ব্রজগোপাল ছাড়িয়ে দিতে দিতে বলেন—দেব রে দাদা।
—মুকুন্দর দোকানে পাওয়া যায়।
—দেবখন। হাত মুখ ধুই, কাপড়-টাপড় ছাড়ি, কী লাট্টু বললি?
—ওই যে সুতো বাঁধা চাকতি, ছুঁড়ে দিলে ফের হাতে চলে আসে পালটি খেয়ে।
—বটে! তাজ্জব জিনিত তো!
ছেলেটা করুণ মুখ করে বলে—কিনে দেবে?
—তুই আমাকে কী দিবি তোর বদলে?
—পুজোর ফুল তুলে দেব সকালে। সাদা ফুল।
—যে ছড়াগুলো শিখিয়েছিলাম, বল তো! মনে আছে?
ছেলেটা একগাল হেসে মাথা নাড়ে। গম্ভীর হয়ে দাঁড়ায়। একটু দোল খেয়ে বলে—মানুষ আপন, টাকা পর, যত পারিস মানুষ ধর। ধর্মে সবাই বাঁচে বাড়ে, সম্প্রদায়টা ধর্ম না রে। মাতৃভক্তি অটুট যত, সেই ছেলেই কৃতী তত। মুখে জানে, ব্যবহারে নাই, সেই শিক্ষার মুখে ছাই। বাঁচা বাড়ার উলটো চলে, ম্লেচ্ছ জানিস তাদের বলে।
আরও চলত। ব্রজগোপাল থামালেন। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় দোরগোড়ায় এসে পড়েছেন, ছেলেটা বলল——দাদু, তোমার মা বড় রাগী।
—কে রাগী? ব্রজগোপাল জিজ্ঞেস করেন।
—তোমার মা। কাল এসেছে তো! তোমার ঘরে আমার সব খেলনাপত্র রেখেছি, যতবার নিতে যাই বকে দেয়। আর একটা মোটা মানুষ এসেছে, সেও ভারী রাগী। হাসে না।
ব্রজগোপাল বুঝতে পারলেন না কে এসেছে। মা? মা সেই কবে চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে।
কপাট ভিতর থেকে বন্ধ। শেকল নাড়া দিলেন ব্রজগোপাল। বুকের মধ্যে কেমন একটা উলটো রক্তস্রোত বইছে। কে এল! কে এল!
—কে? একটু গম্ভীর বয়স্কা নারীকণ্ঠ সাড়া নেয়।
ও স্বর ভুলবার নয়। কতকাল বাদে এতদূর আসতে পারল মানুষটা। কোনওদিন আসবে না, ভেবেছিলেন ব্রজগোপাল।
—আমি। বলতেই গলার স্বর একটু কেঁপে গেল। প্রদীপের শিখা যেমন দোল খায়।
ননীবালা দরজা খুলে সামনে থেকে সরে গেলেন। ঘোমটা টেনে কপাল ঢেকে বললেন—এই এলে?
—হুঁ।
—আমি আর রণো কাল থাকে বসে দুর্ভাবনায় মরে যাচ্ছি। দু-দিনের নাম করে সাত দিন! এরকমই চলছে বুঝি আজকাল? দেখার কেউ নেই।
ব্রজগোপাল ঘরে ঢুকে দেখেন, তাঁর বিছানায় রণেন ঘুমোচ্ছে। একবার তাকালেন সেদিকে। তারপর ননীবালার দিকে ফিরে বললেন—কে থাকবে?
ননীবালা মুখটা ফিরিয়ে নিলেন।
॥ একান্ন ॥
ঠিক দুপুর বেলাতেই সুভদ্র আসে আজকাল। দুপুরটাই নিরাপদ সময়।
শীলার ইস্কুলের গ্রীষ্মের বন্ধ শেষ হয়ে এল। দুপুরে সে ঘুমোয় না ঠিক। শুয়ে থাকে। ঘুমোবে কি? পেটের মধ্যে ছেলেটা ফুটবল খেলছে সব সময়ে। কলকল করে জল নড়ে। ছেলেটা মায়ের শরীরের মধ্যে সাঁতরায়। ছেলেটা কি খেলোয়াড়ই হবে, নাকি সাঁতারু। এই ছেলে জন্মাবে, বড় হবে, বিয়ে করে বউ আনবে। ভাবা যায়? শীলা নিজের মুখ চেপে ধরে। মনটাই অলুক্ষুণে, উঠে পড়ে। ঘরদোরে ঘুরে ঘুরে জিনিস নাড়ে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখে, একটু হাঁটাচলা করে। আর ক’টা দিন। তারপর ইস্কুল খুললে দুপুরটা আর একা লাগবে না।
লাগেও না। সুভদ্র প্রায়ই আসে৷ কড়া নাড়ে না। বাইরে থেকে এ রকম শিসের শব্দ করে। দোর খুলে প্রায়ই শীলা বিরক্ত ভাব করে ভ্রূ কুঁচকে তাকায়। বলে—ও কী অসভ্যতা। শিস দিয়ে ডাকে কেউ? পাঁচজনে কী মনে করবে?
পাঁচজনের মনে করাকরি নিয়ে ভাবতে বয়ে গেছে সুভদ্রর। সে একথা শুনে কেবল হাসে। দাড়িটাড়ি বড় একটা কামায় না, মাঝেমধ্যে গালে ঝোপঝাড় গজায়, চুল বেড়ে হিপি হয়ে যায়। ইচ্ছে ক’রে করে না এসব, আলসেমি ক’রে করে। সাজুক বা না সাজুক, দাড়ি থাক বা নাই থাক, ও জানে সব অবস্থাতেই ওকে দারুণ সুন্দর দেখায়। গার্লস স্কুলে ওকে চাকরি দেওয়াটা খুব বিপজ্জনক কাজ হয়েছিল।
শীলা ওকে বাইরের ঘরে বসিয়ে শোওয়ার ঘরে চলে আসে। আয়নায় মুখখানা দেখে। কী শ্রী হয়েছে! চেনা যায় না। পেতনি একটা। চুলটা ফেরায়, মুখটা মুছে নেয়, পাউডারের পাফটা একটু বুলিয়ে নেয়, ব্লাউজটা পালটায় কখনও-সখনও। এটুকু করতেই হয়। মনে পাপ নেই। তবু।
ধৈর্যশীল সুভদ্র ততক্ষণ বসে থাকে। শীলা ফের ঘরে আসতেই বলে—কেস্ পাচ্ছি না এজেন্সিটা চলে যাবে।
—খাটতে হয়।
—খাটি না নাকি! সারাদিন ঘুরছি। গোটা কয়েক বড় কনসার্নে স্যালারি সেভিংস ধরতে পারলে খুব কাজ হত। কিন্তু কোনও জায়গাতেই চান্স পাচ্ছি না। সব জায়গায় আগে গিয়ে কে যেন কাজটা অলরেডি করে ফেলেছে। আমি লেট লতিফ।
শীলা মৃদু হেসে বলে—দুপুরে রোজ তো এখানে এসে আড্ডা হয়। ঘোরেন কখন?
সুভদ্র বলে—ইস্, রোজ নাকি? তাহলে আর বরং আসব না৷ উঠি।
শীলা পা নাচায়। নিশ্চিন্ত মনে বলে—রোজ না হোক, প্রায়ই।
—ঠিক আছে, আর আসব না।
—আসতে কে বারণ করেছে? এসে কাজের কথা তুলে গুচ্ছের মিছে কথা না বললেই হয়। আসলে এজেন্ট মানে তো দালাল, ওসব করতে আপনার ভাল না লাগবারই কথা।
সুভদ্র হাসে, বলে—ভাল লাগে না কে বলল! ঘুরতে ঘুরতে কত লোকের সঙ্গে আলাপ হয়! বেশ লাগে।
—তবে হচ্ছে না কেন?
—হবে কী করে! যাঁদের পলিসি করার তারা সব তিন চারটে করে পলিসি করে ফেলেছে। যারা করেনি তারা অন প্রিন্সিপল করবে না। তার ওপর এখন ব্যাঙ্কে রেকারিং ডিপোজিট-টিট করে এল আই সি-র পপুলারিটি কমিয়ে ফেলেছে। বললাম না, আমি সব জায়গায় লেট লতিফ।
শীলা হারের লকেকটা মুখে তুলে বলে—তা হলে কী করবেন?
—ভাবছেন কেন? কিছু একটা হয়ে যাবে।
এই রকমই সব কথা হয়। নির্দোষ কথা। কেউ সাক্ষী থাকে না অবিশ্য। ঝি-মেয়েটা ঘুমোয়। পড়শিরা কেউ কান পাতে না। চারদিকে তবু কী যেন একটা ওত পেতে থাকে। লাফ দেবে, ছিঁড়ে খাবে। ঘরসংসার ভেঙে ফেলবে। বাতাসে তড়িৎক্ষেত্র রচিত হয়।
