমার মন পাগলে। ঘোর লাগিয়ে দিয়েছে ঘোর। এক জালা মদ খাইয়ে দিয়েছি। সুরা পান করি নে আমি সুধা খাই জয় কালী বলে। হঠাৎ ছোটদাদু গান শুরু করলেন, এ মদ যে রসে ভরা। ষড় রিপু চোলাই। করা। যে খায় সে আত্মহারা। মদে তারে খায় না ॥
ছোটদাদু হঠাৎ উঠে পড়লেন।
হরিশঙ্কর বললেন, তুই একাসনে কতক্ষণ বসে আছিস জানিস? ছ’ঘণ্টা।
ছোটদাদু বললেন, এ কিছুই নয়। আমি পরপর তিন দিন একভাবে বসে থাকতে পারি। এর নাম স্থাণু যোগ। আমার গুরু শিখিয়েছিলেন। দাঁড়িয়ে থাকে। একটা দিন কেটে গেল। সে বেশ মজা। চুপচাপ একভাবে দাঁড়িয়ে আছি, যেন একটা গাছ। অদ্ভুত সব অনুভূতি হতে থাকে। অনুভূতিও তো একটা শিক্ষা।
অবশ্যই। ফিলিংস। তা চললি কোথায়?
চান করব।
কোথায় চান করবি?
পুকুরে।
মোহনদা বললেন, তা হলে একটা লণ্ঠন নিয়ে আসি। একটা নতুন গামছা।
তুমি গামছা দাও। আলোর প্রয়োজন নেই। তারার আলোর প্রদীপ জ্বেলে চলব আমি আমার পথে। পিন্টু, চলো আমার সঙ্গে।
এত ঘনিষ্ঠতা হয়নি আগে। এই প্রথম বাইরের পরিবেশে দেখছি একজন সাধককে। সাধনা সাধক শব্দদুটো শোনাই আছে। মনে হয় খুব পরিচিত। আসলে কিছুই জানি না। কীভাবে ধাপে ধাপে সাধারণ থেকে অসাধারণ একটা স্তরে। থিয়োরি জানি, প্র্যাকটিস জানা নেই।
ছোটদাদু আগে আগে চলেছেন। আমরা পেছন পেছন। আমি আর মোহনদা। ছোটদাদু বললেন, মোহন, তুমি যাও। তোমার আসার প্রয়োজন নেই।
মোহনদা ফিরে গেলেন। মোহনদা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুত একটা কাণ্ড হল। ছোটদাদু অন্ধকার পথে পা ফেলছেন, পা দিয়ে একটা আলো ঠিকরোচ্ছে। যেন টর্চলাইট হাঁটছে, যার ফোকাসটা নীচের দিকে। আমার সবেতেই ভীষণ ভয়। এত পরিচিত একজন মানুষকে ভীষণ অপরিচিত লাগছে। এর নামই কি ডাকিনী বিদ্যা? অস্বাভাবিক একটা আলো। নীল তার রং। সেই আলোয় ঘাস আগাছা স্পষ্ট। ছোট ছোট ব্যাং থমকে আছে লাফ মারার আগে। জ্বলজ্বল করছে ছোট ছোট চোখ। নানারকম পোকা। ছোটদাদু চলেছেন অলৌকিক শরীর নিয়ে। কোন বিজ্ঞানে সম্ভব হচ্ছে। প্রশ্ন আসছে। সাহস হচ্ছে না করার। মানুষটি এখন আমার সম্পূর্ণ অচেনা। মহাকাশ থেকে নেমে আসা মহাজীবের মতো। আলোয় আলোকময় করে হে, রবীন্দ্রনাথের গান মনে পড়ছে, তোমার আলো গাছের পাতায় নাচিয়ে তোলে প্রাণ। তোমার আলো পাখির বাসায় জাগিয়ে তোলে গান।
আমাকে সঙ্গে আনার কারণ, আমার অবিশ্বাস ভাঙাবেন। আমি যা পারি না, আমি যা জানি না, আমি যা দেখিনি তা নেই। এই আমার বিশ্বাস। বাকিটা অবিশ্বাস। আমার সামনেই ছোটদাদু। হঠাৎ বললেন, চার পাশে সাদা সাদা সুবাসিত ফুল নেই কেন? ফুল! ফুল!
ভেলকি হয়ে গেল। ফুটফাট, ফুটফাট। ফুলে ভরে গেল। গোয়ালের গন্ধ ভরে গেল কনক চাপার গন্ধে। আমি কি জেগে আছি, না স্বপ্নে ভাবছি! এ কেমন ঘোর! ছোটদাদু জলে নেমে গেলেন। সে আর এক অলৌকিক দৃশ্য। যেন চাঁদ পড়েছে জলে। একটা আলোর শরীর জলের তলা পর্যন্ত ঝিলঝিল করে নেমে গেছে। এত আলো যে দেখতে পাচ্ছি ছোট ছোট মাছ খেলা করছে। কী সুন্দর! স্লেটের মতো কালো আকাশ। খণ্ড খণ্ড তারা। ফুলের গন্ধ। মনে হয় স্বর্গে আছি!
জলে ওই অপূর্ব দৃশ্য দেখে মনে হল কেন আমি ম্যাজিক ভাবছি? আমার সেই শ্লোকটি যে মনে পড়ছে এই মুহূর্তে। কেন মনে পড়ছে? আমি সম্পূর্ণ আবিষ্ট। আমি কে? আমি কোথায়? সব ভুল। হয়ে যাচ্ছে। প্রভাবের এক বৃত্তের মধ্যে ঢুকে গেছি আমি। যা মনে আসার কথা নয়, তাই মনে আসছে। সেরেছে, ভক্তি আসছে। একটা লীলার মধ্যে ঢুকে গেছি আমি। শ্রীরাধিকা কৃষ্ণকে দেখেছেন। কৃষ্ণ কেমন, বর্ণনা দিচ্ছেন বিশাখাকে : কুরঙ্গমদজিবপুঃ পরিমলোর্মি কৃষ্টাঙ্গনঃ ইত্যাদি। কস্তুরীকে হার মানায় এমন দেহের সুগন্ধের ঢেউ দিয়ে যার আনন পরিমার্জিত, নিজের অস্থিত অষ্টনখে উৎপলের গন্ধযুক্ত, নতুন চাঁদের মতো চন্দনের ও অগুরুর সুগন্ধ যুক্ত হে মদনমোহন।
সেই দৈবী দেহ আর এই দেহ, তফাত কোথায়? এরই নাম যোগবিভূতি। যোগে সবই সম্ভব। ছোটদাদু আমাকে একদিন ছান্দোগ্য উপনিষদ বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন। আমাকে নিয়ে যে চেষ্টা করেননি তা নয়। শ্বেতকেতুর গল্প বলছিলেন। উদ্দালক শ্বেতকেতুকে আদেশ করলেন, ওই জলের পাত্রে এই লবণ খণ্ডটা ফেলে দাও। শ্বেতকেতু আদেশ পালন করলেন। উদ্দালক বললেন, যাও, এইবার তুমি রাতের বিশ্রাম নাও। কাল সকালে আবার দেখা হবে। সকালে শ্বেতকেতু এলেন।
