ননীবালা হাল ছাড়েন না। মুখে কিছু না বলে পান আর জরদার কৌটো খুলে বসেন। বলেন—কখন থেকে ভাত তরকারি গরম করে বসে আছি। গরম কি থাকে। শীতকাল, টপ করে জুড়িয়ে যায়।
—তুমি খাওনি?
ননীবালা ছেলের চোখের দিকে চেয়ে একটু তাচ্ছিল্যের মতো করে বলেন—খাব। তাড়া কী? তুইও দুটো মুখে দিতিস!
সোমেন একটা শ্বাস ছেড়ে বলে—সহজে ছাড়বে না, না বুড়ি?
—ছেলেরা না খেলে মা যে বড় জব্দ হয়ে যায়।
—দাদা ফিরেছে?
—হুঁ। কখন শুয়ে পড়েছে। একটু আগে শুনছিলাম ও-ঘরে কথাবার্তা চলছে। ভাব হয়ে গেছে বুঝি।
—আবার ওদের দরজায় কান পেতেছিলে? সোমেন মার দিকে কটমট করে তাকায়।
ননীবালা বিরসমুখে বলেন—তুই কেবল আমার কান-পাতা দেখিস। কান পাতব কেন? জোরেই বলছিল, শুনেছি।
সোমেন হতাশ হয়ে বলে—তোমাকে নিয়ে পারি না। যত গণ্ডগোলের মূলে তুমি ঠিক থাকবে। ছেলে আর ছেলের বউ ঘরে কী বলে না বলে তা শুনতে তোমার লজ্জা করে না?
ননীবালা অন্য সময় হলে এ কথায় রেগে যেতেন। কিন্তু এখন তাঁকে খুবই ভীতু আর হতাশ দেখাচ্ছিল। বললেন—সংসারের সব কি তুই বুঝিস? ছেলেদের ভালমন্দের জন্য মাকে অনেক অন্যায় করতে হয়। লজ্জা-ঘেন্না থাকলে চলে না।
সোমেন স্থির দৃষ্টিতে ননীবালার চোখের দিকে চেয়ে বলে—তার মানে তুমি আড়ি পেতে ওদের কথা শুনেছ।
—তুই দুটি খেয়ে আমাকে ছেড়ে দে তো! শীতের রাত, তাও অনেক বেজে গেছে। বলে সোজা পানটা মুখে না দিয়ে রেখে দেন ননীবালা। ছেলের দিকে চেয়ে বলেন—চল।
সোমেন কথা বলে না। কিন্তু খেতে যায়।
কয়েক দিন হল, রান্নাঘরের এক ধারে টেবিল পাতা হয়েছে। টেবিলটা ভালই। শ’চারেক খরচ করে দাদা বানাল। ওপরে কালচে রঙের সানমাইকা লাগানো, পায়ায় পেতলের শু। চেয়ারগুলোও চমৎকার। রান্নাঘরটা বেশ বড়, তবু টেবিল চেয়ার পাতার পর আর বেশি জায়গা নেই। ননীবালা টেবিলে খান না, তাঁর এঁটো বাতিক। টেবিলে খেলে সর্বস্ব এঁটো হয়। সোমেন টেবিলে খেতে বসলে মা তার পায়ের কাছটিতে একটা ছোট্ট কাঁসার বাটিতে নিজের জন্য একটু ভাত আর মাছের ঝোল নিয়ে বসেন। ভাল করে খেতে পারেন না। অনিচ্ছায় মুখে গ্রাস তুলে অনেকক্ষণ ধরে চিবোন।
সোমেন জিজ্ঞেস করে—আর কোনও হাঙ্গামা হয়নি তো?
—না, কী হবে! আমে দুধে মিশে গেছে বাবা। আঁটিটা পড়ে আছে।
সোমেন চাপা ধমক দিয়ে বলে—কেন, তাতে তোমার গা জ্বালা করছে? ওদের মিলমিশ হলে তোমার ক্ষতিটা কী হল?
—ক্ষতির কথা বলেছি? মিলমিশ হয়েছে ভালই তো।
—তবে বলছ কেন?
ননীবালা চুপচাপ ভাতের গ্রাস চিবোতে থাকেন। হঠাৎ বলেন—তোর চাকরিটা হল না কেন?
—হল না, এমনিই। সোমেন বিরক্ত হয়ে গেল—কেন, আমার চাকরি দিয়ে কী হবে?
—মাঝে মাঝে ভাবি, তোর একটা কিছু হলে বরং একটু আলাদা বাসা-টাসা করলে হয়।
সোমেন উঠে পড়ে।
ননীবালা খুব সম্প্রতি পান আর জরদার নেশা ধরেছেন। শোওয়ার আগে পান না হলে আজকাল চলে না। পানের বাটা নিয়ে বসতে যাবেন, জাঁতিটা মেঝেয় পড়ে শব্দ হল।
সোমেন শুয়েছিল, বলল—আঃ।
—জেগে আছিস?
—না ঘুমোচ্ছি। বিরক্ত হয়ে সোমেন বলে।
ননীবালা শ্বাস ফেলেন।
সোমেন পাশ ফিরে বলে—ইচ্ছে করে জাঁতিটার শব্দ করলে না?
—না, পড়ে গেল।
ও-সব চালাকি আমি জানি। আমাকে জাগিয়ে এখন ওদের নিন্দেমন্দ করতে বসবে তো!
—সংসারে থাকতে হলে অমন উদোর মতো থাকবি কেন? সব জেনেবুঝে থাকতে হয়।
—জেনেবুঝে আমার দরকার নেই। আমি ভীষণ টায়ার্ড, শুয়ে পড়ো, বিরক্ত কোরো না।
ননীবালা কথা বলেন না। পান খেয়ে ডাবরে পিক ফেলেন। বাতি নিবিয়ে মশারির মধ্যে ঢুকে যান। কিন্তু নানারকম শ্বাসের শব্দ আসে। একবার অস্ফুট কণ্ঠে বলেন—যা মশা! তারপর আবার খানিকক্ষণ চুপ থেকে সোমেন জেগে আছে কি না বুঝবার চেষ্টা করেন। আপন মনেই বলেন—আজ বাচ্চা দুটোকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল। ওরা যেতে চায়নি। আমার কাছে তো বড় একটা শুতে পায় না।
—বেশ করেছে নিয়ে গেছে। সোমেন বালিশে কান চেপে রেখে বলে—ওদের বাচ্চা ওরা নিয়ে যাবে না কেন? তা ছাড়া তুমিই তো বলো যে ওরা তোমার ঘর নোংরা করে, ওদের পায়ের ধুলোবালিতে তোমার বিছানা কিচকিচ করে!
—সে তো সত্যি। তোরা চারটে ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার পর থেকে বাচ্চাকাচ্চা বড় একটা টানি না তো!
—তা হলে আর দুঃখ কীসের?
ননীবালা হঠাৎ একটু চড়া গলায় বলেন—সব না শুনে অত রাগ-রাগ করছিস কেন?
—শুনতে চাই না। ঘুমোও।
ননীবালা মিইয়ে গিয়ে বলেন—হুঁ! ঘুম কি আর হুট বলতেই আসে! আজ বায়ুটা চড়ে গেছে। ঘুম আর হবে না।
—তা হলে আমাকে ঘুমোতে দাও।
—ওখানে কী কী খাওয়াল আজ? ননীবালা প্রসঙ্গ পালটান খুব কৌশলে।
—রণোটা সারাদিন কোথায় কী খেল কে জানে! বহেরুর ওখানে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানেই গিয়েছিল বুঝতে পারলাম না। কথা বলতে সাহস পেলাম না। রাতে কিছু খেল না। মুখখানা শুকনো দেখাচ্ছিল। খায়নি বুঝি সারাদিন।
—না খাওয়াই উচিত। যে বউয়ের গায়ে হাত তোলে তার আবার খাওয়া!
—সেটা অন্যায় করে ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু রণো তো অত রাগ করার ছেলে না। বউমা কিছু একটা অন্যায় বলেছে নিশ্চয়ই। কাল বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকেই তো টিক-টিক করছিল।
সোমেন কেঁকে উঠে বলে—যা খুশি করুক, তা বলে গায়ে হাত তুলবে!
—বলছি তো সেটা অন্যায় করে ফেলেছে। মানুষ কি সব সময়ে নিজের বশে থাকে?
