ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন—জমির মালিকদের বলেকয়ে দেখেছিস? সবার সঙ্গেই কী তোদের ঝগড়া নাকি?
বড় মণ্ডল মাথা চুলকে বলেছিল—তা বলিনি বটে। কিন্তু লোকের মন বুঝি তো, জমি ছাড়বে না।
ব্রজগোপাল বলেছিলেন—ছাড়বে। ছাড়াতে জানতে হয়। তোরা ব্যাটা কেবল স্বার্থের সময়ে লোকের খোঁজ করিস। এমনিতে খবর বার্তা নিস না। নিজেদের সামলাতে ব্যস্ত। পরের জন্য তোর যদি কিছু করা থাকে তো দরকারেও পরেই এসে বেগার দিয়ে যাবে। পাঁচহাত জমি ছাড়া তো কোনও ত্যাগই না। যা গিয়ে লোককে বোঝা গে, জল আনলে তাদেরও জমি সরেস হয়। আর বছর সীতাশাল ধান করা চাই।
কিন্তু কোথায় নালা! কোথায় কী? বোরো গেছে, বৃষ্টি না হলে বড় চাষও যাবে। চিতেন ঠাকুরের মতলব এবার ভাল না। টেরা চোখে চায় যদি! পরিবেশটা অনুকূল করে নিলে মানুষের কষ্ট থাকে না। প্রকৃতির সবদেওয়া আছে, মানুষে মানুষে আড় হয়ে সব নষ্ট করে। এইটে কতবার বুঝিয়েছেন, ওরা ভুলে যায়। লোককে সেবা দিয়ে সাহায্য দিয়ে নিজের মানুষ করে নিতে হয়। পরিবেশের রসকষ টেনে বেঁচে আছিস, পরিবেশটাকে রসস্থ রাখতে হবে না? নইলে ছিবড়ে হয়ে গেলে পরিবেশ তো রস ওগরাবে না, বাঁচবি কাকে নিয়ে?
বুড়ো মণ্ডল কপালে হাত চেপে কোঁকানির শব্দ করতে করতে বলে—আপনার চিতেন ঠাকুর আমাকে স্বপ্নে দেখা দেয়। বলে, মাটির সতীত্ব নাশ করেছিস হারামজাদা, ফসলে বিষ দিলি, নিজেরাই খেয়ে আস্তে আস্তে মরবি। তা বাবামশাই, পোকাও লাগে বটে। জন্মে এত পোকা দেখিনি।
ব্রজগোপাল বিরক্তির শব্দ করেন। চিতেন ঠাকুরের আর কাজ নেই, বুড়ো মণ্ডলকে স্বপ্নে পেয়ে গুহ্যকথা সব বলতে গেছেন। তবু ওর মধ্যে একটু সত্যি কথা আছে।
বুড়ো মণ্ডল বলে—ভয়ানক স্বপ্ন বাবা। শশা কাটছি তাতে পোকা বিজবিজ, আলু কাটছি তো পোকা বিজবিজ, রসাল চেহারার ঝিঙে কাটলুম তো ভিতর থেকে ঝুরঝুরিয়ে পোকা বেরিয়ে গেল হাসতে হাসতে। এই স্বপ্ন। তারপর দৌড়ে এসে দোলনার খোকাটাকে তুলতে গিয়ে দেখি তারও চোখে কানে নাকে মুখে পোকা থিকথিক করে ধরেছে। কী ভয়ানক বলুন দিকি। ওই যে সব কেমিকেলি সার দেয়, কলের লাঙল দিয়ে চাষ, বিষ ছড়ায়, ও হচ্ছে চিতেন ঠাকুরের বুকে হাঁটু দিয়ে ফসল আদায়। ওইতেই ঠাকুর ক্ষেপে যান। পচানো সার, বৃষ্টির কি খালের জল, কাঠের লাঙলে হেলেবলদ—এই হল গে লক্ষ্মীমন্ত চাষ। জোর করে ফসল ফলালে মাটি রক্ত উগরে দেয়। ভাল হয় না তাতে। না কি বলেন?
ব্রজগোপাল হাসেন। পুরনো দিনের লোক বুড়োমণ্ডল। সেই হেলেবলদে চাষ ভুলতে পারে না। তবে পোকার উপদ্রব বাড়ছে বটে। কেমিক্যাল সারের জন্যই।
জলের ব্যবস্থা একটা করে দিয়ে যেতে হয় এবার। বড় ভাইকে ডেকে বলেন—জলের কী করলি?
—উরেব্বাস, জল নিয়ে মারামারি। খাল থেকে জল চুরি যাচ্ছে। সেই নিয়ে মারদাঙ্গা। আমরা সে সবে গেলাম না এবার। বোরোটা ক্ষতি হল।
জলের কথাটা সারাদিন বসে ভাবেন ব্রজগোপাল। এই বুদ্ধিহীন যজমানগুলি ভেসে না যায় দুর্দিনে। গ্রাম ঘুরে কথাটথা বলেন লোকজনের সঙ্গে। লোকের তেমন গা নেই। যে যার ধান্ধায় আছে।
পরের দিন বড় আর ছোট দুভাই ব্রজগোপালকে তুলে দিতে এল বাসরাস্তায়। বাসের দেরি আছে, ব্রজগোপাল দুভাইকে দুদিকে নিয়ে বসেন গাছতলায়। বলেন—চাষবাস যো হোক গে, মানুষকে বুকে ঠেসে ধর, মানুষগুলোকে যদি অর্জন করতে পারিস তো তোদের ভাত উপচে পড়বে, এই বেলা মেখে ফ্যাল বাবা, একটু মিষ্টি কথা, একটু, হাসি, একটু দরদ সিঁচে সিঁচে দিয়ে মেখে ফ্যাল মানুষগুলোকে। খুব আকাল যখন আসবে তখন পাশে দাঁড়ানোর মতো জন পাবি।
—আকাল কি আসবেই?
—আসবেই।
ইদানীং কী হয়েছে। বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। বাস গোবিন্দপুরমুখো চলেছে। কিন্তু কেবলই সেই খুপরিতে গিয়ে উঠতে একটা অনিচ্ছা হতে থাকে। মাঝরাস্তায় শিবপুরে নেমে পড়েন। এখানেও যজমানদের বাড়ি। দিন সম্পূর্ণ হয়ে সন্ধ্যা লাগছে। তবু কিছু চিন্তা হয় না। পৃথিবীটা বেশ বড়সড় হয়ে উঠছে আজকাল। মাধ্যাকর্ষণ কি বেড়ে গেল এক লহমায়? মাঝে মাঝে ভাবেন, শেষ দিনটা আসার আর বুঝি দেরি নেই। তাই এত মায়া ভাবতে এখন আনন্দই হয়। মরে যেতে তেমন কষ্ট হবে না। তবে কাজ ঢের বাকি রয়ে যাবে না কি?
একটা ঢিবির উপর উঠে দাঁড়ান তিনি। বেশ জায়গাটা বাঁ ধারে একটা বাঁশবন। অবিকল পুজোর ঘণ্টার শব্দ করে একটা ঘন্টানাড়া পাখি ডেকে চলেছে। তপ্ত দিনের শেষে ঝিল থেকে ভাপ উঠে আসছে। তাতে জোলো গন্ধ। নিথর জলে একটা ডিঙি দাঁড়িয়ে আছে। তাতে একটা কালো মানুষ পিঁপড়ের মতো দাঁড়িয়ে, তার পিছনেই গলিত সোনার ঝোরা গলে গলে জলে মিশে যাচ্ছে। কী অপরূপ সন্ধ্যা। ব্রজগোপাল দাঁড়িয়ে থাকেন। তারা ফোটা দেখেন। ওই যে মেঘখণ্ডের ওপর তারা, ব্রাহ্মীমানুষেরা ওইরকম।
দু-দিনের নাম করে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এলেন সাত দিন পরে।
বাড়ির হাতায় পা দিতে না দিতেই বহেরুর নাতি এসে হাঁটু পেঁচিয়ে ধরল—ও দাদু, একটা ধাপানী লাট্টু কিনে দেবে?
বাচ্চা সবে বেড়ে উঠেছে। ব্রজগোপালকে পেলে আর ছাড়তে চায় না। গায়ে গায়ে পুলটিশের মতো লেগে থাকে। কোথা থেকে সব আসে, কোন শূন্য থেকে শরীর ধারণ করে। জন্মে এক লহমায় পৃথিবীতে চারদিকে মায়ার আঠা মাখিয়ে দেয়। এই সেদিনও এটা ছিল না, আর আজকে কী গভীরভাবে আছে!
