—করছি। কী হয়েছে?
—গ্রহের ফের। বলে রণেন অজিতের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করে—এল আই সি-তে চেকটায় খোঁজ নিয়েছিলে?
অজিত তার বিদেশি সিগারেটটার ফিল্টার পুড়িয়ে ফেলেছে আবার। সেটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে বলে—নিয়েছি। কাল-পরশুই ইস্যু হওয়ার কথা।
—কিন্তু বাবা আসতে পারছেন না। বহেরু লিখেছে বাবার শরীর ভাল নেই। কলকাতা থেকে ফিরে গিয়েই অসুস্থ। বাবাকে ছাড়া চেক তো ওরা আর কাউকে দেবে না!
—না
—ব্যাপারটা এত দূর ম্যাচিওর করেও ঝুলে গেল!
অজিত ভ্রূ কুঁচকে বলে—শ্বশুরমশাইয়ের কী হয়েছে?
—জানি না। বহেরু ভেঙে তো কিছু লেখেনি। লিখেছে, বুকে ব্যথা। তা থেকে কিছু আন্দাজ করা সম্ভব নয়। এদিকে আমি সিমেন্টের পারমিট বের করেছি। লোহালক্কড়ও পেয়ে যাচ্ছি সস্তায়। টাকা অ্যাডভান্স করা হয়েছে। এত দূর এগিয়ে আবার বসে থাকতে হবে। চেক-এর ভ্যালিডিটি কতদিন থাকে? তিন মাস?
—ওরকমই।
শীলার মুখটা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। বলল—তুই একবার গিয়ে দেখে আয় না!
রণেন একটু চড়া গলায় বলে—যাব বললেই যাওয়া যায়! তোর বউদির বোধ হয় একটা মিসহ্যাপ হয়ে গেল।
—কী?
—কনসিভ করেছিল। তিন মাস। কাল থেকে ব্লিডিং —
—ইস! কী করে হল? পড়েটড়ে যায়নি তো!
—না। কিছু বলেনি সেরকম। আজ নার্সিং হোমে ভরতি করে দিতে হল। এক সঙ্গে এত ঝামেলা যে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি। জলের মতো কিছু টাকা বেরিয়ে যাবে।
কেউ কথা বলল না। রণেনই আবার বলে—অজিত, জমিটার ব্যাপারে তুমি কি আর সময় দিতে পারো না?
অজিত উত্তর দেয় না। হাতের রনসন লাইটারটার দিকে চেয়ে থাকে। শীলা উৎকণ্ঠিত মুখ তুলে স্বামীকে দেখে।
—পারো না? রণেন আবার প্রশ্ন করে।
অজিত ভ্রূ কুঁচকে বিপরীত দেয়ালে কাঠের চৌখুপিতে রাখা হরেক পুতুলগুলো দেখে। প্রধানমন্ত্রী চুপ করেছেন। দূর থেকে সম্ভবত পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠস্বর আসতে থাকে। অজিত একটা শ্বাস ছেড়ে বলে—মুশকিল হল, লক্ষ্মণের এক পিসেমশাই প্লটটার ব্যাপারে জানেন। লক্ষ্মণও লিখেছিল যেন তার পিসেমশাইকে প্লটটা আমি বিক্রি করে দিই। উনি আট হাজার টাকা অফার দিয়েছিলেন। আমি লক্ষ্মণকে লিখি যে জমি অলরেডি বায়না হয়ে গেছে, কয়েক দিনের মধ্যেই রেজিষ্ট্রি হয়ে যাবে। এদিকে সেই পিসেমশাই এখনও খোঁজখবর রাখছেন যদি বাই চান্স পার্টি পিছিয়ে যায়, তবে উনিই কিনবেন। ব্যাপারটা ঝুলিয়ে রাখা খুবই দৃষ্টিকটু হবে। লক্ষ্মণ কোনও প্রশ্ন তুলবে না, কিন্তু মনে মনে অবাক হবে। তার খুবই ইচ্ছে ছিল পিসেমশাইকে প্লটটা বিক্রি করি।
শীলা ভ্রূ কুঁচকে বলে—তোমার তো খুব বন্ধু সে। তাকে একটু বুঝিয়ে লিখে দাও না।
—বোঝাবার কী আছে! সে তো তাগাদা দেয়নি। তাগাদা যা আমারই। তা ছাড়া ওই পিসেমশাই ভদ্রলোক রিটায়ার করে সামান্য কিছু টাকা পেয়েছেন। কলকাতায় ওই টাকায় জমি পাওয়া যে কী মুশকিল, তাই ভদ্রলোক খুব আশায় আশায় এসেছিলেন লক্ষ্মণের জমিটার জন্য। তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছি জমি বিক্রি হয়ে গেছে বলে। লক্ষ্মণকে আমি এখন কী লিখব?
—একটু সময় চাও।
অজিত অদ্ভুত চোখে শীলাকে দেখে। বলে—চাইব কেন? সে তো আমায় সময় বেঁধে দেয়নি। জমি বিক্রির টাকারও তার দরকার নেই। টাকাটা তার অ্যাকাউন্টে কলকাতার এক ব্যাঙ্কে জমা পড়বে। প্রবলেম তো সেখানে নয়।
—তা হলে আর প্রবলেম কী? তুমি চুপচাপ থাকো জমির ব্যাপারে। বাবা সুস্থ না হয়ে এলে তো রেজিস্ট্রি হবে না।
রণেন ম্লানমুখে বলে—শোনো অজিত, বাবা বুড়ো হয়েছেন, তাঁর অসুখকে বিশ্বাস নেই, গুরুতর কিছু হলে—বলে একটু চুপ করে থাকে রণেন। শীলা তার মুখের দিকে চেয়ে আছে, অজিতও। রণেন চোখটা নামায়, বলে—কাজেই তাঁর ভরসায় থাকাটা এবং তোমাকেও অসুবিধেয় ফেলাটা ঠিক নয়। আমি অন্য একটা ব্যাপার ভাবছি।
—বলো। অজিত নিস্পৃহ গলায় বলে।
—ধরো যদি টাকাটা আমিই জোগাড় করে দিই তা হলে কেমন হয়?
অজিত একটু বিস্মিত হয়ে বলে—তুমি দেবে? তা হলে এতদিন ওল্ডম্যানের ভরসায় ছিলে কেন?
—সেটা মার আইডিয়া। মার ধারণা বাবার টাকা বারোভূতে লুটে খাবে, তাই বাবার কিছু টাকা ছেলেদের জন্য আদায় করে দিতে চেয়েছিল মা। সেটা যখন আপাতত হচ্ছে না তখন জমিটা কেন হাতছাড়া হয়! বীণার সঙ্গে আমি পরামর্শ করেছি, সে তার কিছু গয়না দেবে, আমিও প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে লোন নিচ্ছি, আরও কিছু জোগাড় করেছি। সব মিলিয়ে জমির দামটা হয়ে যাবে।
শীলা তার বড় বড় চোখ পরিপূর্ণ মেলে রণেনকে দেখছিল। হঠাৎ বলল—জমিটা তা হলে কার নামে কেনা হবে?
রণেন তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে নেয়। বলে—সেটা এখনও ঠিক করিনি! তবে, মার ইচ্ছে, আমার নামে হোক।
—তোর কী মত?
রণেন একটু ইতস্তত করে বলে—বীণার গয়নার অংশটাই বড়। মেজর টাকাটা ও-ই দিচ্ছে যখন, প্লটটা তখন ওর নামেই কেনা হোক। নইলে ওর বাপের বাড়ির লোকেদের চোখে ব্যাপারটা ভাল দেখাবে না।
শীলা একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে যায়।
রণেন মুখ তোলে।
—অজিত!
—বলো।
—আমি দিন-সাতেকের মধ্যেই পেমেন্ট করব।
—ভাল৷
—তা হলে উঠি!
—বোসো। শীলা তোমার চা করতে গেল।
রণেন বসে। কিন্তু তার মুখচোখে একটা রক্তাভা ফুটে থাকে। সে যে স্বস্তি বোধ করছে না, তা বোঝা যায়। অজিত চেয়ে থাকে। একসময়ে রণেনও তার বন্ধু ছিল, বেশি বয়সের বন্ধু। সেই সূত্রেই ওর বোনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অজিতের। কিন্তু লক্ষ্মণ যেমন বন্ধু তেমন বন্ধু রণেন নয়। এখন ওর দিকে চেয়ে একটু মায়া হয় অজিতের।
