আমি বললাম, আমি বালিশের মালিক, ঘরের মালিক নই। তবু, মেমসায়েব, এই কথা বলতে পারি, শাজাহান হোটেল আপনাকে ঠান্ডা ঘর দিলেও, আপনার অ্যাসিস্টান্টকে দিতে পারবে না। মেমসায়েব বললেন, তাহলে সে কোথায় থাকবে? আমি বললাম, যেখানে শাজাহান হোটেলের
অন্য সবাই থাকে—ছাদে।
মেমসায়েব মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। এই শাজাহান হোটেলে মাসের পর মাস কত নাচের মেয়ে আসছে, তারা কেউ তো অ্যাসিস্টান্ট নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা এসে খোঁজ করে কোথায় তাকে ঘর দেওয়া হয়েছে। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা। বিছানা নরম আছে কিনা। বালিশ ঠিক আছে কিনা। ন্যাটাহারিবাবু এবার থামলেন।
আমি বললাম, তাতে হয়েছে কী?
যা হবার তা হয়েছে! ন্যাটাহারিবাবু মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, আহা!
ন্যাটাহারিবাবুর মাথা চাপড়ানোর কারণ বুঝতে না পেরে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ন্যাটাহারিবাবু বললেন, ভগবান কি আপনার মাথায় এক ফোটাও ঘি দেননি? আপনি কি চোখে দেখতে পান না? অমন লক্ষ্মী প্রতিমার মতো মেমসায়েব; আর কোথায় ওই বামনাবতার। কিন্তু মশাই, কি বলব। শাস্ত্রেই বলছে-যার সঙ্গে যার মজে মন, কিবা হাড়ি কিবা ডোম! কোথায় অত বড়ো নাচিয়ে, যার জন্যে আমাদের সায়েবরা হাজার হাজার টাকা খরচ করছেন, আর কোথায় তার ল্যাংবোট বামন—যার শো থাকল আর না থাকল। অথচ বাঁটকুলের সে কী তেজ! বলে কিনা-কনি, তুমি এখানে থেকে যাও, আমি চললাম। সেই শুনে ছুঁড়ির মুখ শুকিয়ে আমসি। বললে-প্লিজ, তুমি রাগ কোরো না। আমি যা হয় করছি। বামন তো জানে ঘুড়ি তার মুঠোর মধ্যে। তাই আরও রাগ দেখালে। বললে, তুমি এখানে থেকে যাও, নাচো, লোকের হাততালি কুড়োও। আমার এসবের দরকার নেই। কনি তখন বলে কি জানেন? নিজের কানে না শুনলে আমি বিশ্বাসই করতাম না। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, ছাদে আমাকে একটা ঘর দিতে পারো না?
নিত্যহরি ভটচায্যি এত বছর এই শাজাহান হোটেলের ময়লা কাপড় ঘেঁটে মরছে। সে সব বোঝে। মনে মনে বললাম, পাশাপাশি ঘর চাও নিশ্চয়! মুখে বললাম, আমি জানি না। জিমি সায়েবকে ডেকে দিচ্ছি।
জিমি সায়েব এসে কী করলে জানি না। দেখলাম, ল্যামব্রেটা উপরে চলে গেল। মেমসায়েব ঠান্ডা ঘরেই রয়ে গেলেন। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হল, মাঝখান থেকে পুওর উলুখাগড়ার ভেলুয়েবল লাইফটা চলে গেল। আমি কোথায় জিজ্ঞাসা করতে গেলাম, রাত্রে একস্ট্রা বালিশ লাগবে কিনা। রেগে গিয়ে তার উত্তরই দেওয়া হল না। বরং ন্যাকা সেজে, রেগে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা হল-বালিশ? ঘরে তো দুটো বালিশ রয়েছে। সিঙ্গলরুমে আর বালিশ নিয়ে কি আমি রোস্ট করে খাব?
কালী, কালী, ব্রহ্মময়ী মা আমার! নিত্যহরিবাবু এবার উঠে পড়লেন। যাই আমি। এতক্ষণে ধাপাগুলো কাজে ফাঁকি দিয়ে গাঁজা টানতে বসে গিয়েছে নিশ্চয়। যাবার সময় ভদ্রলোক আমার চাদর আর বালিশ দুটো নিজেই তুলে নিলেন।
আমি বাধা দিতে গেলাম। বললাম, বেয়ারা রয়েছে, সে নিয়ে যাক। না-হয় আপনার ধোপাদের কাউকে পাঠিয়ে দিন। আপনি..
ন্যাটাহারিবাবু পরমুহূর্তে নিজের অজ্ঞাতেই বোধহয় নবরূপে প্রকাশিত হলেন। তার চোখদুটো মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল। বললেন, ছেলেপুলে নেই বলে আমার মধ্যে ভগবান কি মায়া দয়া দেননি? তুমি আমাকে এত বড় কথা বললে? তোমার থেকেও আমার ছেলের বয়স কত বড় হতে পারত তা তুমি জানো? ন্যাটাহারিবাবু কথা শেষ না-করেই ঘর থেকে দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেলেন।
এই ভোরবেলাতেই আমার ঘরে যে এমন একটা ব্যাপার হয়ে যাবে, তার জন্যে গুড়বেড়িয়া প্রস্তুত ছিল না। সে ঘরে ঢুকে বললে, আপনার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
চা-এর পাত্র শেষ করে ঘরের বাইরে এসে দেখলাম, কনি কখন ছাদের উপরে উঠে এসেছে। কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হয়ে কনি শাজাহান হোটেলের মাথায় বসে সূর্যদেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করছে। ভোরবেলার সূর্যকিরণে এমন সব গোপন পদার্থ থাকে, যার সান্নিধ্যে সুন্দরীদের সৌন্দর্য নাকি আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কে জানে, হয়তো তাই। কিন্তু ভোরবেলায় এই প্রকাশ্য সূর্যসেবায় উপস্থিত অন্যান্য জীবদের যে সামান্য অসুবিধা হতে পারে, তা যেন কনির খেয়াল নেই।
সুসজ্জিত বেশবাসে রোজিও ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। মার্কোপোলো এই সময় কিছু ডিক্টেশন দিয়ে কাজের বোঝা হাল্কা করে রাখেন। আমাকে দেখেই রোজি তির্যক দৃষ্টিশর নিক্ষেপ করল। আমি বললাম, গুড মর্নিং।
রোজি আমার শুভেচ্ছা ফেরত দিল না। বরং দাঁত দিয়ে হাতের নখ কাটতে আরম্ভ করল। রেগে গিয়ে আমি বললাম, মিস্টার মার্কোপোলোও সেদিন তোমাকে বলেছেন—ব্লেড দিয়ে নখ কাটতে হয়।
হয়তো রোজিকে এমন ভাবে বলা আমার উচিত হয়নি। কিন্তু ওর উপর আমার কেমন একটা সহজাত রাগ ছিল। রোজি প্রথমে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। ঠিক রাঙা নয়। বীরভূমের রাঙামাটির পথে কিছুক্ষণ হাঁটলে কালো জুতোর যেমন রং হয়, ওর মুখের রং ঠিক সেই রকম হয়ে উঠল। রোজি বললে, আমি এখনই জিমিকে সঙ্গে করে মার্কোপোলোর কাছে যাচ্ছি। দরকার হলে বোসকেও ডাকব।
এবার সত্যি আমার ভয় হল। জিমি লোকটা মোটেই ভালো নয়। শুধু শুধু এই সকাল বেলায় গায়ে পড়ে রোজিকে অপমান করা আমার উচিত হয়নি। কিন্তু যা হবার তা হয়েই গিয়েছে। রোজি ছাড়বে না। শাজাহান হোটেল থেকে আমাকে তাড়াবার সামান্য সুযোগ পেলে সে তো ব্যবহার করবেই। গম্ভীরভাবে বললাম, মার্কোপোলোকে তুমি কী বলবে?
