না তো!
পড়ে দেখো, ভারী ভাল লাগবে।
এখনও পড়?
হ্যাঁ। আমি আবার তাড়াতাড়ি ঘুমোতে পারি না। রাত জেগে ওসব পড়া আমার অনেক দিনের অভ্যেস।
তারপর বলো।
একদিন বুড়ো চাকরটা আমাকে বলল, ওহে সুদর্শন, এ বাড়িতে সবাই আগেভাগে শুয়ে পড়ে কেন জানো? আমি বললাম, না তো! সে বলল, এ বাড়িতে ভূত আছে, রাতের দিকে তারা সব কোনাঘুপচি থেকে বেরিয়ে আসে। সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। তাদের বিরক্ত করা ঠিক হবে না ভেবেই আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। তুমি যে রাতজেগে থাকো এটা কিন্তু ভাল নয়। আমি তার কথা মোটে গায়ে মাখলাম না। বললাম, আমি তো আমার ঘরটিতে বসে বই পড়ি, ভূতেরা তো গোটা বাড়িটাই পাচ্ছে। তা যাই হোক, আমি যেমন রাত জেগে পড়ছিলাম তেমনই পড়তে লাগলাম। দিন কতক পর একদিন রাত জেগে রামায়ণ পড়তে পড়তে হঠাৎ টের পেলাম, আমি ছাড়া ঘরে আরও কে যেন আছে।
ওরে বাবা! সত্যি?
এটা কিন্তু বেশি ভয়ের গল্প নয় দিদি। ভয় পেও না।
আচ্ছা বলো।
টের পেয়ে গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল। ঘাড়টা শক্ত হয়ে গেল, হাত পায়ে খিল-ধরা অবস্থা। গলাটাও ফেঁসে গিয়ে কেমন বেসুর কঁপা ফাপা স্বর বেরোচ্ছে। প্রথম অভিজ্ঞতা তো!
তুমি তবু চেঁচাওনি?
না দিদি। চেঁচিয়ে লাভ কী? বিরাট বাড়ির আর এক প্রান্তে একটেরে একখানা ঘরে ছিলাম, চেঁচালেও কেউ শুনতে পেত না। তা ছাড়া বিপদে মাথা ঠান্ডা না রাখলে ভুলভাল হয়ে যায়। সব কাজেই তাই বুদ্ধিটা ঠিক রাখতে হয়। এটি গেলেই সর্বনাশ।
তুমি কী করলে?
প্রথমটায় মুখ তুলে চারদিকে তাকাতে সাহস হচ্ছিল না। তবে খানিক বাদে ভাবলাম, ভূতপ্রেত বা চোর-ডাকাত যাই হোক, আমার মতো গরিবকে মেরে তার লাভ কী? আর আমি মরলেও দুনিয়ার তো কিছু যাবে আসবে না। আমার মতো মনিষ্যিরা তোতা পৃথিবীর জঞ্জাল বই নয়। ভিড় বাড়ানো ছাড়া আমরা কোন কাজে লাগি বলো! এইসব ভেবে মুখ তুলে তাকালাম। লফের আলোয় কিছুই প্রথমটায় ঠাহর হল না। তারপর চোখে পড়ল, বাঁদিকে দেয়াল ঘেঁষে কে যেন অন্ধকারে বসে আছে। থান পরা বিধবা বলেই মনে হচ্ছিল।
বাবা গো!
আগেই ভয় পেও না। চোখেরও তো নানা বিভ্রম হয়। বেশির ভাগ ভূত দেখাই তো ভুল দেখা কিনা। তাই চোখ কচলে ভাল করে চেয়ে দেখলাম।
তোমার দুর্জয় সাহস কিন্তু সুদর্শনদা।
না দিদি, সাহস-টাহস নয়। আমরা হলাম মরিয়া মানুষ। আমাদের জলেও বিপদ, ডাঙাতেও বিপদ। ভয়ডর বগলদাবা করেই তো চলতে হয়। ওটা ঠিক সাহস নয়, ও হল আয় শালা কে কী করবি ভাব।
সেটা আবার কী?
জানোনা বুঝি? মানুষ যখন খুব ভয় খেয়ে যায়, যখন দেখে আর রক্ষা নেই, এবার গেছি, তখন হঠাৎ তার ভিতরে একটা পাগলাটে ক্ষ্যাপা সাহস হয়। সে তখন ফুঁসে তেড়ে আয় শালা কে কী করবি বলে ঘুরে দাঁড়ায়। ওটা সাহস বা বীরত্ব নয়, সাময়িক ক্ষ্যাপামি।
আহা, বিধবার কথাটাই তো চাপা পড়ে যাচ্ছে। তুমি বড্ড অন্য কথায় চলে যাও।
সুদর্শন হেসে বলল, না দিদি, পরিস্থিতিটা বলছি আর কী।
তারপর বলো। তুমি সত্যিই দেখলে?
হ্যাঁ। বেশ অন্ধকার, ঝুঝকো মতো আবছায়ায় বিধবা মানুষটি আসনপিড়ি হয়ে বসা। গায়ে একটা শালও যেন জড়ানো ছিল। খুব স্থির হয়ে বসা। সেই দেখে আমার বুকের মধ্যে ধপধপ করে যেন হাতির পা পড়তে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ। শিরদাঁড়া বেয়ে বরফজল নেমে যাচ্ছে যেন। আর হাত পায়ের সে কী ঠকঠক কাঁপুনি!
অজ্ঞান হয়ে গেলে না?
না। হয়তো দাঁতকপাটি লাগত, কিন্তু কী হল জানো?
কী?
বিধবা ঠাকরুন হঠাৎ ডান হাতটা দিয়ে রামায়ণ বইটা দেখিয়ে দিলেন।
ওরে বাবা!
বুঝলাম, ঠাকরুন আমাকে রামায়ণ পড়তে বলছেন।
কিন্তু রাম নাম শুনলে নাকি ভূত পালায়!
ওসব লোকের মনগড়া কথা। রামায়ণে তো কোথাও তেমন কথা পাইনে বাপু। রাম তো আর ভূতের ওঝা ছিলেন না।
তারপর কী হল বলো।
ঠাকরুনের হুকুম মনে করে আমি ফের রামায়ণ পড়ার চেষ্টা করতে গেলাম। দেখলাম ভয়ে গলার স্বর বেরোচ্ছে না, চোখেও আবছা দেখছি। কিন্তু তবু কাঁপতে কাঁপতে ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলাতেই পড়তে লাগলাম। আশ্চর্যের কথা হল, কিছুক্ষণের মধ্যে গলা বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল, হাত পায়ের ঠকঠকানিও রইল না, শীতভাবটা উধাও হল। আড়চোখে দেখলাম, ঠাকরুন স্থির হয়ে বসে আছেন।
আর ভয় করল না?
না গো দিদি। ভগবানের নাম করছিলাম তো, ভয় কি থাকে? ধীরে ধীরে ভয় উবে গেল। মনে হল ঠাকরুন হয়তো অতৃপ্ত আত্মা, ভগবানের নাম শুনলে জুড়োবেন। তাতে আমারও পুণ্যিই হবে। মনে আছে, পড়া শেষ করে বই বন্ধ করতেই ঠাকরুন উঠে আসনখানা কুড়িয়ে নিয়ে নিরেট দেয়ালের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।
তখন তুমি কী করলে?
কী আর করব, বাতি নিবিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ভয় করল না?
না, আর ভয়ের কী? একবার ভয় কেটে গেলে ও আর হয় না। বসন্ত রোগের মতো, একবার হলে আর হয় না। দিব্যি ঘুমোলাম। পরদিন সেই বুড়ো চাকর নিতাইদাকে ঘটনাটা বলতেই সে খুব গম্ভীর হয়ে বলল, খুব বেঁচে গেছ। আজ থেকে আর রামায়ণ পড়ার দরকার নেই, বরং আমার ঘরে এসে শুয়ো।
তাই করলে?
পাগল! আমি বললাম, তা কেন, ঠাকরুন যদি রামায়ণ শুনতে চান তাহলে রোজ শোনাব।
শোনাতে বুঝি?
হ্যাঁ দিদি। রোজ রাতে বসে বসে রামায়ণ পড়তাম আর ঠাকরুন এসে শুনতেন। পড়া শেষ হলে রোজ একইভাবে আসন তুলে নিয়ে দেয়ালের মধ্যে মিলিয়ে যেতেন। আমার ভারী তৃপ্তি হত। মনটা ভরা ভরা লাগত।
