গোমেজের ঘর থেকে বেরিয়ে কনি আবার রৌদ্রে এসে বসলো। সে যেন হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। প্রভাতচন্দ্র গোমেজ তার সব গর্ব এবং দম্ভকে মুহূর্তে নষ্ট করে দিয়েছে।
কনি সূর্যের দিকে পিঠ দিয়ে বললে, এমন বোদ যদি আমরা ইউরোপে প্রতিদিন পেতাম, তা হলে আমাকে আর করে খেতে হত না। আমি ওর কথার অর্থ বুঝতে না পেরে কনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কনি হেসে বললে, এমন রোদে পুড়তে পেলে আমাদের দেশের প্রত্যেকটা মেয়ে সুন্দরী হয়ে উঠত। এখন যারা অ্যাট্রাকটিভ, তারা প্রকৃতির খেয়াল; তখন সুন্দরী হওয়াটাই নিয়ম হয়ে যেত—আমাদের আর কদর থাকত না।
রাত্রের ক্যাবারে সুন্দরীদের যে একটা সাধারণ জীবন থাকে, তার সঙ্গে সে সহজ হয়ে কথা বলা যায়, তা ওর সঙ্গে কথা না বলতে পারলে আমার কিছুতেই বিশ্বাস হত না। কনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, ভাবছি, এবার থেকে প্রত্যেক বছর একবার ভাবতবর্ষে আসবার চেষ্টা করব। তা হলে গায়ের রংটা ভদ্রস্থ করে নেওয়া যাবে। কনি আরও বললে, দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন? একটা সূর্যমুখী চেয়ার আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললে, বসে পড়ো।
আমি বসলাম। কনি বললে, হ্যারিকে দেখেছ?
আমার ধারণা ছিল, রাতের মত্ততার পর ল্যামব্রেটা এখনও ঘুমিয়ে আছে। কনিও তাই ভেবেছিল। আমি বললাম, আমি দেখছি মিস্টার ল্যামব্রেটা এখনও ঘুমুচ্ছেন কিনা।কনি বললে, যদি হ্যারি, ঘুমিয়ে থাকে, তবে ওকে ডিসটার্ব কোরো না।
মনে মনে একটু রাগ হল। একজন ক্যাবারে গার্ল-এর সাকরেদ কিছু এমন ভি-আই-পি নন যে, তাকে ব্রেকফাস্টের সময়েও ডিসটার্ব করা যাবে না। মুখে অবশ্য বললাম, আমরা হোটেলে কাজ করি, লোককে ডিসটার্ব-না–করার আর্ট আমাদের জানা আছে।
ল্যামব্রেটার ঘরের দরজা বন্ধ। জানালা দিয়ে উঁকি মেরেই কিন্তু আমার ভয় হল। বিছানায় কেউ শুয়ে আছে বলে মনে হল না। ভালো করে দেখবার জন্যে জানালাটা সম্পূর্ণ খুলে দিলাম। কোথায় ল্যামব্রেটা? সে তো বিছানায় নেই। ল্যামব্রেটা তবে কি বাথরুমে? কিন্তু সেখান থেকেও তো কোনো শব্দ আসছে না। এবার দরজার গোড়ায় এসে নিজের ভুল বুঝলাম। দরজাটা চাবি বন্ধ।
কনি আমাকে ওখানে অপেক্ষা করতে দেখেই উঠে এল। নিজের দেহটা সম্বন্ধে সে মোটেই সচেতন নয়। দেহটা আছে এই পর্যন্ত। সেটা ঢাকা থাকল, না খোলা রইল, সেটা চিন্তা করবার বিষয়ই নয়। কনি দরজার কাছে এসেই প্রশ্ন করলে, হ্যারি ভিতরে নেই?
দরজা তো বন্ধ। আমি বললাম।
কনি এবার ভয়ে শিউরে উঠল। কোথায় গেল সে?
আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উদ্বিগ্ন কনি অধৈর্য হয়ে উঠল। কিছু বলছ না কেন? চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে?
ভালো বিপদে পড়া গেল। কোথায় ল্যামব্রেটা, তা আমি কেমন করে জানব? কনির চোখ ছলছল করছে। কোনোরকমে সে বললে, তুমিই এর জন্যে দায়ী। কেন তুমি রাত্রে আমাকে ডেকে আনলে? একটা নিরীহ ছোট্ট মানুষ যদি তোমার ঘরে গিয়ে একটু গোলমাল করেই থাকে, সেটা সহ্য করা যায় না?
কনির কথা শুনে আমি অবাক। আমাকে আক্রমণ করা তখনও শেষ হয়নি। কনি বলে চলল, এই যে আমি, এত সহ্য করি। আমি ও হ্যারি যে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মানুষের হাজার রকম অত্যাচার মুখ বুজে হজম করে যাই, আমরা তো কারুর কাছে কমপ্লেন করি না।
কনির সজল চোখের দিকে আমি অপ্রস্তুত অবস্থায় তাকিয়ে রইলাম। কনি আমার কাছে এগিয়ে এসে বললে, জানো, গতকাল ও বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল? ঘরের মধ্যে ঢুকে কতবার ওকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ক্ষমা চাইলাম, তবু হ্যারি আমার সঙ্গে কথা বললে না। অভিমানে সে মুখ ঘুরিয়ে থাকল।
আমি হয়তো কিছু বলতাম। কিন্তু তার আগেই ছাদের টেলিফোনটা বেজে উঠল। দ্রুতবেগে গিয়ে টেলিফোনটা ধরলাম। রোজি কথা বলছে। হ্যালো, রোজি? কী ব্যাপার?
না ইয়ংম্যান, তোমার সঙ্গে রোজির ক্যাপাসিটিতে কথা বলছি না। টেলিফোন অপারেটারের ডিসেন্ট্রি হয়েছে। বোর্ডে বসতে পারছে না, তাই আমি কাজ করছি।
অপরকে সাহায্য করার যে মনোবৃত্তি তুমি দেখাচ্ছ, তা সত্যি প্রশংসাযোগ্য। আমি বললাম। রোজি বললে, তোমাকে ডিসটার্ব করার ইচ্ছে আমার ছিল না। ফোন এসেছে। একজন ভদ্রলোক তোমাদের কনির সঙ্গে কথা বলবার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছেন। তাকে দিলাম।
হ্যালো! ওদিক থেকে একজন বলে উঠল। আমি বললাম, ইয়েস। ভদ্রলোক কনি দি উয়োম্যানের মধুকণ্ঠ শোনবার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিলেন। তার জায়গায় পুরুষকণ্ঠ শুনে একেবারে হতাশ হলেন। বললেন, হামি একটু কোনির সঙ্গে বাতচিত করতে চাই।
কে আপনি? আমি প্রশ্ন করলাম।
হামি একজোন পাবলিক আছি। ঘোড়া ডিসকাশন ওঁর সাথে কোরা দোরকার।
আমি বললাম, স্যরি। ওঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা যায় না। উনি কোনো অপরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলেন না।
পাবলিক ভদ্রলোকটি একটু অসন্তুষ্ট হলেন। এ আপনি কী কোথা বোলছেন। কেলকাটায় আমাদের সঙ্গে মীট না করলে, পরিচয় কী কোরে হেবে?
হোটেলে চাকরি করলে রাগ করবার উপায় নেই। শরীরে রাগ থাকলে তার কপালে হোটেলের অন্ন নেই। তাই ভদ্র ভাষায় দুঃখ প্রকাশ করে বললাম, কনির সঙ্গে দেখাও হয় না; ফোনেও কথাবার্তা চলে না।
পাবলিকটি বললেন, প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে পর্যন্ত ফোনে কোথা চোলে, আর আপনাদের কোনি দি উয়োম্যানের সঙ্গে কোথা চোলে না?
