এটুকু বলে মনোরম প্রতীক্ষায় চেয়েছিল।
কী বলবে সীতা? তবে সে ইঙ্গিত বুঝেছিল। অবশেষে বলল–সে সব তো স্বপ্নে!
–স্বপ্নই। কিন্তু আর তো কখনও তাদের স্বপ্ন দেখব না।
–কেন?
মনোরম তীব্র হাতে আবার নুড়ি ছুঁড়ে মারল জলে, বলল–সে সব রেখে গেলাম ওইখানে। নদীতে। চপলা, রিনা, আর সব…
তবে কী থাকল?
–তুমি বলো তো?
–…
–আমি কি আর কখনও সেই আশ্চর্য গন্ধ পাব? পাব না বোধহয়, না?
কৃত্রিম দুঃখে ভরা গলায় বলেছিল মনোরম।
কী জানি।
–তুমি বলো।
.
মনোরম স্পর্শ করেছিল তাকে, কী সাহস। অনেকক্ষণ বুক ভরে টেনেছিল বাতাস, নতুন ফোঁটা ফুলের গন্ধ যেমন নেয় লোকে ঠিক তেমনি। সীতার সুন্দর গন্ধ নিয়েছিল মনোরম। বলেছিল–আমি আর স্বপ্ন চাই না।
প্রবাসে, বিদেশে ছুটিতে যায় যুবক যুবতীরা। কাছাকাছি হয়, একটু রং ছোঁড়াছুড়ি করে। কলকাতায় পা দিয়ে সব ভুলে যায়। বাইরে থেকে ঘরে এসে যেমন বাইরের ধুলো হাত-পা থেকে ধুয়ে ফেলে লোক তেমনি ধুয়ে ফেলে স্মৃতি। কিন্তু সীতা ভোলেনি। ককাতায় ফিরেও।
সীতার দেওয়া টেলিফোন নম্বরটা হারিয়ে ফেলেনি মনোরমও। টেলিফোন করেছিল।
.
আজ বহুকাল বাদে বৃষ্টিতে-ঘোয়া ময়দান পেরিয়ে, ব্রিজ পেরিয়ে, ঢালু বেয়ে যখন নেমে যাচ্ছে। ট্রামগাড়ি, তখন সীতা স্পষ্ট সেই বহুকালের পুরনো টেলিফোনটা কানে তুলে শুনছিল কাঁপা কাঁপা একটা ভিতু গলা–আমি মনোরম। তুমি কি সীতা?
গায়ে কাঁটা দেয়। এখনও।
কলকাতায় তো সেই কনভূমি নেই, স্বচ্ছ জলের নদীটিও নেই। তবু মানুষ ইচ্ছে করলে মনে মনে সেই কনভূমি আর সেই নদী সৃষ্টি করে নিতে পারে। তারা নিয়েছিল।
ভালবাসা? হবেও বা। তখন মনোরম বড় ছন্নছাড়া, চাকরি ছেড়ে এজেন্সি নেওয়ার কথা মাঝে মাঝে বলে। সীতার বাবা ব্যাপারটা আন্দাজ করে বললও ছেলে এখনও লাইন পাচ্ছে না, ওর কি কোনও কেরিয়ার তৈরি হচ্ছে?
তবু বিয়ে হয়েছিল। যেসব ছেলেরা নিজেরা যেচে মেয়েদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব করে, তাদের কেমন যেন পছন্দ হয় না সীতার। মনোরমও করেনি। সীতা করেছিল প্রস্তাব।
তারা সুখী হয়েছিল কিনা তা ঠিক বুঝতে বা ভাবতে চেষ্টা করেনি সীতা। সে শুধু ধীরে ধীরে কদমছাঁট চুলওলা মাথাটাকে ক্রমে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে রাখতে শিখেছিল। ভালবাসা কি ওইরকমই কিছু? আর একজনের ইচ্ছাকে নিজেরও ইচ্ছা করে নেওয়া? নাকি আরও বড় বিশাল কিছু?
সীতা ভেবে পায় না। আজও বড় মনে পড়ে, দুঘরের মাঝখানে নীল পদাটা উড়ছে ঝোড়ো হাওয়ায়, দুঘর উদ্ভাসিত আলো। এ ঘরে চা ছাঁকছে সীতা, ও ঘরে ক্লান্ত মনোর বসে আছে। অপেক্ষায়। কেবলই এই দৃশ্যটা মনে পড়ে। ঘরের আনাচে কানাচে সুখ তার অকুরের ডানা মেলেছিল কিনা কে জানে। তবু দৃশ্যটা বোধহয় আজ সুখী করে সীতাকে। দুবীও করে।
ট্রামগাড়ি অনেকক্ষণ ধরে থেমে থেমে চলে। রাস্তা যেন আর ফুরোয় না। বৃষ্টি থেমে গেছে কখন। শেষ বেলার রোদ উঠেছে। খোলা জানালা দিয়ে উদাসীন চেয়েছিল সীতা। পাশে বসা পুরুষ কিংবা মানুষের লোভী চোখের আক্রমণ আর টের পাচ্ছিল না সীতা।
.
একটা মেঘের স্তরের ভেতর সূর্য ডুবে গেল। সীতা বাড়ির রাস্তায় এসে পড়ল যখন, তখন হালকা অন্ধকার ছেয়ে যাচ্ছে। একটু অন্যমনে হাঁটছিল, বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়ানো অপেক্ষারত মানুষটিকে সে প্রথমে লক্ষ করেনি। কাছাকাছি হতেই লোকটা তীব্র খাসের শব্দ করে ডাকলসীতা।
চমকে উঠে তাকিয়ে সে মজবুত কাঠামোর প্রকাণ্ড শরীরওলা মানসকে দেখতে পেল। মানস লাহিড়ি।
এক পা এগিয়ে এসে মানস বলে–এখন বাড়িতে ঢুকো না।
-কেন?
তা হলে আর বেরোতে পারবে না, আবার পারমিশানফারমিশান নিতে হবে। তার দরকার কী? চলো কেটে পড়ি, ঘুরে-টুরে একেবারে ফিরবে।
সেই জন্যই আপনি দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তায়
–সেই জন্যই। তোমাকে মাঝপথে ধরব বলে। চলল জিনিসগুলো আমাকে দাও–নিচ্ছি। কোথায় গিয়েছিলে?
–মাঝে মধ্যে বেরিয়ে পড়ি। এমনি ঘুরে এলাম একটু।
স্ট্যাক্সি নেব?
সীতা হাসল। বলল স্ট্যাক্সি কেন? অনেক দূরের প্রোগ্রাম।
-না, না। কোনও প্রোগ্রাম নেই। যেখানে খুশি একটু যাব। কত কথা জমে আছে।
দুজনে আবার বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে থাকে। পাশাপাশি
-খড়্গপুরে গিয়েছিলাম কদিনের জন্য। মানস বলে।
জানি তো! সীতা হাসল।
–জানো তো বটেই। কিন্তু এ কদিন তোমাকে না দেখে কীরকম কেটেছিল খঙ্গপুরে তা তো বলিনি।
সীতা মাথা নিচু করল একটু। কথা বলল না।
আমার শরীরে কোনও রোগ নেই, তবু এ কদিন আমার শরীর জ্বরজ্বর করেছে। মাথা ধরেছে। ইন্টার রেল ওয়েটলিফটিং-এ আমি ছিলাম একজন জাজ, কিন্তু জাজমেন্টও দিয়েছি আবোলতাবোল। কিছু ভাল করে লক্ষই করিনি। ভাবছি কী করে পাতিয়ালায় যাব। এইরকম তোমাকে ছেড়ে।
সীতা তেমনি মুখ নিচু করে থাকে।
-শুনছ?
হু।
–কিছু বলো।
কী বলব?
কীভাবে যাব পাতিয়ালায়? ওখানে কোচদের ট্রেনিং তো অনেক সময় নেবে আরও। বঙ্গাপুরে মাত্র ক’দিনেই যা অবস্থা হয়েছিল…!
সীতা একটা শ্বাস ফেলল। কিছু বলল না।
–কিছু বলো।
সীতা একটু সংকোচ বোধ করছিল। তবু বলল–এক বছর হতে আরও তিন মাস বাকি আছে। তারপর তো..
ঝকঝক করে ওঠে মানসের চোখ, সীতার দিকে ঝুঁকে বলে–তারপর কী?
সীতা সুন্দর দাঁতে নীচের ঠোঁট কামড়াল।
মানস মুখটা সরিয়ে নিয়ে বলেও সব কে আর মানছে? তিন মাস আমি অপেক্ষা করতে পারছি না।
