—হুঁ।
—কবারে?
—খেয়াল করিনি। কেন?
—ভাবছিলাম। জানিস অপা, সোমেনের খুব ডিটারমিনেশন, ও দেখিস, উন্নতি করবে।
—কীসে বুঝলি? অপালা দোলনা থেকে নেমে কাছে আসতে আসতে বলে।
—ঢিল ছোঁড়া দেখে।
অপালা শ্বাস ছেড়ে বলে—ঠিকই, ও খুব বীর।
অণিমা বিচ্ছুর মতো মুখ করে বলে—না, না, ওকে এতকাল যা ভেবেছিল ও কিন্তু তা নয়। ঢিলটা লাগানো খুব শক্ত ছিল, ও কিন্তু পেয়েছে।
সোমেন রেগে গিয়ে বলে—তুমিই তো ঢিলটা লাগাতে বললে।
অণিমা হঠাৎ চোখ বড় করে তাকায়। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে সোমেনের দিকে, তারপর যেন সম্মোহন থেকে জেগে উঠতে উঠতে বলে—তুমি সেজন্যই অত সিরিয়াস হয়ে গেলে? না হয় আমার মুখ থেকে একটা কথা বেরিয়েই গেছে! বলে আবার বিহ্বল চোখে চেয়ে থাকে অণিমা। আস্তে করে বলে—ভেবেও সুখ যে একজনের কাছে আমার কথার এত দাম। সোমেন! তুমি কী তবে বলে থেমে চেয়ে থাকে অণিমা।
সোমেন মাথা নাড়ে। বড় বড় চোখে অণিমার দিকে তাকায়। আস্তে করে গাঢ় স্বরে বলে—তবে আজ বলি?
অণিমা মাথা নেড়ে কানে হাত চাপা দেয়, ভয়ার্ত গলায় বলে—না, না, এখন নয়। যেদিন ফুল-টুল ফুটবে, চাঁদ-টাঁদ উঠবে, লোডশেডিং থাকবে, সেদিন দূরে কোথাও গিয়ে—
অপালা ব্যাপারটা দেখে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল। এতক্ষণে হঠাৎ শ্বাস ছেড়ে বলল—মাইরি, পারিস তোরা! কিন্তু ও কথাটা কী। সোমেন কী বলতে চাইছিল, আর তুই-ই বা চাঁদ-ফুল-লোডশেডিং কী বললি ও-সব?
—ও একটা গোপন কথা। অণিমা বলে।
—আমার সঙ্গে কেউ গোপন কথা বলে না, মাইরি! অপালা দুঃখের গলায় বলল—বলবি। না, এই সোমেন? কিরে?
—ওটা কেবল আমার আর অণিমার একটা ডায়লগ। তুই বুঝবি না। সিক্রেট।
—ইস, সিক্রেট! মারব থাপ্পড়। বল শিগগির!
—না।
—এই সোমেন!
অপালা রেগে সোমেনের হাত খামচে ধরে। অন্য হাতে একটা থাপ্পড় কষায় পিঠে।
সোমেন বলে—ইস, হাতে কী জোর! একদম ব্যাটাছেলে।
—বলবি না?
—তোর বিয়ে হবে না, বুঝলি! সোমেন বলে—হলেও বর ফেরত দিয়ে যাবে। এমন ব্যাটাছেলে মার্কা মেয়ে জন্মে দেখিনি।
—ছেলেগুলো মেনিমুখো হলে আমাদের ব্যাটাছেলে হতেই হয়।
সোমেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলে—সেজন্যই ছেলে আর মেয়েতে ফ্রি মিক্সিং ভাল নয়। দুপক্ষেই ভেজাল মিশে যায়।
অণিমা গম্ভীর হয়ে বলে—সেই জন্যই বুঝি তুমি আমাদের সঙ্গে সহজে মিশতে চাও না সোমেন! ছোঁয়াচ বাঁচাচ্ছ?
—বটেই তো। আমার বউ হবে একটা আস্ত মেয়েমানুষ, তার মধ্যে ব্যাটাছেলের যেমন ভেজাল চলবে না, তেমনি আমার মধ্যে মেয়েছেলের ভেজাল থাকলে সে-ই বা খুশি হবে কেন?
—ইস! অপালা ঠোঁট ওলটায়—বউ! কোন বউ তোর জন্য ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে আছে? ততাদের জেনারেশন বিয়ে হবে ভেবেছিস? বউ! মারব থাপ্পড়।
—তুই ঠিক পূর্বার মতো হয়ে যাচ্ছিস। আমার বউয়ের কথা শুনে তোর চটবার কী? সোমেন দু-পা পিছিয়ে গিয়ে বলে—আমার একটা বউ হতে নেই? ভিখিরিরও আর কিছু না হোক একটা বউ হয়।
—কিন্তু তোর হবে না। বলে অপালা আঙুল তুলে তেড়ে আসে—তোর কিছুতেই হবে না।
সোমেন তেমনি তটস্থ ভাব দেখিয়ে পিছিয়ে গিয়ে বলে—কিন্তু প্রায় হয়ে গেছে যে!
অপালা থমকে গিয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকায়, বলে—কে?
সোমেন তখন গালগলা চুলকোয়, চোখমুখ বিকৃত করে নানারকম, তারপর হঠাৎ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলে—দেখছিও তো কবো না, লম্বা ঘুঁষি মারেগা, হা রে মনোপাগলা—
—ও কিরে? অপালা চেঁচিয়ে হেসে ওঠে।
—মনোপাগলা নামে একটা পাগল আসত আমাদের বাড়িতে। সে বলত।
অণিমা আর একটা কপট শ্বাস ফেলে বলে—তুই বুঝিসনি অপা।
—কী বুঝিনি?
—সোমেন প্রেমে পড়েছে। কিন্তু তার কথা আমাদের কাছে বলবে না। ওই ছড়াটার মধ্যে সেটাই বলে দিল। দেখেছে, বলবে না। না, সোমেন?
—মাইরি! অপালা চোখ বড় করে বলে—পড়েছিস?
—হুঁ
—কেমন দেখতে রে?
—দেখছিও তো কবো না!
—আবার?
সোমেন সিগারেট ধরায়, বলে—কী করে বলি কেমন দেখতে! তাকে এখনও ঠিক চোখে দেখিনি, তবে বাঁশি শুনেছি।
—বল না! বল না!
সোমেন অণিমার দিকে তাকায়, হঠাৎ গাঢ় স্বরে বলে—এই অনি, বলে দাও না সোনা! আর লুকিয়ে রেখে লাভ কী?
অণিমা ইয়ারকিটা লুফে নেয়। লাজুক নতমুখে বলে—যাঃ, আমার ভারী লজ্জা করে। তুমিই বলো।
বলে অণিমা আঙুল কামড়ায়।
ধুস! অপলা ভারী হতাশ হয়ে বলে—সেই পুরনো ইয়ারকি। যা ফাজিল হয়েছিস না তোরা। সোমেন, বলবি না তো?
—দেখছিও তো কবো না—সোমেন সুর দিয়ে বলে—লম্বা ঘুঁষি মারেগা, হা রে মনোপাগলা
ভেদ হয় না, কিছুতেই ভেদ হয় না বলে অপালা হঠাৎ দু-পা এগিয়ে এসে সোমেনের সোয়েটারটা বুকের কাছে খিমচে ধরে বলে—বলবি না? বল শিগগির!
সোমেন বলে—ছাড় ছাড়, মোটে একটাই সোয়েটার আমার, বেকার মানুষ।
—বল তা হলে!
—বলছি, বলছি, পূর্বা।
সোয়েটারটা মুঠো করে মোচড়ায় অপালা—বল শিগগির ঠিক করে।
—বলতেই হবে?
—ছিঁড়লাম কিন্তু।
—তুই।
অপালা একটা ধাক্কা দিয়ে ঘন শ্বাস ফেলে বলে—ইস, সাহস কত!
পিকনিক থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। বলে গিয়েছিল, রাতে খাবে না। তার কারণ, এ বাড়িতে অনুগ্রহণ করতে তার অরুচি।
জামাকাপড় ছেড়ে অনেকটা ঠান্ডা জল খেয়ে শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল সে। ননীবালা এসে বলেন—দুটো ভাত খাবি না?
—না।
—রাতে না খেলে হাতি শুকিয়ে যায়, যা হোক দুটো খা।
সোমেন একটু রেগে গিয়ে বলে—না, খিদে নেই। খাওয়া নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করো না তো, ভাল লাগে না।
