আমি বলব, এই ছোকরাকে কিছুতেই রাখা চলতে পারে না।
মনের রাগ চেপে রেখে বললাম, কেন? কী তোমার ক্ষতি করেছি?
রোজি এবার দুষ্টু হেসে, আড়চোখে কনির উলঙ্গ দেহের দিকে তাকিয়ে, ফিসফিস করে বললে, আমার ক্ষতি নয়, তোমার নিজের ক্ষতি। তোমার
বয়সের কোনো ইয়ংম্যানকে ছাদের ঘরে রাখা কিছুতেই উচিত নয়।
আমি এবার ভরসা পেলাম। রোজি এবার হাতের চাবিটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললে, ডোন্ট বি ওভারকনফিডেন্ট। ওই রাক্ষসীটা তোমার মাথা খাবার জন্যে হাঁ করে রয়েছে, আমি বলে রাখলাম। রোজি আমাকে উত্তর দেবার কোনোপ্রকার সুযোগ না-দিয়ে, নাচের লীলায়িত ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে আরম্ভ করলে।
আমি আর একবার অবাক হয়ে আমার চারিদিকের পৃথিবীকে দেখতে লাগলাম। এ কি আমি স্বপ্ন দেখছি? যে-আমি এই মুহূর্তে শাজাহান হোটেলে চাকরি নিয়ে বসে আছি, সেই আমিই কি একদিন কাসুন্দেতে বাস করত? সুধাংশু ভট্টাচার্যের বাড়িতে প্যাটারসনদা, চিনিদা, কানাইদা, পুলিনদা, কেষ্টদা, রবেদার সঙ্গে গল্প করত? এই-আমিই কি একদিন মেট্রো সিনেমাতে ছবি দেখতে এসে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল? একবার মনে হল স্বপ্নের মধ্যে রয়েছি। আমি—দুনিয়াতে শাজাহান হোটেল বলে কিছুই নেই; কাসুন্দের টোলে বসে, বিজয়া দশমীর দিন সিদ্ধি খেয়ে মাথা গোলমাল করে ফেলেছি। আবার পর মুহূর্তে কনির দিকে নজর পড়ে গেল। ওই তো স্কটল্যান্ড-দুহিতা কনি ভারতীয় সূর্যের কিরণে তার দেহটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্নান করাচ্ছে। এইটাই সত্য, কাসুন্দেটাই স্বপ্ন। শাজাহান হোটেল থেকে চুরি করে কয়েক পেগ হুইস্কি চড়িয়ে আমি স্বপ্ন দেখছি—কাসুলে বলে একটা জায়গা ছিল, সেখানে একদিন
আমার যাতায়াত ছিল।
আস্তে আস্তে ঘরের ভিতর থেকে ছাদের কেন্দ্রে চলে এলাম। ন্যাটাহারিবাবুর আত্মা যেন আমার উপর ভর করেছে। মনে হল, কনি সূর্য-বিলাস করছে, না, সর্বপাপঘ্ন দিবাকরের জ্যোতিতে নিজেকে শুদ্ধ করে নিচ্ছে।
আমাকে দেখেই কনি ধড়মড় করে উঠে বসল। বললে, গুড মর্নিং।
আমি বললাম, গুড মর্নিং।
কনি এবার বললে, তোমরা এত বোকা কেন? এমন সুন্দর ছাদটাকে তোমরা সানবেদিঙের জন্য ভাড়া দাও না কেন? রিজার্ভড ফর সানবেদি করে তোমরা অনেক টাকা রোজগার করতে পার।
আমার উত্তর দেওয়ার আগেই ছাদের একটা ঘর থেকে গ্রামোফোন বেজে উঠল। কনি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, কে এমন বেরসিক? এই ভোরবেলায় কোনোরকম শব্দ আমি সহ্য করতে পারি না।
আমার মনে হল শব্দটা যেন মিস্টার গোমেজের ঘর থেকে ভেসে আসছে। কনি অধৈর্য হয়ে বললে, যে বাজাচ্ছে, সে নিশ্চয়ই তোমাদের কলিগ। তুমি কি তাকে গ্রামোফোন বন্ধ করতে বলবে? সারারাত তো আমাকে গানের মধ্যে ড়ুবে থাকতে হবে। আবার এখনও?
যা ভেবেছি তাই। সোজা মিস্টার গোমেজের ঘরে গিয়ে দেখলাম, বুশশার্ট এবং পায়জামা পরে একটা চেয়ারে মিস্টার গোমেজ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। সামনে একটা গ্রামোফোন রেকর্ড আপন মনে বেজে চলেছে। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। এই ভোরবেলায়, এই সোনা-ছড়ানো সকালে বেলাশেষের গান কেন? এখনই যেন পশ্চিম দিগন্তে ক্লান্ত সূর্য অস্ত যাবেন। আমাদের বিদায় নেবার মুহূর্ত যেন সমাগত। সঙ্গীতের কিছুই বুঝি না আমি। কিন্তু মনে হল, কেউ যেন আমাকে কোকেন ইঞ্জেকশন দিয়ে ধীরে ধীরে অবশ করে দিচ্ছে।
গোমেজ আমাকে দেখে বিষণ্ণ হাসিতে মুখটা ভরিয়ে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন, শুনুন, মন দিয়ে শুনুন।
আমারও শোনবার ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কনি এতক্ষণে হয়ত চিৎকার করতে শুরু করবে। কানে কানে বললাম, কনি আপনাকে ডাকছে।
গোমেজ এবার বিরক্তভাবে বাইরে বেরিয়ে এলেন। গোমেজকে দেখেই কনি একটা টার্কিশ তোয়ালে নিজের দেহের উপর বিছিয়ে দিলে; আস্তে আস্তে বললে, মিস্টার গোমেজ, এই ভোরবেলায় কোনো শব্দ আমার ভালো লাগে না।
কে যেন গোমেজের দেহে বিদ্যুতের চাবুক মারল। এই হোটেলে তার অবস্থা কি গোমেজের জানতে বাকি নেই। হোটেলের প্রধান ভরসা কনি, যার জন্যে এক রাত্রে আট-নহাজার টাকার বিক্রি বেড়ে যায়, তার ইচ্ছের উপর যে সামান্য একজন বাজনদারের মতামতের কোনো মূল্য নেই তা তিনি জানেন, তবু তার দেহটা মুহূর্তের জনে চমকে উঠল। কনি গোমজের এই পরিবর্তন দেখতে পেরেছে। তোয়ালেটা সরিয়ে আরও খানিকটা রৌদ্র উপভোগ করবার জন্যে প্রস্তুত হতে হতে সে বললে, কী হল?
গোমেজ কোনোরকমে বললেন, মিস কনি, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার অসুবিধে ঘটাবার জন্যে আমার লজ্জার শেষ নেই। তবে আজ আমাদের জীবনের একটা স্মরণীয় দিন সেই জন্যেই।
গোমেজ সোজা এইবার নিজের ঘরে চলে যাচ্ছিলেন। কনি হঠাৎ তার মাদুর থেকে উঠে পড়ল। স্লিপিং গাউনটা পরতে পরতে বললে, মিস্টার গোমেজ! কনি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
গোমেজ কিছুই শুনতে পেলেন না। সোজা নিজের ঘরে গিয়ে গ্রামোফোনটা বন্ধ করে দিলেন। কনি ততক্ষণে ছুটতে ছুটতে গোমেজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। আমিও পিছন পিছন গিয়ে দেখলাম কনি বলছে, আজকের তারিখে কী হয়েছিল?
গোমেজ এখন কাউকে ভয় পাচ্ছেন না। ম্যানেজমেন্টের আদরিণী, দর্শকদের প্রিয় কনি যেন তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আস্তে আস্তে তিনি বললেন, তুমি নাচো, তুমি গান গাও। আর তুমি জানো না আজকের তারিখটা কী?
কনি ভয় পেয়ে গিয়েছে। মন্ত্রবলে গোমেজ যেন তাকে সম্মোহিত করবার চেষ্টা করছেন। কোনোরকমে সে বললে, আমার অজ্ঞতা ক্ষমা করো। বলল আজকের তারিখে কী হয়েছিল?
