এক দুপুরের পর বিকেলে যখন তারা ক্লান্তি থেকে ফিরে এসেছে অক্লান্তিতে, গড়াচ্ছে বিছানায়, শ্যামলী উঠি উঠি করছে, তাকে বাসায় ফিরে যেতে হবে, আর দেরি করতে পারবে না, সে, হাসান বলে, শ্যামলী, এখন উঠো না।
শ্যামলী একটু চমকে উঠে বলে, আমাকে এখন যেতে হবে।
হাসান বলে, না, তুমি এখন যাবে না।
শ্যামলী বলে, এখন তো যেতেই হবে, একটু পর ফরহাদ সাহেব বাড়ি ফিরবে, আর দেরি করা ঠিক হবে না।
হাসান বলে, কে ওই ফরহাদ সাহেবটি?
শ্যামলী বলে, কেনো, আমার হাজব্যান্ড।
হাসান বলে, ওটি তোমার কেউ নয়, তুমি তো সব সময় বলে ওই লোকটিকে তুমি ভালোবাসো না, তাই ওর জন্যে তোমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
শ্যামলী বলে, তা তো সত্যিই তাকে আমি ভালোবাসি না, তার জন্যে আমার আবেগ নেই, কিন্তু আমি তার ওয়াইফ।
হাসান জিজ্ঞেস করে, আমাকে তুমি ভালোবাসে?
শ্যামলী বলে, হ্যাঁ, তুমি তো জানোই তোমাকে আমি কতোখানি ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।
হাসান বলে, তাহলে এটা কী ক’রে হয় যাকে ভালোবাসো না তার জন্যে তুমি যাকে ভালোবাসে তাকে ছেড়ে যাচ্ছে?
শ্যামলী বলে, আমি যে তার সংসারে আছি; তাই তার ফেরার আগে আমাকে বাসায় ফিরতেই হবে, নইলে সে রাগ করবে।
হাসান বলে, ফিরুক, রাগ করুক, তুমি যাবে না।
শ্যামলী বলে, না গেলে কী ক’রে চলবে?
হাসান বলে, তুমি আজ বিকেল ভ’রে থাকবে, সারারাত আমার সাথে থাকবে।
শ্যামলী বিস্মিত হয়ে বলে, সারারাত?
হাসান বলে, হ্যাঁ, সারারাত।
শ্যামলী বলে, তা কী ক’রে হয়? বাসায় ফরহাদ সাহেব আছে, ছেলেমেয়েরা আছে; আমি কী ক’রে সারারাত থাকি?
হাসান বলে, থাকুক, তুমি আমার সাথে সারারাত থাকবে।
শ্যামলী বলে, না, এটা হয় না, হাসান।
হাসান বলে, আমি সারারাত তোমাকে দেখতে চাই, সারারাত তোমাকে জড়িয়ে ধ’রে ঘুমোতে চাই, তুমি থাকবে।
শ্যামলীর সময় নেই, তাকে এখনি বেরিয়ে যেতে হবে, নিচে গিয়ে স্কুটার ধরতে হবে, বাড়ি পৌঁছোতে হবে ফরহাদ সাহেবের ফেরার আগে। শ্যামলী উঠে ঠিকঠাক হয়ে হাসানকে একটি চুমো দিয়ে বেরিয়ে যায়। হাসান শুয়ে থাকে, শ্যামলী যে বেরিয়ে যাচ্ছে সেদিকেও তাকিয়ে দেখে না।
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ – ১২
সালেহ ফরিদউদ্দিন কবি হিশেবে নাম করেছে, এর মাঝে পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ বের ক’রে ফেলেছে, কবিতা ছাড়া আর কিছু সে বোঝে না; তার এলোমেলো কাতর হাহাকারভরা পংক্তির সমষ্টি খুব আলোড়িত করছে তরুণদের; মাঝেমাঝে সালেহ আসছে। হাসানের অফিসে; আজও এসেছে। খুব শুকিয়ে গেছে সালেহ, হাসানের প্যাকেট থেকে একটির পর একটি সিগারেট টানছে, চা খাচ্ছে কাপের পর কাপ, কেঁপে কেঁপে উঠছে থেকে থেকে, নিজের কবিতা আবৃত্তি করছে একটির পর একটি, ভুল করছে আবার সংশোধন করছে।
সালেহ বলে, দোস্ত, মনে হইতেছে আমি পাগল হইয়া যাইতেছি।
হাসান বলে, না, না, তুমি পাগল হবে কেনো? তোমাকে আরো অনেক কবিতা লিখতে হবে, তুমি চমৎকার লিখছো।
সালেহ বলে, কবিতা লেখনের থিকা পাগল হইতেই আমার বেশি ভাল লাগতেছে। পাগল হওন অনেক সুখের, গাঁজা খাওনের মতন, মাথার ভিতর মাঘের কুয়াশার মতন শাদা হইয়া কবিতা নামতেছে, ম্যাঘের মতন কবিতা জমতেছে, এত ভাল কবিতা হয়। না, জীবনানন্দের থিকা অনেক ভাল।
হাসান জিজ্ঞেস করে, সেগুলো লিখে ফেলছো না কেনো?
সালেহ বলে, আরো দোস, ল্যাখতে গ্যালেই দেখি সেইগুলি নাই, কুয়াশা নাই, ম্যাঘ নাই, কবিতা নাই, খালি আজেবাজে লাছ। কিন্তু পাগল হওন মায়ের প্যাটে ঘুমাই থাকনের মতন, পাগল হওয়াই হইব আমার শ্রেষ্ঠতম কবিতা।
সালেহ চোখ বন্ধ ক’রে নিজের কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে।
হাসান বলে, তোমার ডাক্তার দেখানো দরকার, সালেহ।
সালেহ বলে, ডাক্তার দেখাইছি, ডাক্তার বলছে আমার সিফিলিসের সিম্পটম দেখা দিছে, শুইন্যা আমার ভাল লাগতেছে। একদিন আমি নিজের নাম ভূইল্যা যামু, আয়নায় নিজেরে দেইখ্যা সালাম দিমু, বাইর প্রচ্ছদ দেইখ্যা ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া নিজের নাম লেখুম।
হাসান চমকে ওঠে, বলে, তোমার ভালো চিকিৎসা দরকার।
সালেহ বলে, বড় কবিগো সিফিলিস হইতেই হয়, দোস্ত, সিফিলিস হইল বড় কবিগো রোগ, সিফিলিস হইল কবিতার গডেজ, তোমরা বড় কবি হইতে পারব না, বদলেয়ারের সিফিলিস হইছিল, হেল্ডার্লিনের সিফিলিস হইছিল, নজরুলের সিফিলিফ হইছিল, আমারও সিফিলিস হইছে।
হাসান বলে, না, সালেহ, সব বড়ো কবির সিফিলিস হয় নি; কালিদাস, দান্তে, চণ্ডীদাস, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, এলিয়টের সিফিলিস হয় নি; এবং হেসে বলে, আমারও সিফিলিস হয় নি; কবিতার সাথে সিফিলিসের কোনো সম্পর্ক নেই; তুমি চিকিৎসা করাও।
সালেহ বলে, চিকিৎসা করাইতে ইচ্ছা হয় না; আমার তরুণ কবি হিশাবে মইরা অমর হইতে ইচ্ছা হয়; তুমি আমারে লইয়া একটা কবিতা একটা প্ৰবন্ধ ল্যাইখো, আমি অমর হমু।
সালেহ বছরখানেক ধ’রে আছে ফরিদা খানমের সাথে। ফরিদা দশটি বছর ও তিনটি দেশিবিদেশি বিয়ে কাটিয়ে এসেছে আমেরিকায়, প্রচণ্ড রূপসী ও প্রচণ্ড দানবী সে, ফিরে এসেই তার পরিচয় হয়েছে সালেহর সাথে, এবং উন্মুল উদ্বাস্তু অসহায় সালেহকে তুলেছে নিজের ফ্ল্যাটে। সালেহর কাতর কবিতার সে তীব্ৰ অনুরাগী, বেশ কিছু অনুবাদ করেছে ইংরেজিতে এবং নিজেও লিখেছে একগুচ্ছ তীব্ৰ কবিতা।
