একজন দেখলাম একটু চালাক। ইংরিজিতে বললে, ঠিক বলছেন হুজুর–সীতারামঞ্জীর হার্টও ভেরি সুইট।
ওয়ান্ডারফুল গান শুনে ল্যামব্রেটা নিজেকে আর সংযত রাখতে পারেনি। গঙ্গার ধারে, ক্যালকাটা সুইমিং ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে সেও গান ধরলেরঘুপতি রাঘব রাজারাম।
কলকাতার ফুটপাতের নাগরিকরা সায়েবকে নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছিল না। সায়েবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের কষ্ট হচ্ছে। অথচ সায়েবকে কোথায় বসতে দেবে? সায়েবের তখন গানের নেশা ধরে গিয়েছে। সে নিজেই এসে ওদের শতরঞ্জির মধ্যিখানে বসে পড়ল। সায়েব জীবনে অনেক গান নকল করেছে। এই গানও সে ধরে ফেলেছে। হাতে তাল দিতে দিতে, গানের অর্থ না বুঝে সে তখন প্রচণ্ড উল্লাসে গেয়ে চলেছে-রঘুপতি রাঘব।
সায়েবকে তার গানের সঙ্গীরা যত্ন করেছে। বলেছে, হুজুর আমরা কয়েকটা ফুল দেব আপনাকে? সায়েব বলেছে, নিশ্চয়ই। ফ্লাওয়ার দাও। ওরা সায়েবকে গোটা কয়েক গাঁদাফুল দিয়েছে। বলেছে, একলা একলা ফিরতে পারবেন তো? সায়েব বলেছে, হ্যাঁ।
ওরা কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। বলেছে, কলকাতা হুজুর, ভেরি ব্যাড প্লেস। তারপর ওদেরই একজন সায়েবের সঙ্গে শাজাহান হোটেলের গেট পর্যন্ত এসেছে।
পকেট থেকে কয়েকটা গাঁদাফুল বের করে ল্যামব্রেটা আমাদের দেখাল। বললে, ওয়ান্ডারফুল।
গুনগুন করে নতুন শেখা গান গাইতে গাইতে ল্যামব্রেটা নিজের ঘরে ঢুকল। পরম যত্নে দেওয়া গাঁদাফুলগুলো টেবিলের উপর রাখল। কনির রূপমুগ্ধ কলকাতার এক পাবলিকের পাঠানো মূল্যবান ফুলের তোড়া সত্যিই ওই সামান্য কয়েকটা গাঁদাফুলের কাছে নিষ্প্রভ হয়ে রইল।
আমি নিজের ঘরে চলে গিয়ে ডিউটিতে যাবার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগলাম। কিন্তু আবার বাধা পড়ল। বাথরুমে যাবার জন্যে দরজাটা খুলতে যাচ্ছি এমন সময় গুড়বেড়িয়া এসে বললে, মেমসায়েব আপনাকে ডাকছেন।
আবার গেলাম। আমাকে দেখেই ল্যামব্রেটা বললে, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। কনিকে সমস্ত দুপুর ধরে আমি শেখাব, তারপর আজ রাত্রে আমরা দুজনে গাইব-রঘুপতি রাঘব রাজারাম। প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ। কনি বললে, তোমার কী মনে হয়? গুড় আইডিয়া?
আমার মুখটা শুকিয়ে গেল। আমি বললাম, আপনারা আর্টিস্ট, আপনারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।
কনি বললে, তা তো জানি। কিন্তু শাজাহান হোটেলের অতিথিরা কি খুশি হবেন?
ল্যামব্রেটা বললে, ওয়ান্ডারফুল। প্রত্যেকটা মানুষ খুশি হতে বাধ্য।
বললাম, গডের নাম শোনবার জন্যে কেউ হোটেলে আসে না।
কনি বললে, তাদের রুচি তো আপনারা তৈরি করবেন। আমি উত্তর দিলাম, মিস্টার স্যাটা বোস বলেন, রুচি অনেকদিন আগে তৈরি হয়ে গিয়েছে। এক যুগের কলকাতাওয়ালারা তাদের রুচির ছাঁটটা আরেক যুগের হাতে দিয়ে বিদায় নেন। তারা আবার অন্য যুগের হাতে সেই ছাঁটটা দিয়েই চলে যান। তাই শাজাহান হোটেলের কোনো পরিবর্তন হয় না। এখানে সেই
আদি অকৃত্রিম মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাই চালু রয়েছে।
ল্যামব্রেটা অসন্তুষ্ট হয়ে বললে, তা হলে এই গানটা চলবে না?
চলার কোনো সম্ভাবনা নেই, আমি উত্তর দিলাম।
কনি বললে, তোমার মতের উপর কথা চলে না।
আমি বললাম, ওই গানের মধ্যে এমন একটা লাইন আছে, যাতে আমাদের অতিথিরা অফেন্ডেন্ড হতে পারেন।
কোন লাইনটা? ল্যামব্রেটা চিৎকার করে উঠল।
সব কো সুমতি দে ভগবান। আমি বললাম। আমাদের অতিথিরা কী ভাববেন? তাদের কি সুমতি নেই?
ল্যামব্রেটা রেগে গিয়ে বললে, তোমরা আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাও। এখনই ঘর থেকে চলে যাও। আমি এখন বিশ্রাম নেব।
কনিও ভয় পেয়ে গেল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল। আমিও আর-এক মুহূর্তে দেরি করলাম না। আমাদের পিছনে ল্যামব্রেটা দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলে। কনি বললে, সকালের দিকে ওর মেজাজ সাধারণত ভালো থাকে। আজ ভোরবেলাতেই চটে উঠল।
আমি নীরবে হাসলাম। কনি বললে, স্যরি, তোমাকে অনেকক্ষণ আটকে রাখলাম। এখন চলি। আবার দেখা হবে রাত্রে। মমতাজ রেস্তোরাঁয়।
মমতাজ-এ তিলধারণের জায়গা নেই। সমস্ত টেবিল থেকে আগেই বুকড় হয়ে গিয়েছে। হাই সার্কেলের চাপে পড়ে বোসদা দুএকটা এক্সট্রা টেবিলও কোনোরকমে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এমন সব স্তর থেকে মাঝে মাঝে অনুরোধ আসে যে, না বলা যায় না।
জিমি আবার কয়েকজন লোককে সামনের দিকে বসবার ব্যবস্থা করে গেল। বোসদা বললেন, সামনের কয়েকটা রোতে বসবার জন্যে লোকে ঘুস দিতেও রাজি। জিমিটা পারে না এমন কাজ নেই।
মদের সেল আরও বেশি। আবগারি ইন্সপেক্টর উঁকি মেরে দেখে খুশি হয়ে চলে গেলেন। গবর্নমেন্টের ইনকাম বেড়ে যাবে। আবগারী শুল্ক, ফুর্তি শুল্ক খাতে অনেক টাকা ট্রেজারিতে জমা পড়বে।
জামা-কাপড় পরে হ-এর মধ্যে ঢুকে দেখলাম, আজ কয়েকজন মহিলা এসেছে। কলকাতা কালচারের অঙ্গ এই ফ্লোর-শো। শিক্ষিতা এবং আধুনিকা ভারত-ললনারা তাই এই তীর্থভূমিতে না-এসে পারেন না।
বোসদা হল-এর মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে মৃদু হেসে বললেন, আমরা যে রেটে সভ্য হয়ে উঠছি, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মডার্ন ভারতীয়রা স্ত্রীর সঙ্গে ছেলেমেয়েদের হাত ধরে বেলিডান্সারদের দেখতে আসবেন। পশ্চিম যে দরজা খুলে দিয়েছেন! সাধে কি আর কবিগুরু লিখে গিয়েছিলেন—দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে এই শাজাহানের মহামানবের সাগরতীরে।
