অপমানিত সঙ্গীতজ্ঞ নিজের মনেই বললেন, সুরের রাজা, আমাদের রাজাধিরাজ, আজকের দিনে অজ্ঞাত অখ্যাত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু আজও তিনি আমার রাজা। আমি রক-অ্যান্ড-রোল বাজাই, আমি ক্যাবারেতে সঙ্গীতের সুর দিই, তবু আজও তিনি আমার রাজা।
আমি আর চুপ করে থাকতে পারিনি। বলে ফেলেছিলাম কে? বীঠোফেন?
মাথা নেড়ে আস্তে আস্তে গোমেজ বলেছিলেন, আমার রাজা অন্য জন। তিনি দরিদ্র। তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন, আবার খ্যাতি হারিয়েও ছিলেন। একজন ধর্মযাজকের বাড়িতে তিনি বাজাতেন। যাজক একদিন লাথি মেরে আমাদের রাজাকে বের করে দিয়েছিলেন। আমাদের দরিদ্র রাজা তারপর শুধু দুঃখই পেয়েছেন। তাই বোধহয় অন্যের দুঃখ তিনি বুঝতেন। কিন্তু পৃথিবীতে কে তার মূল্য দেয়? সুরের রাজা অনাদর, অবজ্ঞা, অবহেলার মধ্যে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মর্ত্যলীলা সাঙ্গ করলেন। কিন্তু আহা, সে মৃত্যুর মধ্যেও কী অপরূপ সৌন্দর্য! মৃত্যুপথযাত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে তার যুবতী স্ত্রী বললেন, কিছু বলবে? হা, তিনি বলতে চাইলেন। কিন্তু সংসারের কথা নয়, গানের কথাও নয়। কোনোরকমে শ্বাস টানতে টানতে বললেন, কথা দাও, আমার মৃত্যুসংবাদ এখন প্রকাশ করবে না। বেচারা আলব্রেৎস শহরের বাইরে গিয়েছে। বন্ধুর আমার ফিরতে কয়েকদিন দেরি হতে পারে। অথচ এখনই জানাজানি হলে, আমার চাকরিটা অন্য লোকে নিয়ে নেবে। তুমি তো জানো, একটা চাকরি ওর কত প্রয়োজন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন কথা একমাত্র মোৎসার্টই বলতে পারতেন। এমন মন বলেই তো এমন সুর জন্ম নিতে পেরেছিল।–গোমেজ এবার নীরব হলেন।
এই মুহূর্তে মোসার্টকে কবরে শুইয়ে দিয়ে যেন গোমজ ফিরে এসেছেন। ছলছল চোখে গোমেজ বললেন, চাকরি না থাকার কী যন্ত্রণা তিনি জানতেন। তাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুরের রাজা বন্ধুকে ভুলতে পারেননি।
আর পারেননি তার মৃত্যুর গানকে। Mozart’s Requiem–K626–মৃত্যুর কয়েক মাস আগে একজনের ফরমায়েশে সামান্য কয়েকটা আগাম টাকার বিনিময়ে তিনি এই সুর সৃষ্টি করতে আরম্ভ করেছিলেন। অসুস্থ দেহে সঙ্গীত সরস্বতীর পুজোর মধ্যেই তিনি কাঁদতেন। বলতেন, এ আমার নিজেরই রিকুয়েম। আমি বেশ বুঝছি, আমার মৃত্যুর গান আমি নিজেই রচনা করে যাচ্ছি। কিন্তু এই বিকল দেহ আমাকে গান শেষ করবার সময় দেবে তো? আমার যে এই সুর শেষ করতেই হবে।
মৃত্যুর কিছু আগে মোৎসার্ট তার প্রিয় শিষ্য এবং বন্ধুদের বিছানার পাশে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কথা বলবার শক্তি তখন তার নেই। ইঙ্গিতে বললেন—শুরু করো—Mozart’s Requiem। তারপর গানের চরমতম মুহূর্তে এসে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মোৎসার্ট সংজ্ঞাহীন। অচৈতন্য অবস্থায়ও মনে হলো সেই গানই গেয়ে চলেছেন।
তার শেষ কথা কী জানো?–গোমেজ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন। আমি দেখলাম কনিও কেমন হয়ে উঠেছে। সে ফ্যালফ্যাল করে হোটেলের এক সামান্য বাজনদারের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
গ্রামোফোনের উপর মোসার্টের রিকুয়েম চড়াতে চড়াতে গোমেজ বললেন, তার শেষ কথা,-Did not tell you that I was writing this for myself?
মৃত্যুর গান তখন যন্ত্রের বুকের মধ্যে গুমরে গুমরে মরছে। এক অব্যক্ত যন্ত্রণা দেহের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে যেন মহাশূন্যে মিশে যাবার জন্যে ছটফট করছে। জীবনের প্রভাতবেলায় আমরা মৃত্যুসন্ধ্যার সাক্ষাৎ পেলাম। শুভদৃষ্টির লগ্নেই যেন আমার বন্ধুকে বিধবা যোগিনীর সাজে দেখলাম।
গোমেজ যেন তার জড় দেহটাকে শাজাহান হোটেলের ছাদে ফেলে রেখে কোন সুদুরের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন। আর কনি হঠাৎ সচেতন হয়ে নিজের উলঙ্গ দেহটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে স্লিপিং গাউনের ভিতর বন্দি করে ফেললে। কনি কাঁদছে।
আমার বিশ্বাস হয়নি, চোখটা মুছে নিয়ে আবার দেখলাম, সত্যিই আমাদের রাত্রের রমণী কনির গণ্ডেও অশ্রুর রেখা। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে গোমেজকে সে বললে, আই অ্যাম স্যরি। তারপর ধীরে ধীরে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কনির সঙ্গে সঙ্গে আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। গোমেজকে এতদিন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। একটা রেস্তোরাঁর সাধারণ বাজনদার বলেই ধরে নিয়েছিলাম। অনেকদিন আগে বাজিয়েদের সম্বন্ধে সায়েব একবার বলেছিলেন, হোটেলে কিংবা রেস্তোরাঁয় সঙ্গীত পরিবেশন করে বলেই এরা কিছু জানে না, এমন নয়। কলকাতার হোটেলে এমন সঙ্গীতশিল্পী দেখেছি, সুযোগ এবং সুবিধে পেলে যে হয়তো বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করতে পারত।
বোসদাও বললেন, গোয়ানিজ খ্রিস্টান ছোকরাগুলোকে তোমরা চেনো না। সঙ্গীতে এদের জন্মগত অধিকার। সঙ্গীত ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। এদের জীবনে যেন আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। সারা দিন চেলো, ভায়োলিন, ক্ল্যারিওনেটগুলো কোলের পাশে নিয়ে শুয়ে আছে। সময় হলেই যন্ত্রের মতো জামাকাপড় পরে নিচে নেমে যাচ্ছে। মমতাজ রেস্তোরাঁয় উপস্থিত অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্যে একমনে বাজিয়ে তারা আবার যন্ত্রের মতোই উপরে ফিরে আসে। জামাকাপড় খুলে ফেলে বিছানায় শুয়ে পড়ে। এদের যেন আর কোনো জীবন নেই।
এরই মধ্যে প্রভাতচন্দ্র গোমেজ যেন ব্যতিক্রম। তিনিও যন্ত্রের মতো শাজাহান হোটেলে সঙ্গীত পরিচালনা করে থাকেন বটে, কিন্তু অবসর সময়ে অন্য এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন। যে পৃথিবীতে সুরের রাজারা সবার অলক্ষ্যে এসে ভিড় করে থাকেন।
