রাতে শুয়ে শীলা বলল—শুনছ?
—কী?
—বউদির নামে জমিটা দিও না। আমি অনেক ভাবলাম সারা সন্ধ্যা।
—কী ভাবলে?
—দাদা নানা ছুতোয় ইচ্ছে করেই বউদির নামে প্লটটা কিনছে।
—কিনুক না!
—তুমি কিছু বোঝে না। বউদির নামে বাড়ি হলে সেখানে সোমেন বা মার দাবি-দাওয়া থাকে না। আমরাও সেখানে বাপের বাড়ি বলে মাথা উঁচু করে যেতে পারব না। তুমি ওকে বেচো না।
অজিত সামান্য উম্মার সঙ্গে বলে—সেটা রণেন থাকতে-থাকতেই বলতে পারতে। ওকে কথা দিয়ে দিলাম, তা ছাড়া ও বউয়ের গয়নাটয়নাও বেচেছে বলল।
—ছাই। বউদি গয়না বেচতে দেওয়ার লোক কিনা! তা ছাড়া সবাই জানে দাদা দ’হাতে পয়সা রোজগার করছে। বিয়ের পর থেকেই ও যথেষ্ট পালটে গেছে। তোল্লা ঘুষ খায়। দশ-বিশ হাজার টাকার জন্য ওকে বউদির গয়না বেচতে হবে না। যদি বেচে তো সে লোক দেখানোর জন্য।
অজিত অন্ধকারে একটু হাসল। বলল—আমার কাছে সবাই সমান। পিসেমশাই কিনুক, কী রণেনের বউ কিনুক, কী শাশুড়িই কিনুক—আমার কিছু যায় আসে না।
শীলা ঝংকার দিয়ে বলে—কিন্তু আমার যায় আসে। তুমি দাদাকে বেচতে পারবে না।
—তা হলে কী করব?
—আমি কিনব। শীলা বলে।
—তুমি? তুমি কিনে কী করবে?
—ফেলে রাখব। যেদিন বাবা টাকা দিতে পারবেন সেদিন ছেড়ে দেব।
—তা হয় না।
—কেন?
—বড্ড দৃষ্টিকটু দেখায়। লক্ষ্মণ কী ভাববে? তা ছাড়া রণেন আর তার বউও চটে যাবে, মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেবে।
শীলা চুপ করে থাকে। ভাবে। বলে—তাহলে লক্ষ্মণবাবুর পিসেমশাইকেই বিক্রি করে দাও।
একটু স্তব্ধ থেকে অজিত বলে—রণেন কি তোমার শত্রু? সে কিনলেও জমিটা তোমার বাপের বাড়ির হাতেই থাকল।
শীলা একটু শ্বাস ফেলে বলে—পুরুষমানুষ তুমি, তোমাদের মন একরকম। মেয়েদের মনই কেবল কু-ডাক ডাকে।
—রণেনকে অত অবিশ্বাস কেন? সংসারটা তো এতকাল সে-ই টানছে। টানবেও। ছেলে হিসেবে রণেন তার সব কর্তব্যই করেছে। তোমার বাবা যখন টাকা তুলতে আসতে পারছেন না, অনিশ্চিত অবস্থায় জমিটা হাতছাড়া না করে রণেন যদি কেনেই তো তাতে দোষ কী! বউয়ের নামে কিনলেও দোষ নেই। নিজের বাড়ি বলে সে যে মা-ভাইকে বের করে দেবে, এমন তো মনে হয় না।
শীলা চুপ করে থাকে। কিছু বলার মতো যুক্তি খুঁজে পায় না বোধ হয়। এক সময়ে বলে—বাবার যে কেন এসময়ে অসুখ করল! চলো না একদিন বাবাকে দেখে আসি।
—তোমার বাবা আমাকে পছন্দ করেন না, জানোই তো!
—কাকেই বা করেন! বাবার ভালবাসা আমরাই পাইনি, যা একটু দাদা পেয়েছে। মার জীবনটা যে কীভাবে কাটল!
অনেকক্ষণ স্তব্ধ থাকে শীলা। তারপর অজিত টের পায়, শীলা ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
ভীষণ অসহায় বোধ করে অজিত। কান্নাকাটি তার সহ্য হয় না। উঠে একহাতে শীলাকে নিজের দিকে পাশ ফেরাবার চেষ্টা করতে করতে বলে—আচ্ছা বোকা তো! কাঁদো কেন? না হয় যাব শ্বশুরমশাইকে দেখতে, রণেনকেও না হয় প্লটটা না বেচলাম।
শীলা তবু কাঁদে। সাধাসাধি করে করে ক্লান্ত হয়ে গেল অজিত। ঘুমও হবে না। অগত্যা উঠে একটা ডানহিল ধরায়।
সেই শব্দে শীলা হঠাৎ ফোঁপানি বন্ধ করে বলে—তুমি চলে গেলে কেন? ভিতরে এস।
—যাচ্ছি। সিগারেটটা খেয়ে নিই।
—না। সিগারেট নেবাও।
—আঃ, একটু অপেক্ষা করো না।
—না, এক্ষুনি ভিতরে এস।
অজিত শ্বাস ফেলে বলে—কখন যে কী মনে হয় তোমার! একখানা হাত টেনে নেয় বুকের ওপর। অজিত আন্দাজে বালিশের তোয়ালে তুলে শীলার চোখ-মুখ মুছে দেয়। বলে—কেন কাঁদলে? বাবার জন্য, নাকি রণেন জমি বউয়ের নামে কিনছে বলে?
—ওসব কারণ নয়।
—তবে?
শীলা চুপ করে থেকে বলে—আমি একটা জিনিস টের পাই আজকাল।
—কী?
—তুমি আমাকে ভালবাস না।
॥ নয় ॥
খুব ভোরেই ঘুম ভাঙল রণেনের। বিছানা আজ ফাঁকা। শুধু বড় ছেলেটা একধারে কেৎরে লেপের তলায় শুয়ে আছে। মেয়ে আর ছোট ছেলে তাদের ঠাকুমার কোল কাড়াকাড়ি করে শুয়েছে, ওঘরে। বড় ছেলেটার মাথায় একটোকা চুল, মস্ত মাথাটা জেগে আছে লেপের ওপরে, মুখ নাক ঢাকা। বীণা আজ পাঁচদিন নার্সিং হোমে।
বুবাইয়ের মুখ থেকে লেপটা সাবধানে সরিয়ে দিল রণেন। ভারী হালকা আর ফুরফুরে আছে মনটা। সকাল থেকেই যে গাম্ভীর্য তাকে চেপে ধরে সেটা কদিন হল একদম নেই। বীণা নার্সিং হোমে যাবার পর থেকেই নেই। অন্যদিন লেপ ছেড়ে উঠতে কষ্ট হয়। আজ হল না। শিস দেওয়া তার আসে না। ছেলেবেলা থেকে অনেক চেষ্টা করে দেখেছে, ঠোঁট ছুঁচোল করে নানা কায়দায় বাতাস ছেড়েছে, বড় জোর একটা কুঁই কুঁই আওয়াজ তুলতে পারে। তবু মন খুশি থাকলে রণেন আড়ালে শিস দেয়। অর্থাৎ ওই আওয়াজটা বের করে। আওয়াজটা একটানা হয় না, বাতাসটা বেরিয়ে যাওয়ার পথে মাঝে মাঝে একটু কুঁই শব্দ তুলে তার মান রেখে যায় মাত্র।
এক কাকভোরে রণেন উঠে গায়ে হাতঅলা একটা উলিকটের গেঞ্জি পরল, লুঙ্গিটা ঝেড়ে পরতে পরতে ড্রেসিং-টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজেকে দেখে তার খুব বেশি পছন্দ হল না। পেটটা বেশ বেড়ে গেছে, গলায় চর্বির গোটাকয়েক থাক। গাল দুটোও কি বেশ ভারী নয়? ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজেকে দেখল সে। হাত ভাঁজ করে বাইসেপ টিপে দেখল গেঞ্জির ওপর দিয়েই।
না, তেমন শক্ত হয় না আজকাল। অর্থাৎ অপরিহার্য মেদ জমছেই। লোকে বলে তার ব্যক্তিত্ব নেই। ব্যাপারটা সে ঠিক বোঝে না। চিরকালই সে কিছু ঢিলা-ঢালা রশি-আলগা মানুষ, একটু আয়েশি; টিপটপ থাকা তার আসে না। অনেক মানুষ যেমন কল-টেপা পুতুলের মতো ঘুম থেকে উঠে চট-জলদি হাতে নিখুঁত দাড়ি কামিয়ে, দাঁত মেজে, স্নান সেরে, এক্সিকিউটিভ-টি সেজে, ব্রেক-ফাস্ট টেবিলে গিয়ে বসে—তার সেরকম হবেও না কোনওদিন। ফুড-ইনস্পেকটরের বেলা এগারোটার পরে বেরোলেও ক্ষতি নেই, অঢেল আউটডোরে ঘোরা আছে তারপর। কিন্তু বীণা সেরকম পছন্দ করে না। বীণা যে কী চায়!
