তোমার দুর্জয় সাহস সুদর্শনদা!
সুদর্শন লাজুক হাসি হেসে বলল, তুমি ভিতু মানুষ বলে সবচেয়ে কম ভয়ের গল্পটা শোনালাম। ভয়, পাওনি তো!
পাইনি মানে! আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
আমি কী ভাবি জানো? ভাবি আমরা যেমন ওরাও তো তেমনই। আমরাও আছি, ওনারাও আছেন। ভগবানের দুনিয়ায় কাকে ফেলা যায় বলল। ঘেয়ো কুকুরটাকে যে সৃষ্টি করলেন তিনি, তারও হয়তো দরকার ছিল। ঘুরে ঘুরে এইসব মনে হয়েছে আমার।
তুমি ওই বাড়িতে কতদিন ছিলে?
তা বছরটাক হবে।
চাকরিটা ছাড়লে কেন?
কোনও জায়গায় বেশিদিন আটকে থাকতে যে আমার ভাল লাগে না। আর কী জানো? তারা ভারী অলস লোক। তাদের আলসেমি দেখে দেখে আমারও যেন শরীরে আলিস্যি আসছিল। কিন্তু তা হলে তো আমার চলবে না। আমাকে তো খেটে খেতে হবে। তাই একদিন পুঁটুলি বগলে করে বেরিয়ে পড়লাম।
তার মানে তুমি আমাদের বাড়িতেও বেশি দিন থাকবে না!
সুদর্শন লাজুক হেসে বলল, তা কী বলতে পারি? এখন বয়স হচ্ছে, বেশি ঠাইনাড়া হতে আর ইচ্ছে যায় না।
আর একটা গল্প বলবে?
উপর্যুপরি শোনার দরকার কী? আর একদিন শুনো। আমার যে রান্না পড়ে আছে।
লোকে কিন্তু ঠিকই বলে। তুমি ভূতের বন্ধু। ভূতের সঙ্গে কথা বল্প।
বাজে কথা বলে। গাঁয়ের লোকের অন্ধ বিশ্বাস তো। তবে একথা বলতে পারি যে আমার শত্রুও কেউ নয়।
কথা ঘুরিয়ো না সুদর্শনদা, তুমি ভূত পোষো কিনা বলো।
বাপ রে, ভূত কি পোর বস্তু দিদি? বেড়াল কুকুর তো নন। তাঁরা সবাই মান্যিগন্যি মানুষ, শ্রদ্ধার পাত্র।
একটা সত্যি কথা বলবে?
বলব না কেন?
এ-বাড়িতে ভূত দেখেছ?
না দিদি, এ বাড়িতে ভূত-টুত কিচ্ছু দেখিনি।
আমি ভয় পাবো বলে বলছ না। এ বাড়িতে ভূত কিন্তু আছে।
ও তোমার ভয়-ভয় ভাব থেকে মনে হয়। আর থাকলেই বা কী? চোখের আড়ালে তো রোগের জীবাণুও থাকে। ওই যে টিভিতে ছবি দেখো, রেডিওতে গান শোনো ওসবও তো এই হাওয়া বাতাসেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদা চোখে দেখতে পাও কি? যেই টিভি বা রেডিও খুললে অমনই সব ভেসে উঠল। এও তো ভৌতিক ব্যাপারই, তাহলে ভয় পাও না কেন?
দুর, ওসব তো সায়েন্স। ভৌতিক হবে কেন?
ভৌতিক ছাড়া কী বলো। ওসব ছবি গান তো পঞ্চভূতেই মিলেমিশে রয়েছে। ভয় না পেলেই হল।
না বাবা, আমার বড্ড ভয়।
বাইরে থেকে একটা মিষ্টি মেয়েলি গলা ডাকল, এই পান্না।
গায়ের লেপটা ফেলে সটান উঠে বসল পান্না। মুখ উদ্ভাসিত। সোহাগ এসেছে।
সুদর্শন উঠে দরজাটা খুলে দিয়ে এক গাল হেসে বলল, এসো দিদিমনি।
হাই পান্না!
হাই সোহাগ! জানো, এতক্ষণ বসে সুদর্শনদার কাছে একটা ফ্যান্টাস্টিক ভূতের গল্প শুনছিলাম। রিয়াল লাইফ স্টোরি।
সত্যি
হ্যাঁ। সুদর্শনদার ফাস্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স।
সুদর্শন বলল, তোমার যত ভয় দিদি, আর সোহাগ দিদিমনিকে দেখো তো, একটুও ভয়-ডর নেই!
তা বলে ভেবো না যে, আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। আই ফিল দেম।
হ্যাঁ ভাই, তোমারও ভীষণ সাহস। আমার না ভীষণ কান্না পায়।
ওমা! কেন?
তোমাদের মতো আমার সাহস নেই বলে। ভয় পেয়ে পেয়ে একদিন আমি ঠিক হার্টফেল হয়ে মরে যাব।
যাঃ। হার্টফেল তোমার হবে না। আমার সঙ্গে কয়েকদিন নাইট অ্যাডভেঞ্চার করো, তাহলে তোমারও ভয়ডর কেটে যাবে।
তোমার সঙ্গে! রক্ষে করো। মরেই যাব।
তোমরা বসে গল্প করো, আমি তোমাদের জন্য কফি করে আনছি। বলে সুদর্শন চলে গেল।
এই সোহাগ বিছানায় উঠে লেপচাপা দিয়ে বোসো।
যাঃ, আমি চটি পরে এসেছি, পায়ে ধুলোময়লা আছে না!
এই শীতে চটি পরে ঘুরছ!
তোমার খুব শীত লাগছে বুঝি?
ভীষণ। লেপের বাইরে হাত রাখতে পারছি না।
বাইরে বেরিয়ে দেখো, অত শীত নেই।
তা হবে হয়তো। আমি সেই বিকেল থেকে লেপচাপা হয়ে আছি। কতক্ষণ আগে বাথরুম পেয়েছে, যাইনি।
তুমি ভীষণ কুনো, তাই না!
হ্যাঁ তো।
এই বাংলাটা সবে শিখেছি।
হ্যাঁ, আজকাল তোমার বাংলায় বেশ গাঁইয়া টানও আছে।
তা হবে না। আমি তো বড়মা, পিসি, দাদু এদের কাছ থেকে শিখি। আজকাল ইংরিজি বলি না। শুধু বুডঢার সঙ্গে বলতে হয়। ও বাংলায় তেমন ফ্লুয়েন্ট নয়।
হ্যাঁ সোহাগ, তোমার চেহারাটাও আজকাল বদলে গেছে।
তাই বুঝি?
আগের মতো রাফ-টাফ ভাবটা নেই তো!
আগে কি রাফ-টাফ দেখাত আমাকে?
একটু লাগত যেন।
আমি বিশেষ বদলে গেছি বলে আমি কিন্তু টের পাই না। মনে হয় যা ছিলাম তাই তো আছি। বরং বদলে গেছে আমার মা আর বাবা।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ। দে আর নার্ড রিকনসাইলড।
সেটা তো ভীষণ ভাল ব্যাপার। আমার মা বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ির অবস্থা হলে আমি তো পাগলই। হয়ে যাব।
সেটা আমারও নিশ্চয়ই ভাল লাগত না। কিন্তু যা হল সেটাও কি ভাল?
ভাল নয়! বলো কী?
মাথা নেড়ে সোহাগ বলল, ব্যাপারটা নরম্যাল হলে কথা ছিল না। কিন্তু কী হল জানো! বাবাকে দেখছি, প্রাণপণে মাকে খুশি রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। আগে বাবা যেমন একটু খেয়ালি ছিল, আনমনা ছিল, রিসার্চ নিয়ে ডুবে থাকত সেরকমটা আর নেই। ঠিক কথা, বাবার মনে ব্যালান্স ছিল না, কিন্তু তখন বাবার কিছু ক্রিয়েটিভিটি ছিল। একজন পুরুষ যখন কোনও মহিলাকে খুশি করাটাই টারগেট করে নেয় তখন তার চিন্তার জগৎ ধীরে ধীরে ব্যাঙ্করাপ্ট হতে থাকে। আমার বাবার চোখে আগে একটা গ্লিন্ট দেখতে পেতাম। এখন পাই না।
ঝগড়াটা তো মিটেছে সোহাগ।
হ্যাঁ। আর সেটা মেটাতে গিয়ে বাবার ভিতরটা বোধহয় মরে গেছে। অনেক দিন ধরে ডিপ্রেশন চলছিল বাবার। ডিপ্রেশন মানুষকে পাগল করে তোলে ঠিকই, কিন্তু জিনিয়াসদের ওটা হয়। কারণ তারা সব স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে নিজেদের অ্যাডজাস্ট করতে পারে না।
