গতরাত্রে আমার ঘরে যে কাণ্ড হয়েছিল তা এবার তার কাছে নিবেদন করলাম, বললাম, মাতাল সায়েবটা বিছানার উপর উঠে যা কাণ্ড করলে।
ন্যাটাহারি আমাকে কতখানি বিশ্বাস করলেন তা তার কথা থেকেই বুঝলাম। মুখ বেঁকিয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, মশাই, এই নিত্যহরি ভট্টাচার্যও তার বাবাকে একদিন বলেছিল যে, তাকে শিখ পাঞ্জাবিতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
রহস্যটা হৃদয়ঙ্গম না-করতে পেরে ওঁর মুখের দিকে তাকালাম। ন্যাটাহরিবাবু অসন্তুষ্ট হয়েই বললেন, কতবার আর রিপিট করব? আপনার বাবা কি আপনাকে দুধের বদলে পিটুলি গোলা খাইয়ে মানুষ করেছেন? আপনার ব্রেনটা যে কিছুই মনে রাখতে পারে না।
আমি চুপ করে রইলাম। নিত্যহরিবাবু বললেন, বাবার কাছে আমি শিখ-পাঞ্জাবির গল্প বানিয়ে ছাড়লাম। বাবা ঋষিতুল্য সরল মানুষ, আমাকে বিশ্বাস করলেন। মহাপাপ করেছিলাম। উপরে যিনি রয়েছেন, তিনি তো সব দেখছেন। সেখানে ফাঁকি দেবার উপায় নেই। সব কর্মের নগদ বিদায় দেবার জন্যে থলে নিয়ে তিনি সংসারের ফটকে বসে রয়েছেন। না হলে, রাঢ়ী শ্রেণি, ফুলিয়া মেল, ভরদ্বাজ গোত্র নিত্যহরি ভট্টচার্যকে ধোপর কাজ করতে হয়? দুনিয়ার পাপ দুহাতে ঘাঁটতে হয়? সারারাত ধরে এই পোড়া হোটেলের ঘরে ঘরে, খোপে খোপে যত পাপ তৈরি হচ্ছে, যত অনাচার বালিশে, তোশকে, চাদরে, কাপড়ে মাখামাখি হচ্ছে তা সব আমাকে পরিষ্কার করতে হয়? নিত্যহরিবাবু আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
তারপর যেন আমাকে সাবধান করবার জন্যেই বললেন, এমন হত না মশাই! বাউনের ছেলে, লেখাপড়া শিখে আমিও এতদিনে বাবার মতো বঙ্গবাসী কিংবা রিপন কলেজে একটা প্রেপেচারি করতে পারতাম। প্রেপেচার তো আমার বাবাও ছিলেন। প্ৰেপেচারের রক্তই তো মশাই এই শর্মার শিরায় শিরায় বইছে। নিত্যহরিবাবু হঠাৎ চুপ করে গেলেন। কী ভেবে গভীর হতাশার সঙ্গে বললেন, সে রক্তের এক ফোটাও আজ আর এই শরীরে নেই, কবে জল হয়ে গিয়েছে। শিরা কেটে দিলে নিত্যহরির দেহ থেকে এখন যা বেরোবে সে আর রক্ত নয়, সে কেবল সাবান আর সোডার ফেনা।
নিত্যহরিবাবু বললেন, ইস্কুলে পড়তে পড়তেই বয়ে গিয়েছিলাম, মশাই। একদিন রাত্রে তো মদ গিললাম। পাল্লায় পড়ে বেপাড়ায় গেলাম। কিন্তু বাবা আমার মাটির মানুষ। বই ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। মাও তথৈবচ। পরের দিন ওঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? রাত্রে ফিরলি না কেন? আমি বললাম, ময়দানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে সোজা ফিরছিলাম; এমন সময় শিখ-পাঞ্জাবির পাল্লায় পড়লাম। ওরা ধরে নিয়ে গেল। সারারাত কান্নাকাটি করায় আজ সকালে ছেড়ে দিল।
নিত্যহরিবাবু একবার ঢোক গিললেন।গায়ে আমার মদের গন্ধ ছাড়ছিল। তবু মা আমায় বিশ্বাস করলেন, শিখ-পাঞ্জাবিদের বিছানায় শুয়ে আমার এই . অবস্থা হয়েছে। আপনিও বলছেন, ওই বাঁটকুলে সায়েব আপনার বিছানা নষ্ট করে দিয়ে গিয়েছে। দেখবেন মশাই।
আমি মৃদু হাসলাম। নিত্যহরিবাবু বললেন, কলকাতায় কত কচি কচি ছেলের বারোটা এইভাবে হোটেলে, রেস্তোরাঁয় আর খারাপ জায়গায় বেজে যাচ্ছে, তার খবর তো আর গরমেন্ট রাখে না। বেচারা গরমেন্টকেই শুধু দোষ দিই কেন, বাপেরাই রাখে না। তারা ভাবছে, তাদের ছেলেদের শিখ-পাঞ্জাবিতেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
নিত্যহরিবাবু ততক্ষণে আমার বিছানা থেকে চাদরটা গুটিয়ে নিতে আরম্ভ করছেন। গুটোতে গুটোতে বললেন, তোষকটাও পালটিয়ে দিই। দূরে থাকুন। পাপ থেকে দুরে থাকবার চেষ্টা করুন।
নিত্যহরিবাবুকে বললাম, হাত ধোবেন? নিত্যহরিবাবু রেগে উঠলেন। কতবার আর খোবো? হাত ধুয়ে ধুয়ে তো চামড়া পচে গেল। এই সমস্ত হোটেলটাকে যদি বিরাট একটা ডেটলের গামলায় চুবিয়ে রাখা যেত, তবে আমার শান্তি হত।
ওঁর ভাবগতিক দেখে আমার আর কথা বলতে সাহস হচ্ছিল না। কিন্তু নিত্যহরিবাবু ছাড়লেন না। গম্ভীরভাবে বললেন, ভালো করেননি মশাই। ছিলেন শর্টহ্যান্ডবাবু, ভালো কথা। কাউন্টারের আসুন-বসুন-বাবু হলেন, তাও চলে যায়। কিন্তু তাতির আবার এড়ে গোরু কেনার শখ হল কেন? ওই রাতের নাচে যাবার কী দরকার ছিল?
বললাম, শখ করে কী আর গিয়েছি, নিত্যহরিদা? চাকরিটা তো রক্ষে করতে হবে?
কে যেন নিত্যহরিদার ক্রোধাগ্নিতে জল ঢেলে দিল। চাকরির কথাতে জ্বলন্ত নিত্যহরিদা দপ করে নিবে গেলেন। আস্তে আস্তে বললেন, হ্যাঁ, ঠিক ভাই। এই পোড়া পেটটার জন্যে দুনিয়াতে লোকে কী না করছে? এই পোড়া পেট না থাকলে ন্যাটাহরি শর্মাও দুনিয়ার লোকের পরনের কাপড় ঘেঁটে মরত না।
আমি বললাম, এই পোড়া পেটটাই তো আমাদের সর্বনাশ করেছে। এই পেট না থাকলে ক্যাবারে গার্ল কনিকেও দেহ উলঙ্গ করে নেচে বেড়াতে হত না। ন্যাটাহারিবাবু এবার গম্ভীর হয়ে উঠলেন। বললেন, পেট ছাড়াও একটা জিনিস আছে, তার নাম স্বভাব। আপনাদের এই মেমসায়েবকে আমার কিন্তু ভালো লাগেনি।
ভাগলাম, গতরাত্রের ঘটনাটা বোধহয় তিনি জেনে গিয়েছেন। কিন্তু ন্যাটাহারিবাবুর কথা থেকেই বুঝলাম তিনি অন্য ঘটনার কথা বলছেন। নাকের চশমাটা সোজা করে নিয়ে নাটাহারিবাবু বললেন, হ্যাঁ বাপু, যা সারাজন্ম সাপ্লাই করে আসছি, দুটো একস্ট্রা বালিশ চাও বুঝতে পারি। তা না। আর এত লোক থাকতে কিনা আমাকে! আমি তো মশাই ট্যারা! আরে মশাই, আমি খোজ করতে গিয়েছি আরও বালিশ লাগবে কিনা। তার উত্তর সোজাসুজি দিয়ে দে। তা না, ঠান্ডা ঘরের গরম মেমসায়েব রেগেই আগুন। বলে কিনা, আমার অ্যাসিস্ট্যান্টকেও আমার লাগোয়া এয়ারকন্ডিশন ঘর দিতে হবে।
