-ডিসগাস্টিং। বি পাল খেললে এরকমটা হত না।
কার কথা বলছেন?
–বি পাল। আমাদের স্ট্রাইকার। গোললাইন থেকে বলটা ব্যাক করতে পারা ছেলেখেলা ছিল, মজুমদার পারল না দেখলে?
–আমি মানস লাহিড়ির কথা বলছিলাম।
–ওঃ হ্যাঁ, বলো।
—আসলে মানস লাহিড়ির কথাও নয়।
তবে কার কথা।
—স্বামী-স্ত্রীর কথা।
বলো।
–বিয়ের ছয়-সাত বছর পর আর পরস্পরকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর তে উত্তেজনা থাকে না।
—বটেই তো।
-সীতার আর আমারও ছিল না।
–হুঁ, হুঁ।
–আর তখন মানস লাহিড়ি আসত।
–ঠিক।
–আর তখন আমরা যখন, অর্থাৎ আমি আর সীতা যখন শারীরিক দিক দিয়ে মিলিত হতাম, মানে বুঝতেই পারছেন
–ও-গুডনেস—
সমীরের টিম অন্য টিমের গোলপোস্ট ঘেঁকে ধরেছে। পর পর চারজন গোলে মাল। পোস্ট, বার খেলোয়াড়ের গা থেকে ফিরে এল। শেষ শটটা গোলকিপার উড়িয়ে দিল বারের ওপর দিয়ে। কর্নার।
কর্নার কিকটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে মনোরম।
কিক থেকে একটা নিষ্ফলা হেড। তারপর গোল-কিক আবার।
শ্বাস ফেলে সমীর বলল-বলো।
—যখন আমরা মিলিত হতাম–মানে শারীরিকভাবে, বুঝলেন?
–হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো।
—তখন আমার প্রায়ই মনে হত সীতা আমার কথা ভাবছেন না।
–তবে কার কথা?
-মনে হত, সীতা চোখ বুজে আমার জায়গায় আর একজনকে ভেবে নিচ্ছে এবং তাতে তার সমস্ত শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। মনে মনে সে তখন সেই ঋণ শোধ দিচ্ছে।
-মাই গুডনেস! সমীর চাপ তীব্র গলায় বলে।
মনোরম চমকে মাঠের দিকে তাকাল। না, মাঠে কোনও ঘটনা ঘটেনি। মাঝ-মাঠে একজন বল নিয়ে দুর্বল পায়ে দৌড়োচ্ছে। বেরোতে পারবে না।
সমীর তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মনোরম লজ্জা পায়।
কী বলছ মনোরম।
আমার ওরকম মনে হত।
–কেন?
মনে হওয়াকে কেউ ঠকতে পারেনা।
সমীর দ্রুত সিগারেটে টান দেয়। বলে তারপর?
মনোরম দুঃখিত গলায় বলে আমার একটা দোষ, আমি বড্ড বেশি কৌতূহলী। সব ব্যাপারটা আমি জানতে চাই। তাই সীতাকে আমি জিজ্ঞেস করি। মানস লাহিড়িকেও।
-বলো কী?
মনোরম ম্লান একটু হাসল। বললদুজনেই অস্বীকার করেছিল। কিন্তু আমি জানতাম ওরা মিছে কথা বলছে। কিন্তু ব্যাপারটা আমার পক্ষে কী রকম কঠিন হয়ে দাঁড়াল ভেবে দেখুন। আমি সীতার স্বামী, তার সঙ্গে মিলিত হচ্ছি, সম্পূর্ণ বৈধ ভাবে। অথচ জানছি, আমি নই, তার বুক জুড়ে আর একজনের কাছে ঋণ। আমি সেই আর একজনের প্রতিনিধি হয়ে সেই ঋণ শোধ নিচ্ছি মাত্র। এভাবেই আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ক্রমে অবৈধ হয়ে ওঠে।
সমীরের মুখের সুকুমার ভাবটুকু ভেদ করে একটা ঘেন্নার ভাব ফুটে ওঠে। সে বলল–ডিসগাস্টিং। এ সব কী বলছ মনোরম!
–আমি সীতা বা মানসের কথা বলতে চাইছি না। আমি আসলে জানতে চাইছি সব স্বামী-স্ত্রীরই কি এরকম হয়? এরকম হওয়াটাই কি স্বাভাবিক?
নিশ্চয়ই নয়।
–আপনি কখনও গীতাদিকে জিজ্ঞেস করেছেন?
কী?
–তিনি কখনও আর কাউকে…
পলকে ফণা তোলে সমীর। দুখানা চোখ ধ্বক ধ্বক করে ওঠে। মনোরম মুখ আড়াল করে উদ্যত হাতে, যেন বা মার ঠেকাবে।
রিডিকুলাস মনোরম। ভেরি রিডিকুলাস! তুমি কি পাগল?
মনোরম অবাক হয়ে টের পায়, সমীরের টিম একটা গোল দিয়েছে। ৩-১। সমস্ত মাঠ ফেটে পড়ছে উল্লাসে। সবুজ গ্যালারির ওপর শূন্যে ভাসছে ছাতা, উড়ছে জুতো, জামা। সমীর এক পলক তাকিয়ে দেখল মত্র। উত্তেজিত হল না।
মনোরম আস্তে আস্তে আমার যন্ত্রণাটা ঠিক এইভাবে শুরু হয়। অথচ কখনও সীতা বা মানস লাহিড়ি পরস্পরের দিকে এক পাও এগোয়নি। বৈঠকখানা ঘরে তারা বরাবরের মতো দুটো দূরের চেয়ারে বসে থেকেছে, হেসেছে, স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু আমি কেন–আমারই কেন যে শান্তি ছিল না।
সমীর হঠাৎ উঠতে উঠতে বলে-মনোরম, তুমি কি খেলাটা আর দেখবে? দেখলে দেখো৷ আমি যাচ্ছি।
না। বলে মনোরম উঠে সরে পিছু নেয়।
গ্যালারির কলরোল তখনও থামেনি। উদ্দণ্ড নাচ নাচছে লোকজন। একজন বুড়ো মোটা মানুষ একসঙ্গে তিনটে সিগারেট ধরিয়ে টানহে, তাকে ঘিরে ভিড়। গ্যালারির সরু রাস্তাটা দিয়ে তারা বেরিয়ে আসে। আগে সমীর, পিছনে মনোরম। স পার হয়ে তারা বড় রাস্তায় এসে পড়ে।
সমীর দ্রুত লম্বা পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছিল, যেন বা মনোরম তার সঙ্গে নেই। হঠাৎ থমকে সমীর মুখ ফিরিয়ে বলল–পুরুষমানুষের অনেক কাজ থাকে মনোরম। শুধু বউয়ের চিন্তা নিয়ে থাকলেই তার চলে না।
মনোরম দাঁড়িয়ে গেল। সমীর পিছন ফিরে আর তাকাল না, নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল।
বিষণ্ণ মনোরম বড় রাস্তা ছেড়ে একা মাঠের মধ্যে নামল। তারপর প্রকাণ্ড মাঠ খানা-জলকাদা ভেঙে পার হতে থাকল। প্রকাণ্ড আকাশের নীচে মাঠখানা বড় অফুরান, ক্লান্তিকর লাগছিল তার।
২. ঝরঝর করে জল
০২.
ঝরঝর করে খানিকটা জল পড়ল কাঁধে। ব্লাউজের হাতটা ভিজে গেল। সীতা মুখ তুলে দেখে, ট্রামের জানালার খাঁজে জল জমে আসছে। ময়দানের দিক সাদা করে আর এক ঝাঁক বৃষ্টি আসছে। নড়বড়ে জানালাটা বন্ধ করতে একবার চেষ্টা করল সীতা। পারল না। এক ভিড় লোক তাকে দেখছে। সকলের চোখের সামনে দ্বিতীয়বার জানালা বন্ধ করার চেষ্টা করতে তার লজ্জা করছিল। অস্বস্তিতে কাঁটা হয়ে বসে থাকে সীতা। ঝরঝর করে জল পড়তেই থাকে। সরে বসবে যে তার উপায় নেই, পাশে। মুশকোমতো এক পুরুষমানুষ বসে আছে। লোভী মুখচোখ, আড়ে আড়ে তাকিয়ে দেখছে।
