কনির শূন্য ঘরে এসে প্রথমেই সেই ভয় হল। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। ছাদে উঠে এলাম। আমার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি, এমন সময় পাশের ঘর থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে ভেসে এল। ল্যামব্রেটা বলছে, যাও। তোমার যদি এতই দরদ, একলা যাও।
কনি কাতর স্বরে বললে, প্লিজ, তুমি অবুঝ হয়ো না। চলো।
ল্যামব্রেটা এবার ফোঁস করে উঠল। আমার গায়ে হাত দিও না বলছি। ভাবছ এতেই আমি গলে যাব।
ফিসফিস করে কনিকে বলতে শুনলাম, এই আস্তে, লোক শুনতে পাবে।
ল্যামব্রেটা এবার তড়াং করে লাফিয়ে উঠল। সে বললে, কিছুতেই নয়। আমি যাব না।
ঘর থেকে বেরিয়ে আমি এবার ল্যামব্রেটার ঘরে সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজায় নক করলাম। কনি এবার বেরিয়ে এল। রাত্রের সোয়ের জামাকাপড় পরে সে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তার দেহ থেকে মূল্যবান ফরাসি সেন্টের গন্ধ ভুরভুর করে ছড়িয়ে পড়ছে। আমাকে দেখেই কনি সব বুঝতে পারলে। আর একবার ভিতরে ঢুকে গিয়ে বললে, গেস্টরা রেগে উঠছেন, তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নাও।
ল্যামব্রেটা মুখে হাত দিয়ে বিছানায় চুপচাপ বসেছিল। গম্ভীর মুখে, বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ইউ উয়োম্যান আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও। আমাকে ডিস্টার্ব কোরো না।
একটা কুৎসিতদর্শন বামনের বিরক্ত ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে কনি ভয় পেয়ে গেল। কনি বুঝতে পারছে না, সে কী করবে। আমি এবার ঢুকে পড়ে বললাম, আর দেরি হলে আমাদের হোটেলে আগুন ধরে যেতে পারে।
কনি বললে, দোহাই তোমার, চলো। ল্যামব্রেটা বললে, ঠিক হ্যায়, এই শেষবারের মতো চললাম। দেখি কাল থেকে কে আমাকে ঘর থেকে বের করতে পারে।
আমি ও কনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ল্যামব্রেটা নিজের জামাকাপড় পরতে লাগল। কনির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। বললে, ওর যে কী সব অন্যায় হুকুম। বলুন তো-ক্যাবারে ইজ ক্যাবারে। অভিনয়ের সঙ্গে জীবনের কী সম্পর্ক আছে? হ্যারিকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না। একেবারে ছেলেমানুষ। বলে কিনা শোতে কোনো লোকের কোলে তুমি বসতে পারবে না।
কনিকে এতক্ষণ কিছুই বলিনি। এবার বললাম, এমন লোক নিয়ে দল তৈরি করলে আপনার জনপ্রিয়তা কমে যাবে। অভিনয়ে আপনি কী করলেন আর না করলেন তার কৈফিয়ত আপনি অন্য কাউকে দেবেন কেন?
কনি বললে, ঠিক বলেছেন। আমার নিজের দলের আর্টিস্ট রোজ আমাকে জ্বালাতন করবে, এ অসহ্য। তারপরেই যেন ল্যামব্রেটার জুতোর শব্দে ভয় পেয়ে গিয়ে বললে, ও যেন শুনতে না পায়।
লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন! আজ অভিজ্ঞ অভিনেতার মতোই রঙ্গমঞ্চের সামনে মাইক ধরে দাঁড়ালাম। গুড ইভনিং। শাজাহান হোটেলের এই মধুর সন্ধ্যায় আপনারা আশা করি আমাদের ফরাসি সেফের রান্না এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে চয়ন করা মদ উপভোগ করেছেন। নাউ, আই প্রেজেন্ট টু ইউ কনি। কনি, দি উয়োম্যান। আপনাদের বৈচিত্র্যময় জীবনে আপনারা অনেক উয়োম্যান দেখেছেন, কিন্তু হিয়ার ইজ দি উয়োম্যান।—যা এই শতাব্দীতে ভগবান একটিই সৃষ্টি করেছেন!
গত রাত্রের মতো আবার আলো নিভল। গত রাত্রের সেই মানুষগুলোই আজও যেন এখানে বসে রয়েছে; কিংবা যারা এখানে আসে তাদের সবারই স্বভাব এক। কেননা আজও সেই রকম গুঞ্জন উঠল। তারপরই সেই ছন্দপতন। প্রত্যাশী মানুষদের আশাভঙ্গ। কনি দি উয়োম্যান নেই। তার বদলে মানবতার ল্যামব্রেটা।
কিন্তু ল্যামব্রেটা? এই মুহূর্তে তাকে দেখে কে বলবে সে কয়েক মিনিট আগেও বিছানায় পড়েছিল; কিছুতেই আসতে চাইছিল না। সেই ক্লান্ত, বদমেজাজী, বিমর্ষ লোকটা যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। অন্য একটা বামন যেন তিন ফুট উঁচু টুপি হাতে বলছে, শুড় ইভনিং লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন। আমিই…মেয়েমানুষ কনি। আমার জন্য এই রাত্রি পর্যন্ত আপনারা যে বসে রয়েছেন এর জন্য আমি গর্ব বোধ করছি।
তারপর গতকালও যা হয়েছিল, ঠিক তাই হল। আলো নিভে গিয়ে হঠাৎ কনি কোথা থেকে হাজির হল। সামনের সারির একজন ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, আমার কোলে কে যেন বসেছে। অন্ধকারের মধ্যে বললাম, ভয় পাবেন না।
আজ বোধহয় কনি লোক চিনতে ভুল করেছিল, একেবারে বুঝনদার লোকের কোলে গিয়ে বসে পড়েছিল। লোকটি চিল্কার করে বললে, পেয়েছি! আলো জ্বালাবেন না।
এই রকম অবস্থার জন্যে সব সময়ই প্রস্তুত থাকবার নির্দেশ বোসদা আমাকে বারবার দিয়েছিলেন। এক মুহূর্ত দেরি না করে, আলোটা জ্বালিয়ে দেবার ইঙ্গিত করলাম। মমতাজের সব আলোগুলো সঙ্গে সঙ্গে সবার চোখ ধাঁধিয়ে জ্বলে উঠল। বিপদের সঙ্কেত পেয়ে যেন আলোর দমকল নক্ষত্ৰবেগে কোথা থেকে ছুটে এল। কনি এবার জোর করে ভদ্রলোকের কোল থেকে উঠে এল।.কনি হাঁপাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে নজর দেবার মতো সময় কারুর ছিল না।
কনির নাচ শুরু হয়ে গেল। নাচের প্রাগৈতিহাসিক ছন্দ যেন দামামা বাজিয়ে রাতের অতিথিদের অন্তরের পশুটাকে জাগিয়ে তুলছে। বাধাবন্ধহীন সেই অরণ্যশক্তি কোট-প্যান্ট-টাই-এর খাঁচা ভেঙে এই মুহূর্তেই বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ল্যামব্রেটাও সেখানে এসে হাজির হয়েছে। সুন্দরী কনির প্রতি তার অনুরাগের বিচিত্র ভঙ্গি দর্শকদের দেহে আরও সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সে বেচারা যে কনির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, এবং কনির মন জয় করবার জন্যে পরিশ্রম করতে করতে ঘেমে নেয়ে উঠেছে, তা আর কারুরই বুঝতে বাকি নেই।
উপস্থিত মহিলারাও সে দৃশ্য দেখেও লর্ড, বলে অস্বস্তিতে সঙ্গীদের দেহে ঢলে পড়েছেন, কিন্তু তাদের মুখের প্রশ্রয়পূর্ণ চাপা হাসিতেই বোঝ যায়, তারা আধুনিকা। রুচির কোনো অনুদার আইন দিয়ে পুরুষদের তারা বেঁধে রাখতে চান না।
