মেয়েদের মধ্যে একজন একটু যেন ছেলেমানুষ। ঠ্যাং নাচাচ্ছিল। হঠাৎ সোমনাথের দিকে চেয়ে বলে উঠল, ইজ ইট এ হন্টেড হাউস?
সোমনাথ একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল, নো নো, হোয়াই উড ইট বি হন্টেড?
মেয়েটি তার মায়ের চোখের শাসন উপেক্ষা করে বলল, আমি ভূতুড়ে বাড়ি খুব ভালোবাসি। কিন্তু কোথাও আসল ভূতুড়ে বাড়ি দেখিনি।
সোমনাথ কথাটার কী জবাব দেবে ভাবছিল।
লোকটা একটু আগ বাড়িয়ে বলল, আমার ছোটো মেয়ে একটু ইমাজিনেটিভ। কিছু মনে করবেন না। এবাড়িতে একটা আনন্যাচারাল ডেথ হয়েছিল শুনেই– এনিওয়ে আই অ্যাম সরি।
সোমনাথ হেসে বলে, আরে না না, ছেলেমানুষ তো।
লোকটা উঠল, চলুন বাড়িটা দেখি। জুতো খুলতে হবে কি?
সোমনাথ বলে, না না, তার দরকার নেই।
ঠিক এই মুহূর্তে মিলি ঘরে ঢুকল। আজও তার সামান্য সাজগোজ। মুখ সপ্রতিভ। জোর করে হাসছে। অত্যন্ত আড়ষ্টভাবে হাতজোড় করে একটা নমস্কার করল, কিন্তু কাকে করল তা সে নিজেও জানে না, অন্যরাও বুঝতে পারল না। তবে মিলি এটা বুঝল, সে ঘরে ঢোকামাত্র মহিলার মুখখানা কঠিন হয়ে গেল। মেয়েদের বিদ্বেষ মেয়েরাই সবার আগে টের পায়।
মিলি যে ছোটোখাটো, মিলি যে তিন ছেলে-মেয়ের মা এটা গৌণ হয়ে যায় তার দিকে পুরুষেরা যখন তাকায়। পুরুষটির তীব্র উত্তপ্ত চোখ যে পাগলের মতো তার সর্বাঙ্গে তদন্ত করছে তা টের পেতে তার পুরুষটির দিকে তাকাতেও হল না।
মেয়ে দু-টিও তার দিকে হাঁ করে চেয়েছিল। ছোটো মেয়েটি হঠাৎ বলেই ফেলল, ওঃ ইউ আর বিউটিফুল।
কামুক পুরুষ আর ঈর্ষাপরায়ণা নারীর চোখের সামনে থেকে সরে যাওয়ার জন্যই পিছিয়ে গেল মিলি। অস্ফুট স্বরে বলল, আপনারা সব দেখে নিন, তারপর কথা হবে।
সোমনাথ অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে বড়োলোক খদ্দেরকে বাড়ি দেখাতে নিয়ে চলল। ঘর থেকে ঘরে। ছাদে, ব্যালকনিতে। সবশেষে নীচের ঘরে।
লোকটি সর্ব প্রথমেই সঞ্চারিকে লক্ষ করল।
হার ডটারস অ্যাণ্ড সন?
ইয়েস ইয়েস।
সঞ্চারির দিকে চেয়ে লোকটি বলে, তোমার নাম কী?
সঞ্চারি দত্ত।
আর তোমাদের?
তিথি তার নাম বলল না। বুক্কা বলল। তিথি টের পেয়েছিল, শুধু সঞ্চারির নামটা জেনে নেওয়াই লোকটার দরকার ছিল। তাদের নাম না-জানলেও ওর চলবে।
মহিলা অত্যন্ত কঠিন চোখে সঞ্চারিকে দেখল, কথা বলল না। শুধু ছোটো মেয়েটি তিথির দিকে চেয়ে বলল, অ্যাথলেটিকস?
তিথি মাথা নাড়ল।
মেয়েটি বলল, আমি খুব নাচি, ভরতনাট্যম। এঘরটা কার?
আমার বাবার।
ও গড! দিস ইজ দা রুম হোয়ার দি ইনসিডেন্ট টুক প্লেস!
তিন ভাই-বোন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। বুক্কা বলল, হ্যাঁ।
লোকটি সঞ্চারিকে বলে, বাগানটা একটু দেখাবে? চলো না।
সঞ্চারি সাগ্রহে বলল, চলুন।
মহিলা স্বামীর দিকে সাপিনীর চোখে তাকিয়ে ছিল। লোকটা নিঃসঙ্কোচে হাত বাড়িয়ে সঞ্চারির একটা হাত ধরে বলল, চলো।
মহিলা তার দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে দ্রুত হিন্দিতে যা বলল তার অর্থ বুঝতে তিথির অসুবিধে হল না, আমরা গাড়িতে গিয়ে বসি। নাটক শেষ হোক।
প্রকৃত নাটক শেষ হল আরও দশ মিনিট বাদে। সোমনাথ ওদের গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে ছুট-পায়ে দোতলায় উঠে বলল, ছোড়দি! বিগ অফার। বারো লাখ। তার চেয়েও ভালো খবর, লোকটা এখনই পেমেন্ট করবে, কিন্তু তোদের আরও এক বছর এ বাড়িতে থাকতে দেবে।
মিলি ফ্যাকাশে মুখে সামনের ঘরে বসেছিল। স্তিমিত গলায় বলল, থাকতে দেবে? কেন থাকতে দেবে?
আসলে বোধহয় তোদের অবস্থা শুনে লোকটার সিমপ্যাথি হয়েছে। ভালো লোক।
অফারটা আমার ভালো লাগছে না।
কেন বলো তো!
সব তোকে বলা যায় না। ভালো লাগছে না, ব্যস।
বিকেলের দিকে আরও একজন আসবে, কথা আছে। নীচের ঘরে বুক্কা তিথি আর সঞ্চারি বসে আছে। বুক্কা বলল, এ লোকটা বাঙালি। এ খুব দরকষাকষি করবে, দেখিস।
তোকে কে বলল, বাঙালি। সঞ্চারি বিরক্ত হয়ে বলে।
আমি সব জানি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট চারটেয়। মামা অবশ্য এ লোকটাকে তেমন ইম্পর্ট্যান্স দিচ্ছে না।
তিথি তার দাদা ও দিদির কথার মধ্যে নেই। সে শুনছে, বাইরে এই শীতের দুপুরে সেই কোকিলটা হঠাৎ ডেকে উঠল। আর হাওয়া এল উলটোপালটা। গাছের মরা পাতা, একটা পোড়া গন্ধ আর বিষণ্ণতা নিয়ে হাওয়া ছুটছে এদিক-সেদিক।
সিঁড়ির মুখ থেকে বাসন্তী ডাকল, তোমরা খেতে আসবে না? মা আর মামা বসে আছে তোমাদের জন্য।
খাওয়ার কথা তাদের মনেই ছিল না। জিভ কেটে সঞ্চারি ছুট লাগাল। পিছন পিছন বুক্কা।
তিথি বসে রইল খানিকক্ষণ।
খাওয়ার টেবিলেই কথাটা তুলল তিথি, আমাদের প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে মা। যে খুশি এসে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়বে কেন?
সোমনাথ মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত মাখছিল। বলল, বেশি দিন নয়। আজকের বিকেলটা শুধু। যে তিন পার্টি এনেছি এরাই কেউ প্রসপেকটিভ বায়ার।
এরা যদি কেউ না-কেনে?
সোমনাথ মাথা নাড়ল, কিনবেই। আজ সকালে যে এসেছিল সে হল সিং এন্টারপ্রাইজের মালিক। এক বছর বাড়ি ক্লেম করবে না। আমি তো বলি, ইটস এ ভেরি গুড অফার।
কেন কে জানে মিলির খাওয়া থেমে গেল। বড়ো টেবিলের এক প্রান্তে বসে সে তার নিরামিষ বিস্বাদ ভাত-তরকারি ফেলে হঠাৎ উঠে গেল। মাছ মাংস বড্ড প্রিয় ছিল মিলির। বিপ্লব দত্ত মারা যাওয়ার পর থেকে সে পাট উঠেছে। মিলির খাবারে এখন কেবলই বিস্বাদ।
মিলির পরেই উঠে গেল তিথি। সে অবশ্য খুব মেপে খায়। ক্যালোরি হিসেব করে। সেদ্ধ ছাড়া কিছুই খেতে চায় না। সে নীচের ঘরে এসে একা চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইল। হঠাৎ বসে থাকতে থাকতেই তার মাথায় চিড়িক দিল একটা।
