দেবতাই বটে! বামন সায়েবকে দেখে গুড়বেড়িয়ার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, ইনি সাক্ষাৎ শ্রীভগবানের অবতার। গুড়বেড়িয়াকে বললাম, তোমার ভগবান-টগবান রাখো। এখন মাতাল সায়েবকে কী করে ঘর থেকে বের করা যায় বলো?
গুড়বেড়িয়ে আমার তোয়াক্কা রাখে না। আমার খুশি-অখুশিতে তার চাকরি নির্ভর করে না। তাছাড়া, ক্ষতি যা হবার তা প্রায় হয়েই গিয়েছে। পরবাসীয়া মেয়েটার বিয়ের ব্যবস্থা প্রায় পাকা করে ফেলেছে।
ভেবে দেখলাম, কোনো উপায় নেই। কনিকে ডেকে পাঠানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই। গুড়বেড়িয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, কনি মেমসায়েব কোথায়?
গুড়বেড়িয়া বললে, নীচের তলায়। বাধ্য হয়েই ফোন করলাম। টেলিফোনটা বেজে উঠতেই কনি ফোনটা ধরলে; এত রাত্রে কেউ যে তাকে ফোনে ডাকতে পারে, সে বোধহয় ভাবতেও পারেনি। বললে, কে? কী ব্যাপার?
যথাসম্ভব কম কথা খরচ করে আমার সমস্যার কথা কনির কাছে নিবেদন করলাম। সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করলাম, এত রাত্রে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত করা আমার উচিত নয়; কিন্তু ল্যামব্রেটার মাতলামো আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।
কনি বেশ ভয় পেয়ে গেল। সে যে চমকে গিয়েছে, তা তার গলার স্বর থেকেই বুঝলাম। কনি বললে, আমি এখনই ছাদে যাচ্ছি।
কনি ছাদে আসছে শুনে গুড়বেড়িয়া তড়াং করে উঠে দাঁড়াল। এত রাত্রে ল্যাংটা মেমসায়েবদের আবার ছাদে আসবার দরকার কী?
ছাদের দরজাটা এবার মুহূর্তের জন্যে খুলে গেল। সেখানে স্লিপিংগাউনে দেহ আবৃত করে, মাথায় সিল্কের বনেট জড়িয়ে যে দাঁড়িয়ে আছে, কয়েক ঘন্টা আগে সে কলকাতার গণ্যমান্যদের মনোরঞ্জন করছিল। তার ভঙ্গিতে তখন লাস্য ছিল, যৌবনের দেহ ছিল। কিন্তু রাত্রের এই অন্ধকারে, আমার চোখের সামনে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে রয়েছে, সে যেন অন্য কেউ। সে আর যাই হোক—কনি দি উয়োম্যান নয়। এ কনিতে একটুও আগুন নেই। নিতান্ত একঘেয়ে হলেও, সেই পুরনো উপমাই মনে পড়ছে—তার মুখে আকাশের চঁাদের স্নিগ্ধতা।
কনি বললে, কোথায় সে? আপনাকে অ্যাটাক করেছিল নাকি?
বললাম, আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট আমাকে আক্রমণ করেনি, কিন্তু আমার ঘর অধিকার করে বসে আছে। ওখানে বসে বসে মদ খেতে খেতে অনেকটা হুইস্কি আমার বিছানার তোশকের উপর ফেলে দিয়েছে।
আমার কথা শুনে কনি লজ্জায় মাটিতে মিশে গেল। আস্তে আস্তে বললে, আই অ্যাম সো স্যরি, বাবু। কনি সোজা আমার ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল। ঢুকেই অস্ফুট স্বরে বললে, হ্যারি!
ল্যামব্রেটার যে আর কোনো নাম থাকতে পারে তা আমার মাথায় আসেনি। হ্যারি নাম শুনেই ল্যামব্রেটা চমকে উঠে দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। কনিকে দেখেই, প্রথমে সে হুইস্কির বোতলটা প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলে। যেন ওইটা কেড়ে নেবার জন্যেই কনি ঘরের মধ্যে ঢুকেছে। ল্যামব্রেটা বোধহয় সব বুঝতে পারলে। কিন্তু পরমুহুর্তেই প্রতিবাদের সাহস জোগাড় করে বললে, আমি যাব না। কিছুতেই যাব না। জানোয়ারের বাচ্চাদের আমি ছারপোকার মতো টিপে মেরে ফেলব। তাতে তোমারই বা কী? আই এই গালফুলো বেলুনমুখো ছোকরারই কী?
কনি দাঁতে দাঁত চেপে বললে, হ্যারি, রাত্রি অনেক হয়েছে। তুমি এই নিরীহ ভদ্রলোকের বিছানা নষ্ট করে দিয়েছ।
তার জন্যে আমি স্যরি। আমি ইচ্ছে করে করিনি। ছারপোকা মারতে গিয়ে বোতলটা পড়ে গিয়েছিল। তাতে ওঁর কী ক্ষতি হয়েছে? আমারই তো লোকসান হল।
হ্যারি! কনি এবার আরও চাপা, অথচ আরও তীব্র স্বরে বললে। ল্যামব্রেটাও এবার দপ করে জ্বলে উঠল। বেশ করব। আমার যা খুশি তাই করব। তাতে তোমার কী? এক মগ বিয়ার নিয়ে এসে আমি এই ছোঁড়ার মাথার বালিশ ভিজিয়ে দেব; দু বোতল রাম দিয়ে আমি নিজের কোট কাচব; হোয়াটস্ দ্যাট টু ইউ?
এমন অবস্থার জন্যে কনি বোধহয় প্রস্তুত ছিল না। ল্যামব্রেটা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। লজ্জায় অপমানে কনির মুখ যে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে, তা আমি বুঝতে পারলাম। কনি নিজের দেহের সব রাগ চেপে রেখে, আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে কিছু করতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। হঠাৎ যেন তার মনে পড়ে গেল ঘরের মধ্যে আমিও দাঁড়িয়ে রয়েছি। মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে কনি আমাকে বলল, প্লিজ, তুমি যদি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াও।
কোনো কথা না বলে, আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু সে বোধহয় এক মিনিটেরও কম সময়ের জন্যে। তারই মধ্যে যেন মন্ত্রের মতো কাজ হয়ে গেল। কোনো এক আশ্চর্য উপায় ল্যামব্রেটা তার সংবিৎ ফিরে পেয়েছে! কনি আমাকে ঘরের ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে বললে, কাম ইন।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম, ল্যামব্রেটা একেবারে জল হয়ে গিয়েছে। বলছে, প্লিজ। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি রিয়েলি স্যরি।কনি বললে, আর নয়। আমি অনেক সহ্য করেছি।
ল্যামব্রেটা এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে, আমি এখনই নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছি।
যাও। এখনি নিজের ঘরে চলে যাও। কনি বললে।
নিজের ঘরে যাবার জন্যে উঠে পড়ে ল্যামব্রেটা হঠাৎ আমাকে দেখতে পে। অভিমানে ছোট ছেলের মতো মুখ ফুলিয়ে কনিকে বললে, তুমি শুধু আমার দোষ দেখো। আর ওরা যে আমাকে শিম্পাঞ্জি বললে, তখন? তখন তো কিছু বললে, না? ছোটো ছেলের মতো ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে ল্যামব্রেটা নিজের ঘরে চলে গেল। কনি কিছু বলার জন্যে তার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু কোনো কথা না শুনে ল্যামব্রেটা নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে দড়াম করে দরজা ভেজিয়ে দিল।
