আমি দেখলাম, দরজার সামনে কনি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়বার জন্যে আমিও তৈরি ছিলাম না। কনি এবার আস্তে আস্তে ছাদের এক কোণে এসে দাঁড়াল। আমি দেখলাম, কনি কাঁদছে। কনি দি উয়োম্যান স্লিপিং গাউনের হাতা দিয়ে চোখের জল মুছছে। আস্তে আস্তে সে এবার আমাকে বললে, বুটস্। পৃথিবীর এই লোকরা ব্রুটস্। হ্যারির সামনে শাজাহানের বার থেকে উঠে এসে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলে তোমার এই ক্লাউনটা শিক্ষিত শিম্পাজি না মানুষ?
ও যদি নিজের ঘরে বসে মাতলামো করত কিছু বলতাম না। আমি দেখতেও যেতাম না। ওই তো আমাকে বাধ্য করলে। আমার কী দোষ?—কনি যে সত্যিই কঁদছে তা আমার বুঝতে বাকি রইল না। সে বললে, তুমি কিছু মনে করো না। সারাদিন খেটে খুটে তুমি যখন ঘুমোতে এলে, তখন হ্যারি তোমার মুডটা নষ্ট করে দিয়ে গেল।
আমি লজ্জিত হয়ে বললাম, তাতে কী হয়েছে। উনি তো আর জেনে শুনে কিছু করেননি। নেশার ঘোরে কেউ কিছু করলে, তার জন্য তাকে দোষী . করা চলে না।
কনি বললে, যাই, ওকে আর একবার দেখে আসিগে যাই। কনি এবার ল্যামব্রেটার ঘরে পা টিপে টিপে ঢুকে গেল। আজ আমার ঘুম আসবে না। গুড়বেড়িয়াকে এক গ্লাস জল আনতে বলে, আমি আমার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কিন্তু কনির কী হল। ল্যামব্রেটার ঘরে সেই যে সে ঢুকেছে, আর বেরোবার নাম নেই। ঘরের মধ্যে আলো জ্বলছে কিনা তাও বুঝতে পারছি না। ঘরের দরজাটা কনি একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। ওরা দুজনে কি কোনো কথা বলছে? না তো। ফিসফিস করে কথা বললেও কাঠের পার্টিশন ভেদ করে কিছু গুঞ্জন এই স্তব্ধ রাত্রে আমার কানে এসে হাজির হত।
গুড়বেড়িয়া আমার হাতে জলের গেলাসটা দিয়ে দিল। জলটা এক নিঃশ্বাসে পান করে ফেললাম। বুকের ভিতরটা যেন একেবারে শুকনো মরুভূমি হয়ে ছিল। গুড়বেড়িয়া এতক্ষণে কোনো গণ্ডগোলের আভাস পাচ্ছে। এই রাত্রে ছাদের ঘরগুলোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার। সেখানে কোনো অঘটন ঘটলে তার চাকরিটাই আগে যাবে। গুড়বেড়িয়া ফিসফিস করে প্রশ্ন করলে, ল্যাংটা মেমসায়েব নীচে চলে গিয়েছেন তো?
আমি ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিলাম, মেমসায়েব এখনও যাননি।
অ্যাঁ! যাননি? তাহলে কোথায় তিনি?
ইশারায় গুড়বেড়িয়াকে দেখিয়ে দিলাম। গুড়বেড়িয়া বললে, হুজুর, যতদূর মনে হচ্ছে ঘরের আলো নেভানো। তাই না?
বললাম, আমার তো তাই মনে হচ্ছে। সন্দেহ নিরসনের জন্যে গুড়বেড়িয়া এবার সোজা ল্যামব্রেটার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের কাছাকাছি গিয়ে, কাঠের ফাঁক দিয়ে সে উঁকি মেরে নিঃসন্দেহ হতে চাইল, ঘরের আলো নিভে গিয়েছে কিনা। আমি তখনও বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছি। গুড়বেড়িয়া ফিরে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোতে লাগল। বললে সব্বোনাশ হয়েছে, হুজুর। বুলু আলো জ্বলছে।
তাতে তোর কী? আমি তাকে সাহস দিয়ে বললাম।
কী বলছেন, সায়েব! ঘর একেবারে অন্ধকার থাকলে আমি এতটা ভয় পেতাম না। পরবাসীয়া আমাকে প্রথম দিন বলে দিয়েছিল, আলো থাকলে ভয় নেই, আলো না থাকলেও তেমন ভয় নেই, কিন্তু দুশমন হচ্ছে ওই বুলু আলো। গুড়বেড়িয়ার এবার কেঁদে ফেলবার অবস্থা। চোখ মুছতে মুছতে বললে, আমাকে শনিতে ধরেছে। আমার আর চাকরি থাকবে না।
কাঁদতে কাঁদতে সে নিবেদন করলে, ল্যাংটা মেমসায়েবদের উপর কড়া নজর রাখবার হুকুম আছে। তাদের বার-এ ঢুকতে দেওয়া বারণ; তাদের ঘরে কোনো পুরুষমানুষদের ঢুকতে দেওয়া বারণ; কোনো পুরুষমানুষের ঘরেও তাদের প্রবেশ নিষেধ। যদি কারুর ঘরে সে ঢুকেও পড়ে, দরজা হাট করে খুলে রাখতে হবে। আমার চাকরিটা আজ গেল হুজুর!
আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, অত ভয় পাচ্ছ কেন? এই রাত্রে কে তোমার ছাদে আসছে?
আপনি জানেন না। মার্কোসায়েব রবারের জুতো পরে কখন যে এসে পড়বেন, কিছুই ঠিক নেই। সায়েব কোনো কথা শুনবেন না। সঙ্গে সঙ্গে হোটেল থেকে দূর করে দেবেন। করিমকে সেবার যেমন সায়েব ঘাড় ধরে বের করে দিলেন। তখনকার ল্যাংটা মেমসায়েব একজন সায়েবকে রাত্রে ছেড়ে দিতে বলেছিল। ছেড়েও দিয়েছিল করিম। পাঁচটা টাকার জন্যে করিমের সব গেল।
গুড়বেড়িয়া এবার দরজায় ধাক্কা দেবার জন্যে এগিয়ে যাচ্ছিল। চাকরি যাবার ভয়ে বামনাবতার তার মাথায় উঠেছে। আমি বাধা দিলাম। বললাম, গুড়বেড়িয়া, সারাদিন কাজ করে বহু পরিশ্রান্ত লোক এখন ঘুমোচ্ছে। এখন তাদের ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করো না। গুড়বেড়িয়া আমার কথার মধ্যে কিসের। ইঙ্গিত খুঁজে পেল কে জানে। মনে হল সে সন্দেহ করছে, মেম সায়েবের ওই ঘরে ঢুকে পড়ে নীল আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার পিছনে আমারও কোনো। হাত আছে। গুড়বেড়িয়া এবার কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু আমার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাব আর ভাষায় প্রকাশ করতে সাহস করলে না।
আজ রাত্রের আকাশকে আমার বড় বিষণ্ণ মনে হচ্ছে। যেন সৃষ্টির ভান্ডারের যত আনন্দ ছিল, পৃথিবীর বেহিসেবি মানুষরা সব উড়িয়ে দিয়েছে। যা পড়ে আছে সে কেবল দুঃখ। কারুর জন্য কোথাও এক ফোঁটা প্রশান্তি। অবশিষ্ট নেই।
ল্যামব্রেটার ঘরের দরজা এবার খুলে গেল মনে হল। ঘরের নীল আলোটা এখন আর জ্বলছে না। সেখানে নির্ভেজাল অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মধ্য থেকেই শ্বেতদ্বীপবাসিনী কনি লঘু পদক্ষেপে বেরিয়ে এল। ধীরে ধীরে সে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির দিকে আসতে আসতে সে আমাকে দেখতে পেল। আমাকে সে যে দেখতে পাবে তা বোধহয় তার হিসাবের মধ্যেই ছিল না। কিন্তু আমাকে অবজ্ঞা করেই সে নিজের ঘরে চলে গেল।
১০. গন্ধ পাচ্ছি
গন্ধ পাচ্ছি। বেশ গন্ধ পাচ্ছি। নিত্যহরি ভট্চায্যির নাককে ফাঁকি দেওয়া কঠিন কাজ। আমার ঘরে ঢুকেই ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন। রাতের অন্ধকার তখনও কাটেনি। সেই সময়েই নিত্যহরিবাবু নিজের ঘর ছেড়ে ছাদে উঠে এসেছেন। রাত্রে ওঁর মোটেই ঘুম আসে না; তাই আড্ডা দিয়ে সময় কাটাবার জন্যে আমার ঘরে চলে এসেছেন। আমার তোশক এবং বিছানা চাদরের অবস্থা ঘরে ঢুকেই তিনি বুঝতে পারলেন। বললেন, তা বেশ বেশ। আমাদের শাস্ত্রেই রয়েছে যস্মিন্ দেশে যদাচার।
