যে-মহিলারা পুরুষের এই হংসরাজ্যে বকের মতো বসে আছেন, তাদের সাজ-সজ্জার বর্ণনা বোসদার এক অধ্যাপক বন্ধু কিছুদিন আগে দিয়ে গিয়েছেন। তার নামও কী এক বোস। শাজাহান হোটেলের ভিতরটা দেখবার কৌতূহলে তিনি একবার এসেছিলেন। কলকাতার মধ্যবয়সী আধুনিকাদের দু-একজনকে দেখে ভদ্রলোক বলেছিলেন, এঁদের সাজ-সজ্জায় সম্পূর্ণ নতুন রীতি। এমন আছে-আভাস ব্লাউজ ও মিছে-আবরণ শাড়ি আমাদের পূর্ব পুরুষদের কল্পনারও অতীত ছিল।
বোসদা হেসে বন্ধুকে বলেছিলেন, দেখতে এসেছ দেখে যাও। কিন্তু মহাজনদের পথ অনুসরণ কোরো না। তোমাদের সাহিত্যিক নগেন পাল অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যে প্রথম এসেছিলেন। কিন্তু ফাদে পড়ে গিয়েছেন তাই এখনও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন। রোজ একবার বার-এ না এলে তার চলে না।
নগেন পালকে আজও দেখলাম। ক্যাবারে সুন্দরীর আবির্ভাব প্রতীক্ষায় ঘরের এক কোণে একটা হুইস্কির পেগ নিয়ে বসে আছেন। নগেন পাল সামনে ছোট্ট একটা নোটবই রেখেছেন। মদের ধাক্কায় কোনো আইডিয়া এলেই ওখানে নাকি লিখে রাখেন।
আরে মশাই! এদিকে শুনুন। দেখি ফোকলা চ্যাটার্জি আমাকে ডাকছেন। আজকেও তিনি এসে গিয়েছেন। ফোকলা চ্যাটার্জির সামনে এক লাজুক ছোকরা চুপচাপ বসে রয়েছে। চুলগুলো ঢেউখেলানো। মুখের মধ্যে নবযৌবনের নিস্পাপ সরলতা এখনও ছড়িয়ে রয়েছে। ইভনিং স্যুট পরেছে ছেলেটি।
দেখুন, এর কোনো মানে হয়? অরেঞ্জ স্কোয়াশ খেয়ে কখনও ক্যাবারে দেখা যায়? আপনি বলুন তো? ফোকলা আমাকে প্রশ্ন করলেন। ছোকরা দেখলাম এক গ্লাস অরেঞ্জ স্কোয়াশ নিয়ে বসে আছে।
ফোকলা বললেন, তুই নির্ভয়ে একটু ড্রিঙ্ক কর। কেউ জানতে পারবে। আমি মামা হয়ে তোকে অ্যাডভাইস দিচ্ছি। কেউ জানতে পারবে না। বাড়িতে তো বলে এসেছি, তুই আমার সঙ্গে বেরোচ্ছিস। অত যদি ভয়, আজ রাত্রে আমার কাছে থেকে যাবি।
ফোকলা আমাকে বললেন, আপনাদের হোটেলের সবচেয়ে দামি ককটেল কী আছে? তাই দিয়েই ভাগ্নের হাতেখড়ি দিই।
আমি বললাম, সিলভার গ্রেড। এক পেগ সাড়ে বারো টাকা।
ওতে কী আছে? ফোকলা জিজ্ঞাসা করলেন।
বললাম, ভদকা, ফ্রেশ লাইম, সিরাপ আর ডিম। হাতেখড়ির পক্ষে সুবিধে হবে কি? তার থেকে ম্যানহাতান ককটেল দিই না? হুইস্কি, ভারমুথ আর শেরি shaked with ice।
ফোকলা রেগে উঠলেন। বললেন, মশায়, এটি আমার ভাগ্নে। ভাগ্নী নয়। ভারমুথ দিয়ে ব্যাটাছেলের অন্নপ্রাশন হয়, আমি কখনও শুনিনি। আর দাম তো দেখছি সাড়ে চার টাকা। তাতে কী মাল থাকবে?
সিলভার গ্রেড-এর অর্ডার দিয়ে দরজার কাছে এসে দেখলাম বোসদা হাসছেন। বললেন, যার হাতেখড়ি হচ্ছে, সে কে জানো? মিসেস পাকড়াশীর সন্তান। পাকড়াশী সাম্রাজ্যের প্রিন্স অফ ওয়েলস।
এবার শো আরম্ভ হবার কথা। আমাকে স্টেজের উপরে উঠে বলতে হবে, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, আই প্রেজেন্ট টু ইউ কনি দি উয়োম্যান।
কিন্তু ল্যামব্রেটা এখনও হাজির হয়নি। কনিও নেই। হল থেকে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি লিফটে চড়ে উপরে এসে দেখলাম, দরজার সামনে ন্যাটাহারিবাবু দাঁত বার করে হাসলেন।
কনি আর ল্যামব্রেটাকে দেখেছেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
ন্যাটাহারিবাবু বললেন, আমাকে এখন জ্বালাতন করবেন না। আপনার বামনাবতার কালকে আমার দুটো বালিশ ছিড়ে ফেলেছে। ঘরের মধ্যে তুলোতে বোঝাই।
কনির ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলাম। কিন্তু কোথায় কনি? কনি ভিতরে নেই। দরজা খোলা পড়ে রয়েছে।
প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। শো আরম্ভ হবার এই প্রয়োজনীয় মুহূর্তে ভদ্রমহিলা কোথায় গেলেন? পাঁচ টাকার টিকিট কেটে, আর পঞ্চাশ টাকার মদ্যপান করে যাঁরা মমতাজ-এর সুকোমল চেয়ারে বুদ হয়ে বসে আছেন, তারা যদি এখন শোনেন ফ্লোর-শো বন্ধ, তা হলে এই রাত্রে শাজাহান হোটেলের কর্মচারীদের কপালে কী আছে তা কল্পনা করে আমি শিউরে উঠলাম। টিকিটের দাম হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু মদ? সে তো আর পাকস্থলী থেকে উদ্ধার করে বোতলে আবার ঢেলে দেওয়া যাবে না। ফলে এখনই কাচের গেলাস ভাঙবে, টেবিল চেয়ার উল্টোবে, এবং ফোনে পুলিসের শরণ নেওয়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো গতি থাকবে না। এমন অবস্থা অনেকদিন আগে একবার হয়েছিল শুনেছি। পুলিস এসে মাতালদের হাত থেকে হোটেল কর্মচারীদের কোনোরকমে রক্ষে করেছিলেন কিন্তু মুশকিল হয়েছিল তার পরই। ইংলন্ডেশ্বরের সেবক পুলিসবৃন্দ শাজাহান হোটেলে সেবিত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। মাতালদের তাড়িয়ে তারাই আবার সেদিন মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন তারা মমতাজের টেবিল চেয়ার দখল করে বসেছিলেন। মেনু কার্ড দেখে দামি দামি ডিনারের অর্ডার দিয়েছিলেন। ওয়াইন কার্ডের দিকে নজর দিয়ে বারম্যানদের হাঁক দিয়ে বলেছিলেন, হ্যায় খিদমার হুইস্কি শরাব, ব্লতি পানি লে আও। মাটির তলায় অন্ধকার সেলারে শাজাহানের সযত্ন সঞ্চিত ব্ল্যাক লেবেল, ব্ল্যাক ডগ, ডিম্পল স্কট, ভ্যাট এবং জনি ওয়াকারের বোতলগুলো সেদিন যেন আসন্ন সর্বনাশের আশঙ্কায় আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠেছিল। ঐশ্বর্যময় শাজাহানের মণিমুক্তো লুট করে চেঙ্গিজ খাঁয়ের দল সেদিন যখন বিদায় নিয়েছিলেন, তখন ম্যানেজারের কেঁদে ফেলবার মতো অবস্থা। অথচ কিছুই বলবার উপায় ছিল না। কারণ ওঁরা ম্যানেজারের একান্ত অনুরোধে কোনো কাস্টমারকে গ্রেপ্তার করেননি। গ্রেপ্তার করলেই কোর্ট-ঘর এবং কোর্ট-ঘর মানেই ব্যাড পাবলিসিটি।
