ল্যামব্রেটা চেষ্টা করছে, কনির দৃষ্টি আকর্ষণ করবার। কিন্তু কনির সেদিকে মোটেই খেয়াল নেই। পুরুষসর্বস্ব এই সান্ধ্য মেলায় সে যেন যৌবন ও সৌন্দর্যের দম্ভে উড়ে বেড়াচ্ছে।
স্টেজ থেকে নেমে এসে দর্শকদের সারিতে দাঁড়িয়েছিলাম। একজন মহিলাকে ল্যামব্রেটা সম্বন্ধে বলতে শুনলাম-পুওর ফেলল। আহা বেচারি। ভদ্রমহিলার সঙ্গী বললেন, অযথা দুঃখ কোরো না। এরা অভিনয় করছে। মহিলা তার সঙ্গীর হাতটা চেপে ধরে, দেহটাকে তার দেহের খুব কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, বাজে বোকো না, ডার্লিং। সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। ওর চোখে যে আগুন দেখছি, তা কিছুতেই অভিনয় নয়। আমরা মেয়েমানুষ, সব বুঝতে পারি!
মহিলা বোধহয় এবার আমাকে দেখতে পেলেন। সঙ্গীকে তিনি কী যেন ফিসফিস করে বললেন। সঙ্গী আমাকে ডেকে বললেন, এক্সকিউজ মি, কনি আর ওই বামনটার সম্পর্ক কী?
বললাম, জানি না।
ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, ওরা কি এক ঘরে রাত্রি কাটায়?
বললাম, না, আমরা ওঁদের দুটো ঘর দিয়েছি।
মহিলা এবার আলোচনায় অংশ গ্রহণ করলেন। বললেন, তাতে কিছুই বোঝা যায় না, ডার্লিং। এঁরা তো হোটেলের লোক, এ-সব ব্যাপারে এক্সপার্ট। জিজ্ঞাসা করো।
মধ্যবয়সী এই মহিলার রুচিহীন জিজ্ঞাসার উত্তর দেবার ইচ্ছে আমার ছিল। হোটেলে চাকরি করে আমরা যেন চোরদায়ে ধরা পড়েছি। আমাদের যেন ঘরসংসার নেই, ন্যায়-অন্যায় বোধ নেই। লজ্জাশরম নেই। ভদ্রমহিলা বোধহয় আমার মনের অবস্থা বুঝলেন। মুখ বিকৃত করে বললেন, মাগো! এই মেয়েগুলোর চোখে কোনো পর্দা নেই।
পর্দা কোথায় আছে তা সরে আসতে আসতেই দেখলাম। আমাদের সন্ধানী চোখগুলোকে অমান্য করে টেবিলের তলায় শাড়ির পা একটা ট্রাউজারের পা-কে বেপরোয়াভাবে জড়িয়ে ধরেছে। সভ্যতার গহন অরণ্যে একটা মাকড়সার জালের সঙ্গে আর একটা মাকড়সার জাল জট পাকিয়ে গিয়েছে।
কনি নাচছে। সঙ্গে ল্যামব্রেটাও নাচছে। কনির দেহের গতি ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে ল্যামব্রেটার বেগও দ্রুততর হচ্ছে। তাতে তাল দিয়ে সে যেন এই রূপসী যুবতীর মন হরণের চেষ্টা করছে। কিন্তু ল্যামব্রেটা হাঁপিয়ে উঠছে। লম্বা ঠ্যাঙ দিয়ে যে দূরত্ব কনি একবার অতিক্রম করছে, ল্যামব্রেটাকে সেখানে তিনবার পা ফেলতে হচ্ছে।
কনি বোধহয় বুঝতে পারছে, তার সঙ্গীর দম ফুরিয়ে আসছে। কনির রুমালটা হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গেল। করুণায় গদগদ বামন সেটি তুলে সুন্দরীর করকমলে প্রত্যর্পণ করে বোধহয় একটু আশার আলো দেখতে পেলো। সেই মুহূর্তেই কনি তার সঙ্গীকে কী যেন বললে। এবার কনি হঠাৎ অগ্নিমূর্তি ধারণ করলে। দুরের দর্শকরা ভাবলেন, কনির ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে বামনাবতার বোধহয় কোনো কুপ্রস্তাব করেছিল। কনি হঠাৎ নাচের ভঙ্গিতেই ল্যামব্রেটাকে তাড়া করলে। বলতে লাগল-পাজি শয়তান, দুর হটো। তোমার এইটুকু দেহে এত কুবদ্ধি?
ভয় পেয়েই যেন ল্যামব্রেটা আরও কুঁজো হয়ে স্টেজের বাইরে এসে দাঁড়াল। আর তাকে বিদায় করে নিশ্চিন্ত হয়ে লাস্যময়ী কনি তার যৌবন নৃত্য শুরু করলে। আমার দৃষ্টি তখন কনির নাচের দিকে নেই। আমি তখন একমনে ল্যামব্রেটার দিকে তাকিয়ে আছি। ল্যামব্রেটা গতকাল অনেকক্ষণ ধরে নেচেছিল। আজ অনেক আগেই ফিরে এসেছে। অন্য কেউ বুঝল না। কিন্তু আমি বুঝলাম ল্যামব্রেটার দম ফুরিয়ে আসছিল। সে আর পারছিল না। ওর সেই অবস্থা দেখেই কনি হঠাৎ নিজের রুমালটা মেঝেতে ফেরে দিলে। ল্যামব্রেটার ভাড়ামির সুযোগ নিয়ে বললে, তুমি এবার বিশ্রাম নাও।
বেচারা হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে। ঘামে দেহের জামাকাপড়গুলো ভিজে উঠেছে। কনির কিন্তু ক্লান্তি নেই। সে আবার দম দেওয়া লাটুর মতন নাচতে শুরু করেছে। মমতাজ-এর সব আলোগুলো কখন নিভে গিয়েছে। শুধু একটা রঙীন আলোর রেখা কনির অর্ধউলঙ্গ দেহের উপর পড়ে তাকে আরও রহস্যময়ী করে তুলেছে।
ল্যামব্রেটা নিজেকে একটু সামলে নিয়েছে মনে হল। আমার দিকে সে এবার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে-অন্ধকারেও মনে হল, তার চোখ দুটো মোটরের হেডলাইটের মতো জ্বলছে। ফিসফিস করে সে আমাকে বললে, যে লোকটার কোলে কনি প্রথমে গিয়ে বসেছিল, তাকে তুমি চিনতে পারবে? তার মাথায় আমি সোডার বোতল ভাঙব। আমাকে তোমরা এখনও চেনোনি। লোকটা কনিকে খামচে দিয়েছে।
আমি বললাম, রাগ করবেন না। চুপ করে থাকুন।
ল্যামব্রেটা বললে, আব্দার নাকি? এভরিহয়ার লোকরা কনির উপর অত্যাচার করবে, আর আমি সহ্য করে যাব?
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, মিস্টার ল্যামব্রেটা, আপনার সঙ্গে ডিবেটিং করবার মতো সময় আমার নেই। এই যে হলঘরে এতগুলো লোক দেখছেন তাদের মর্জির উপর আমার চাকরি নির্ভর করছে। এরা যদি কোনোরকমে অসন্তুষ্ট হয়ে খাওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমরা না খেতে পেয়ে মারা যাব।
ল্যামব্রেটা হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, ইফ দে ফাস্ট, উই স্টার্ভ। কিন্তু খেতে আরম্ভ করে ওরা যে কনিকে খেয়ে ফেলবে। তখন?
হা ঈশ্বর, এ কোন পাগলের হাতে পড়লাম? তোমরা এখানে নাচতে এসেছ। তার জন্যে আমাদের মালিকের কাছ থেকে তোমরা অনেক টাকা নিচ্ছ। অনেক টাকা দিতে হচ্ছে বলে, মালিকরা খাবার ও মদের দাম বাড়িয়ে দিয়ে আরও টাকা তুলে নিচ্ছেন। এর মধ্যে আমরা, দরিদ্র কর্মচারীরা, কোথা থেকে আসি? আমাকে আমার কাজ করতে দাও। চিৎকার করে বলতে দাও, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন, শাজাহান হোটেলের তরফ থেকে আপনাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছি। আপনাদের ক্লান্ত দেহ এবং মনকে দুদণ্ড শান্তি দেবার জন্যই আমরা এখানে সামান্য আয়োজন করেছি। এর মধ্যে কোথাকার তুমি হরিদাস পাল, আমাদের বিরক্ত করতে আসছ কেন?
