একটি মানুষের আরেকটি মানুষ দরকার হয়, একটি শরীরের আরেকটি শরীর দরকার হয়, শরীরকে কেউ এড়াতে পারে না; শরীরটি ঠিক থাকলে মনটা ঠিক থাকে, সব ঠিক থাকে। মানুষ বা আমার গোত্রটি অবশ্য শরীরের কথা স্বীকার করতে চায় না, অনেকগুলো মিথ্যে কথা বলে, আর সারাক্ষণ অসুস্থ থাকে। এখন ইসমতকে যদি বলি একটি পুরুষ নিয়ে কয়েক ঘণ্টা চমৎকার সময় কাটিয়ে দে, মদনের কথা আর মনে। পড়বে না, ইসমত আমাকে খুব খারাপ ভাববে, মদনের থেকেও খারাপ ভাববে, কিন্তু আমি জানি ইসমত সেরে উঠবে, রিকশা নিয়ে তাকে ছোটাছুটি করতে হবে না। একবার আমি ফিরোজাকে সারিয়ে তুলেছিলাম, ফিরোজা রোদের মতো ঝরঝরে হয়ে উঠেছিলো, মনেই হয় নি তার জীবনে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা মাত্র কয়েক দিন আগে ঘটে গেছে। ফিরোজা জন্মের পর কোনো শোকের অভিজ্ঞতা বোধ করে নি, সুখ ছাড়া আর কিছুই সে জানে না, সে কোনো মৃত্যু দেখে নি, কখনো কাঁদে নি; কয়েক বছর আগে হঠাৎ ফিরোজার পিতা মারা যান। তাঁর মরার কোনো কথাই ছিলো না।
ভদ্রলোকের অত্যন্ত চমৎকার স্বাস্থ্য ছিলো, সব কিছুতে তীব্র আকর্ষণ ছিলো, নারীও তার বাইরে ছিলো না; আমার খুব ভালো লাগতো ভদ্রলোককে, তিনি ক্লাবে থেকে ফিরেই। টেলিফোন করতে গিয়ে পড়ে যান। কাকে তিনি টেলিফোন করতে চেয়েছিলেন কেউ। জানে না, যন্ত্রটি হাতে নিয়েই তিনি নিচে পড়ে যান; আর ওঠেন নি। তিনি ডায়াল শেষ করে যেতে পারেন নি। ফিরোজার ওই প্রথম শোক আর কান্নার অভিজ্ঞতা। প্রথম কয়েক দিন ফিরোজার কান্না ভালো লাগছিলো আমার;–মেয়েকে, অর্চিকে, জড়িয়ে ধরে কাঁদছে ফিরোজা, নিজের জন্মদাতার জন্যে কাঁদছে, বুক ভরে কাঁদছে, অর্চি বুঝতে পারছে না, তবু কেঁদে ফেলছে, দেখে আমার ভালো লাগছিলো। কান্নায় বাড়িঘর পবিত্র হয়ে উঠছিলো; বাতাস শুদ্ধ হয়ে উঠছিলো। ফিরোজা বালিশ চেপে ধরে কাঁদছিলো কখনো, বালিশটাকে রজনীগন্ধার গুচ্ছের মতো লাগছিলো, পবিত্র শোকের সুগন্ধ উঠছিলো চারদিকে; আবার কখনো টেলিভিশন দেখতে দেখতে কাঁদছিলো, পরিশুদ্ধ হয়ে উঠছিলো টেলিভিশনের সমস্ত আবর্জনা। কেঁদে কেঁদে ফিরোজা রূপসী হয়ে উঠছিল, আমার চোখে তাই লাগছিলো, তার মুখের ত্বক মসৃণ হয়ে উঠছিলো, চোখে সৌন্দর্য ঝলমল করছিলো।
ফিরোজার কান্নায়, দিন দশেকের মধ্যে, আমি বিরক্তি বোধ করতে থাকি, বাসাটিকে আমার স্যাৎসেঁতে লাগে; মনে হতে থাকে সব কিছু ভিজে যাচ্ছে, জানালায় পর্দায়। আলনায় বিছানায় বালিশে মেঝেতে শোকেসে পুতুলের মুখে ময়লা লাগছে; কোনো কিছু ছুঁতেই আমার ঘেন্না লাগতে থাকে। রাতে ঘুমোতে গিয়ে দেখি ফিরোজা কাঁদছে, বালিশ থেকে মাথা তুলতে পারছে না, দিন দশেক ধইে মাথা তুলতে পারছে না সে। প্রথম আমার দ্বিধা লাগছিলো, কোনো শোকার্তকে জড়িয়ে ধরা ঠিক হবে কি না, তার কাপড় পেরিয়ে চামড়া পর্যন্ত পৌঁছোনো ঠিক হবে কি না, ব্যাপারটি বলাকার হয়ে যাবে কি না, আমি একটি অপরাধ করতে যাচ্ছি কি না, এসব দ্বিধা আমাকে বিব্রত করছিলো; কিন্তু। ফিরোজার কান্না সহ্য করা অত্যন্ত অসম্ভব হয়ে উঠছিলো আমার পক্ষে। আরো কান্না সহ্য করতে হলে আমার মাথার ভেতরটা পাথরের মতো নিরেট হয়ে উঠবে, ভারী হয়ে উঠবে, শূন্য হয়ে উঠবে মনে হচ্ছিলো। কিন্তু ফিরোজাকে জড়িয়ে ধরলে আমাকে সে একটা বদমাশ ভাবতে পারে, যে পিতৃবিয়োগাতুর কন্যাকেও রেহাই দেয় না, যার কোনো নৈতিকতা নেই; তবে আমি ফিরোজাকে জড়িয়ে ধরলে সে সাড়া দেয়, তাতে আমি বিব্রত হই, একটি হুক খুলতে পারছিলাম না, কয়েকবার চেষ্টা করার পরও সেটি আটকে থেকে প্রাণপণে দায়িত্ব তার পালন করছিলো, হুক নিয়ে আমি সব সময়ই সমস্যায় পড়ি, আমি খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম ফিরোজাকে পীড়িত করছি ভেবে, কিন্তু ফিরোজা আঙুল দিয়ে সেটি অবলীলায় খুলে দেয়, অন্যান্য খোলার কাজগুলোও সে নিজেই করে, আগে যা সে করতে চাইতো না। ফিরোজার কান্না কমে আসতে থাকে, আমি যতোই অগ্রসর হতে থাকি সে ততোই শোক থেকে উঠে আসতে থাকে, কমতে থাকে স্যাঁৎস্যাঁতে ভাবটি, ফিরোজার দীর্ঘশ্বাসগুলোর আয়তন ও উত্তাপ বদলে যেতে থাকে। আমার ভয় হতে থাকে যে আমি সমাপ্ত হলে ফিরোজা আবার হয়তো কান্নায় ফিরে যাবে, আমার সমাপ্ত হওয়া চলবে না; ফিরোজারও বোধ হয় একই ভয় হতে থাকে।
কেমন আছো? খুব ক্লান্ত আমি জিজ্ঞেস করি।
ভালো, ফিরোজা বলে, ভালো; তাকে অক্লান্ত মনে হয়।
এবার রাখবো? আমি ভয়ে ভয়ে অনুমতি চাই।
না, না, ফিরোজা বলে, এতো তাড়াতাড়ি না।
ফিরোজা আর কাঁদছে না, মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, তবে সেগুলোর রূপ বদলে যাচ্ছে, রঙ বদলে যাচ্ছে। আমি কোনো অনৈতিক কাজ করছি না, কোনো শোকাতুরের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছি না, আমি বরং তাকে শোক থেকে তুলে আনছি। ফিরোজাও বড়ো বেশি চাইছে শোক থেকে উঠে আসতে, তার প্রতিটি প্রত্যঙ্গ কান্না ভুলে যেতে চাচ্ছে, আমি তাকে পিতৃশোক থেকে উদ্ধার করছি, কোনো অনৈতিক কাজ করছি না। ফিরোজা ঘুমিয়ে পড়ে এক সময়, ভোরে তাকে ঝরঝরে দেখায়, সে উঠে এসেছে, সে যে গভীর শোকের মধ্যে ছিলো এতো দিন তার কোনো ছাপ তার মুখে আমি দেখতে পাই না।
ফিরোজা আর আমার ব্রিজটি টিকে আছে, হয়তো টিকে থাকবে, একটা সময় এসেছিলো যে ব্রিজটি ভেঙেই পড়ে যাচ্ছিলো, যদিও ভেঙে ফেলার মতো সাহস হয়তো আমার হতো না; আমি সকলের চোখে ভালো থাকতে চাই, ছেলেবেলা থেকেই, ভাঙাভাঙি এখানে কেউ পছন্দ করে না, সবাই ধসে পড়ার পরও ভাব করতে পছন্দ করে যে তাদের ব্রিজের গায় একটিও আঁচড় লাগে নি, ধ্বংসস্তূপের ওপরে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে থাকতে পছন্দ করে সবাই, আমিও করি। তখন অর্চি এসে ব্রিজটাকে রক্ষা করে। অর্চি। যে এসে গেলো এটা খুবই আকস্মিক ঘটনা, কখন ঘটে যায় আমি টেরও পাই নি, ফিরোজা আর আমার মধ্যে যা ঘটতো তখন তা হতো খুবই আকস্মিক আর ক্ষণকালীন, দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারতাম না আমরা কিছু একটা করেছি। অবশ্য একেই, আকস্মিকতা আর ক্ষণকালীনতাকেই, আমি স্বাভাবিক ভাবতাম, এবং আমার ঘেন্নাও ধরে যাচ্ছিলো এর ওপর, তা ওঠা আর নামা ছাড়া আর কিছু ছিলো না। উত্তেজিত থাকতাম আমি সব সময়, চারপাশে আমি নারীর শরীর দেখতে পেতাম, ব্রিজগুলোর দিকে তাকালে নদীকে গভীর খাপ মনে হতো, ব্রিজকে মনে হতো বিশাল তরবারি। বারবার মনে হতো খাপ আর তরবারির মিল হচ্ছে না, দুটি উল্টোপাল্টা পড়ে আছে। ব্রিজে ওঠার সময় ট্রাকগুলো যে-শব্দ করে, তাকে আমার গভীর ক্লান্তির শব্দ মনে হতো। ফিরোজা আর আমি তখনো একই বিছানায় ঘুমোতাম, কিন্তু পরস্পরকে ছুঁতে ইচ্ছে হতো না; ফিরোজা একবার খুব হতাশ হয়ে অন্য দিকে ফিরে শুয়ে বলেছিলো, না, তুমি ঠিক মতো পারো না, আমার তা মনে হতো বারবার; কে পারে, কে পারে, এমন সব প্রশ্ন জাগতো। ওই অবস্থায়ই অর্চি এসে ব্রিজটাকে টেনে ধরে রাখে।
