বললাম, আজ্ঞে, তাই। তবে আপনার যদি কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে, বলতে পারেন; আমি কনিকে জানিয়ে দেব।
ভদ্রলোক হতাশ হয়ে বললেন, তামাম দুনিয়ার অনেক হোটেল আমি দেখেছি, কিন্তু কেলকাটার মতো ব্যান্ ম্যানারস্ কোথাও দেখিনি। তারপর নিবেদন করলেন, হামার মোশয়, জানবার দোরকার ছিল, হামার
প্রেজেন্টেশন উনি পেয়েছেন কিনা।
কী প্রেজেন্টেশন? আমি প্রশ্ন করলাম। দূর থেকে দেখলাম কনি আমার দেরিতে অধৈর্য হয়ে উঠছে।
পাবলিকটি বললেন, কুছু ফ্লাওয়ার আর কুছু ফুরুট পাঠিয়েছি আজ সোকালে। এখনও উনি পাননি?
যদি পাঠিয়ে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই পাবেন। এই বলে ফোনটা নামিয়ে দিলাম। কনি আমার কাছে ছুটে এসে বললে, কোনো খারাপ খবর নাকি?
আমি গম্ভীরভাবে বললাম, না। কথা শেষ করতে না-করতেই দেখলাম একটা বিশাল ফুলের তোড়া এবং এক ঝুড়ি ফল নিয়ে গুড়বেড়িয়া উপরে উঠে এল। গুড়বেড়িয়া সেগুলো মেমসায়েবের চরণতলে নিবেদন করলে। দেখলাম, ফুলের তোড়া থেকে একটা কার্ড ঝুলছে। তাতে সেই পাবলিক ভদ্রলোকটির নাম এবং টেলিফোন নম্বর রয়েছে।
কনি উপহারের দিকে ফিরেও তাকাল না। সে তখন ছোট মেয়ের মতো কাঁদতে আরম্ভ করেছে। ওকে সেই মুহূর্তে দেখে মনে হল, সে যেন আমাদের আমতা বা ডোমজুড়ের কোনো সরল মেয়ে; আমাদের এই বিশাল শহরে তার সাথী হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছে।
গুড়বেড়িয়া মেমসায়েবকে কাঁদতে দেখে ঘাবড়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলে, কী হয়েছে? মেমসায়েবের কি ফুল পছন্দ হয়নি? আমি বললাম, আমাদের বেঁটে সায়েবের কোনো খবর রাখো?
গুড়বেড়িয়া আমাদের রক্ষে করে দিল। সে বললে, বেঁটে সায়েব? তিনি তো বেড়াতে বেরিয়ে গিয়েছেন। যাবার আগে ল্যামব্রেটা শুড়বেড়িয়ার কাছে খবর নিয়েছেন, কাছাকাছি কোথায় বেড়ানো যায়। গুড়বেড়িয়া বলেছে সেন্ট্রাল অ্যাভিন ধরে কিছুটা হাঁটলেই এসপ্ল্যানেড পড়বে। তারপর চৌরঙ্গী ধরে গেলেই গড়ের মাঠ-হাওয়া খাবার জায়গা। সায়েব তখনই গুড়বেড়িয়াকে একটা আধুলি দিয়ে বেরিয়ে চলে গিয়েছেন।
কনি এবার একটু সাহস ফিরে পেল। তার মেঘভরা মুখে কিছুক্ষণের জন্যে হাসির সূর্যকে দেখতে পাওয়া গেল। বললে, দাঁড়াও, একটু মজা করা যাক। পায়ের গোড়া থেকে সে ফুলের তোড়াটা তুলে নিয়ে, কার্ডটা খুলে ফেলে দিল। আমার কাছ থেকে একটুকরো কাগজ নিয়ে তাতে কয়েকটা কথা লিখলে। ল্যামব্রেটার ঘরে ঢুকে কনি একটা ফুলদানির খোঁজ করতে লাগল। বললে, এ কেমন হোটেল যে, প্রত্যেক ঘরে ফুলদানি নেই?
বললাম, নিচের সব ঘরে আছে। শুধু ছাদে নেই।
কেন? এখানে যারা থাকে, তারা কি মানুষ নয়? কনি একটু বিরক্ত হয়েই মন্তব্য করল। তারপর একটা কাচের গেলাসের মধ্যেই যত্ন করে ফুলগুলোকে সাজিয়ে রাখল।
সাজানো শেষ করে দরজা বন্ধ করতে করতে কনি বললে, জানো হ্যারি অবাক হয়ে যাবে। ভাববে, এই অচেনা শহরে কনি কোথা থেকে তার জন্যে ফুল জোগাড় করে আনল! হ্যারিকে খুশি করবার একটা সুযোগ পেয়ে কনি নিজেও বেশ খুশি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সে আনন্দ কেবল কয়েক মুহূর্তের জন্যে। আমার হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কনি আবার চিন্তিত হয়ে পড়ল। আমি বললাম, এত ভাববার কী আছে? এখনই ভদ্রলোক এসে পড়বেন।
কনি তেমন ভরসা পেল না। সে বললে, আমার ভয় লাগে। বামন মানুষ, কোথাও রাস্তা পেরোতে গিয়ে হয়তো বিপদ বাধিয়ে বসল।
আমি আবার ভরসা দিলাম। বললাম, দেখুন না, এখনই এসে পড়বেন। আর মনে মনে বললাম, এত আদিখ্যেতা কেন? বদমেজাজী লোকটা যতক্ষণ বাইরে থাকে, ততক্ষণই ভালো। এসেই তো আবার গোলমাল করবে।
আমার ভবিষ্যদ্বাণী যে এমনভাবে মিলে যাবে আশা করিনি। আমার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছাদের দরজা খুলে যিনি ঢুকলেন, তিনি ল্যামব্রেটা। ল্যামব্রেটার মেজাজ এখন বেশ ভালো রয়েছে। সে গুনগুন করে গান গাইছে। গানটা কি, আমি বুঝতে পারিনি। কনি নিজেও বুঝতে না পেরে ল্যামব্রেটার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কী গান গাইছ, হ্যারি?
হ্যারির ইংরিজি উচ্চারণ সাবধানে অনুসরণ করে বুঝতে পারলাম সে কি গান গাইছে। খাঁটি ভারতীয় প্রথায় হাততালি দিয়ে ল্যামব্রেটা গাইছে–জয়জয় রঘুপতি রাঘব রাজারাম।
ল্যামব্রেটা কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল? সে বললে, কনি, ওয়ান্ডারফুল গান। তারপর নেচে নেচে ভুল উচ্চারণে গাইতে লাগল—পাটিটো প্যাভনো সীটারাম।
ল্যামব্রেটাকে কনি প্রশ্ন করলে, কী করছিলে এতক্ষণ? আমি ভেবে ভেবে মরি।
ল্যামব্রেটা বললে, ওইটাই তো তোমার স্বভাব। তারপর ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠে বললে, আমার জন্যে ভেবে তোমার তো ঘুম হয় না! আমার জন্যে ভেবে ভেবে তোমার নেকেড় ড্যান্সের রিদম নষ্ট হয়ে যায়!
কনি ল্যামব্রেটার কাছ থেকে এই উত্তর শোনবার জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে বললে, হ্যারি! পৃথিবীতে এত লোক থাকতে তুমি আমাকে এই কথা বললে!
প্রভাতের প্রসন্নতা সত্যিই হ্যারির উপর তার প্রভাব বিস্তার করেছে। সে সঙ্গে সঙ্গেই নিজের ভুল বুঝতে পারল। কনির হাতটা ধরে বললে, তোমার সঙ্গে রসিকতা করছিলাম। তুমি এখনও ছোট্ট গার্লের মতো; আমার রসিকতা বোবক না?
কনিও আমার সামনে অপ্রস্তুত হয়ে চোখের জল মুছে নিল। ল্যামব্রেটা বললে, মাঠ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে নদীর ধারে চলে গিয়েছি বুঝতে পারিনি। সেখানে দেখলাম, একদল লোক ফুটপাতের উপর বসে বসে গান গাইছে। ভেরি সুইট গান। ভেরি নাইস পিপল। রিয়েল জেন্টলমেন। তারা আমাকে দেখেই গান বন্ধ করে দিয়েছিল। আমাকে তারা নমস্কার করলে। আমি বললাম, তোমরা কী গান গাইছ? তোমাদের সুইটহার্টদের জন্য গান? ওরা মার্কেন্টাইল ফার্মের বেয়ারা, দারোয়ান, আমার কথা বুঝতে পারলে না। বললে, ভোরবেলায় এখন কেবল গড়। কেবল সীতারাম। সীতারাম।
