নিশ্চয় নিয়ে যাবে।
আপনজনেরা এমন নিষ্ঠুর হয় না।
নিষ্ঠুর আবার কি?
নিশ্চয়। জিজ্ঞেস করতে তো পারতেন, কেন ধান নিয়ে গেলাম। থাক সে কথা। এখন আমাকে বলতে হয়। ঘরে আমার দুটি গোস্তের ঢিবি আছে। ইয়াকুব একগাল হাসি মুখ হইতে খালাস করিয়া বলিল, তাদের চোখ টাটায়। জমি কিনেছি অথচ ঘরে ধান যায় না। এবার তাই নিয়ে গেলাম। এই নিন ধানের টাকা।
ইয়াকুব পকেট হইতে পঁচিশ টাকা বাহির করিল।
এখন বাজার-দর আড়াই টাকা! দশ মণ ধান হয়েছিল। দরিয়াবিবি ইয়াকুবের দিকে তাকাইল। কৃতজ্ঞতার এমন দৃষ্টি কেহ কোনোদিন দরিয়াবিবির চোখে দেখে নাই।
ইয়াকুব মানিব্যাগ হইতে আবার পাঁচ টাকার একটি নোট বাহির করিল।
এই নিন। আমি মাসে মাসে এই টাকাটাও দেব।
দরিয়াবিবি হাত পাতিয়া গ্রহণ করিল।
ভাবী, আমাকে আপনজন মনে করবেন।
দরিয়াবিবি তার কোনো জবাব দিল না। ইয়াকুবের দিকে সোজাসুজি তাকাইল মাত্র। সে ভয়ে চোখ নামাইয়া লইল।
ইয়াকুবের হালচাল রাত্রে শুইয়া দরিয়াবিবি তোলপাড় করিতে লাগিল। বালিশের নিচে নোটখানি এখনো চাপা। অন্ধকারে হাতড়াইয়া দরিয়াবিবি নোটখানি নিজের চোখের উপর চাপিয়া ধরিল। ভয়ানক কান্না পাইয়াছিল তার।
চোখের পানি শুষিয়া লইতে এমন কাগজেরই যেন দরিয়াবিবির প্রয়োজন বেশি।
.
৩৫.
পোস্টাপিস হইতে আমজাদ একটি খাম কিনিয়া আনিয়াছিল।
দরিয়াবিবি বলিল, একটা চিঠি লিখে দে, আমু। তোর মুনি ভাই যেন তাড়াতাড়ি আসে। আমজাদ পত্র লিখিতে বসিল। এমন সময় হাসুবৌ হাজির হইল।
দরিয়াবিবি জিজ্ঞাসা করে, হাসুবৌ, আর যে এদিকে এলে না? দশ-বারো দিন হল।
সন্তর্পিত হাসুবৌ চারদিকে চাহিয়া লইল, যেন তার আওয়াজ বেশিদূর না পৌঁছায়; অথবা কেউ আছে কি-না। পরে ফিসফিস শব্দে বলিল, শাউড়ীর মেজাজ জানো না, বুবু? এদিকে এলেই চটে। আর ছেলে হয়নি। আর খোটা ধরে শুরু করবে হাজার কাল্লাম।
কখন আসি, বুবু।
সাকের ভাই কোথায়?
তার ভাবনাতেও অস্থির ছিলাম। আবার কোন জমিদারের জমি দখলে গিয়েছিল।
মানা করতে পারো না?
মানা শোনে কৈ? এবার পায়ে চোট লেগেছে। চুন-হলুদ করে দিলাম কাল। আজ ভালো আছে। সাত আট দিন গিয়েছিল। এই জন্যেও ভেবে ভেবে অস্থির। ছাই, মন ভালো না থাকলে কি কোথাও বেরুতে ইচ্ছে করে?
হাসুবৌ দরিয়াবিবির দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাইল।
সহানুভূতি জানাইল দরিয়াবিবি, তা ঠিক। মন ভালো না থাকলে খাট-পালঙ্কে শুয়েও সুখ নেই। অতঃপর আমজাদের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল, আমু, আর অন্য কোনো কথা লিখিস নে। শুধু আমার কথা লেখ। আর আমরা ভালো আছি।
আমজাদ পেন্সিল চালাইতে চালাইতে জবাব দিল, আচ্ছা মা।
হাসুবৌ জিজ্ঞাসা করিল, কাকে চিঠি দিচ্ছ বুবু?
আমার মুনিকে।
মুনির খবর পেয়েছ?
হ্যাঁ।
সোবহান আল্লা। আমু চাচা, আমার দোয়া লিখে দিও। হাসুবৌ বড় উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। পরে বলিল, কি সুন্দর ছেলে। অমন না হলে মায়ের কোল জুড়ায়!
আমার বুক জ্বলতেই রইল, হাসুবৌ। দরিয়াবিবি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল।
বুবু, তোমার ধন তোমার বুকেই ফিরে আসবে। দেখ, আমার কথা নিশ্চয় সত্যি হবে। আমার মন বলছে।
সোনা-কপালী, তোমার মুখে কাটা যাই। তা যদি হয়, আমি এই অকূলেও কূল পাই।
ঠিক তোমার হক্কের ধন ফিরে আসবে।
পনেরো বছর বয়স। এখন কত বড় হয়েছে। আজ কবছর চোখের দেখা দেখতে পাইনি।
দরিয়াবিবির কাতরদৃষ্টি হাসুবৌকে স্পর্শ করিল। দুইজনে একে অপরের দিকে তাকায়।
আমজাদের লেখা শেষ হয়ে গেছে?
হ্যাঁ।
তবে আবার কি লিখবি?
লিখে দেব– আব্বা ইন্তেকাল করেছে।
ধমক দিয়া উঠিল দরিয়াবিবি, না, ওসব লিখতে হবে না।
আচ্ছা।
শান্ত আমজাদ যেন ঠাণ্ডা হইয়া গেছে, এমন উচ্চারণের ভঙ্গি।
হাসুবৌ উঠিয়া বলিল, এখন যাই বুবু। আমু চাচা, আমাকে একটু এগিয়ে দাও।
আমজাদ খুব রাজি। সে হাসুবৌর অনুসরণ করিল।
ভিটার নিচে সড়কের উপর দুই জনে দাঁড়াইল। গোধূলির ছায়ায় চারদিক বিষণ্ণ। হাসুবৌর গা এমন ঝোপে-ঝাড়ে সত্যি ছমছম করে। মহেশডাঙা জঙ্গল বলিলেই চলে। নিচের পথের সাদা-সাদা রেখা আবছা। দুপাশে ঝি ঝি ডাকা অনেকক্ষণ শুরু হইয়াছে। আমজাদের পিছনে হাসুবৌ।
কিয়দূর অগ্রসর হইলে বৌ আমজাদের হাত ধরিয়া বলিল, চাচা, আমার দোয়া লিখে দিয়েছো?
দিয়েছি, হাসু চাচি।
সত্য? কিরা দিচ্ছি আমার গা-ছুঁয়ে বল।
আমজাদ হাসুবৌর কাঁধ ছুঁইয়া বলিল, দিয়েছি, দিয়েছি, দিয়েছি, তিন সত্যি।
হাসুবৌ খুব খুশি হইয়া বলিল, কাল এসো চাচা, তোমার জন্য ক্ষীর বানিয়ে রাখব।
আচ্ছা, আসব।
আর মুনির চিঠি এলে খবর দিও, দেরি করো না চাচা।
হাসুবৌর অনুরোধ ভঙ্গি বড় অদ্ভুত দেখায়।
এবার তুমি যাও। এখন আমি বাড়ি যেতে পারব। পথে সাপ দেখে যাস, বাপ।
আমজাদের নিজেরই ভয় লাগিতেছে এবার। জবাব দেওয়ার জন্য সে আর বিলম্ব করিল না। তার সবচেয়ে বেশি ভয় সাপের।
৩৬-৪০. মোনাদিরের আর একটি পত্র
তিন-চার মাস পরে মোনাদিরের আর একটি পত্র আসিল। সে ঠিকানা বদল করিয়াছে। এক বাড়িতে জায়গীর ছিল। কোন কারণে তাহারা আর ছাত্র রাখিতে পারে না। তাই অন্যত্র গিয়াছে মোনাদির। সেখানে মাসিক পনেরো টাকার কম খরচ পড়ে না। এখন সে কি করিবে, তাহাই ভাবনার ব্যাপার।
দরিয়াবিবির মনে আন্দোলন করিতে লাগিল। পনেরো টাকায় তাহাদের সমস্ত মাস নির্বিঘ্নে চলিতে পারে। ধান যে কয় মণ পাওয়া যায়, তাহা দিয়া চার মাসের মাত্র খোরাক হয়। বাকি দিন আল্লাই চালান। কখনো আমজাদ চন্দ্রের সঙ্গে মুনিশ খাঁটিতে যায়। এত ছোট ছেলে লোকে লইতে চায় না। শুধু চন্দ্রের খাতিরে তিন আনা চার আনা দেয় মাত্র। গরু, বাছুর, মুরগি-হাস ডিম বিক্রি ইত্যাদির উপর দিয়া কোনো রকমে দিন গুজরান। ইহার উপর মুনির এই অনুরোধ। দরিয়াবিবি ভাবিতে লাগিল। উপায় একটা স্থির করিতে হইবে। আবার ইয়াকুবের ধর্ণা! না তা সম্ভব নয়। তবু একই কেন্দ্রে সমস্ত চিন্তা স্রোতায়িত হইতে লাগিল। শেষে দরিয়াবিবি স্থির করিল, ইয়াকুবকে বলিয়া দেখিতে হইবে।
