সেইজন্যেই তো স্যান্ডউইচ আনিয়ে রেখেছি! খিদে থাকলে আধডজন স্যান্ডউইচে কিছু হত না। তাছাড়া তোমাকে আজ খাওয়াতে ইচ্ছে করছে। চমৎকার অ্যানাউন্স করেছ, কনিও খুব খুশি। কনি তো বিশ্বাসই করলে না জীবনে কোনোদিন তুমি ক্যাবারে আর্টিস্টদের প্রেজেন্ট করোনি।
আমার চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। আমার আপত্তি অমান্য করে চোখে জল কেন যে আমাকে অপদস্থ করবার চেষ্টা করছে, বুঝতে পারলাম না।
মানুষের মনের কথা বোসদা যেন অতি সহজেই বুঝে ফেলেন। আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, বেশ বুঝতে পারছি, একদিন এই হোটেলে তোমার জুড়ি থাকবে না। কাউন্টারে, বারে, ক্যাবারেতে তোমাকে না-হলে এক মুহূর্তও চলবে না।
বোসদা এবার দেখতে পেলেন। আমি কাঁদছি। কী হল? ছিঃ, কাঁদছ কেন? পরমুহূর্তেই বোসদা আমাকে পরমস্নেহে জড়িয়ে ধরলেন। আমার মুখটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন। শাজাহানের আগুনে এতদিন পুড়ে পুড়েও বোসদা যে ছাই হয়ে যাননি, তা আবিষ্কার করলাম। জড়িত কণ্ঠে বোসদা বললেন, আমি খুব খুশি হয়েছি। তুই যে কাদছিস, এতে আমার আনন্দের সীমা নেই। কিন্তু দেখে যা। দেখার এমন সুযোগ জীবনে আর কখনও হয়তো পাবি না। কিন্তু চিরকাল এমন থাকিস। চিরকাল যেন এমন লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে পারিস।
তুমি থেকে বোসদা তুই-তে নেমে গিয়েছিলেন, এবার তুমি-তে ফিরে এলেন। বললেন, সাপারে বসে কনি তোমাকে খুঁজছিল। ভারি মিশুক মেয়েটা। চমৎকার কথাবার্তা বলে। অনেক মজার মজার গল্প বলছিল। সারা জীবনটাই তো যাযাবরের মতো কাটিয়ে দিল। পৃথিবীর এক হোটেল থেকে আর এক হোটেলে নাচতে নাচতেই ওর বসন্ত শেষ হয়ে যাবে। কনিই বলছিল, খেলোয়াড়, অভিনেত্রী এবং নর্তকীর জীবনে মাত্র একটি ঋতুই আছে। তার নাম বসন্ত ঋতু। এরা সকলেই কেবলমাত্র যৌবনে ধন্য। ভদ্রমহিলা আরও গল্প করতেন। কিন্তু ল্যামব্রেটাকে নিয়েই বিপদ হল। বামনটা বার-এ যেতেই কয়েকজন মহিলা ভয়ে চিৎকার করে ওঠেন। তাতে অপমানিত হয়ে ল্যামব্রেটা একজনের টেবিলের উপর বসে পড়ে। ভদ্রমহিলা মেটারনিটি জ্যাকেট পরে স্বামীর সঙ্গে বার-এ বসেছিলেন। ল্যামব্রেটা তাকে বলে, আমার দিকে ওইভাবে তাকিও না। তোমার যে ছেলে হবে, আমার থেকেও সাইজে ছোট হবে!
ভদ্রমহিলা সেই শুনে ফেন্ট হয়ে যাবার দাখিল। খবর পেয়ে আমরা আবার বার-এ গিয়ে ওঁদের সামলাই। কনিও জোর করে ল্যামব্রেটাকে ঘরে নিয়ে গেল। আড্ডাটা জমল না।
বোসদা বললেন, যাও, শুয়ে পড়গে। আমিও চেয়ারে বসে একটু চুলে নিই। রাত চারটের সময় কয়েকজন গেস্ট চলে যাবেন, তাদের জাগিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
ছাদের উপরে উঠে আস্তে আস্তে দরজাটা টেনে খুললাম। এই সময় কাউকেই জেগে থাকতে দেখার আশা করি না। গুড়বেড়িয়াও নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু পা দিয়েই দেখলাম একটা চ্যাপ্টা মদের বোতল নিয়ে ল্যামব্রেটা ছাদের ধুলোর উপর বসে আছে। কোট-প্যান্ট-টাই সে কিছুই ছাড়েনি। মাঝে মাঝে বোতলের মুখটা খুলে সে দু এক ঢোক গিলে নিচ্ছে। আমাকে দেখেই ল্যামব্রেটা উঠে দাঁড়াল। বললে, কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে দেখছ?
আমার তখন চাঁদ দেখবার মতো মানসিক অবস্থা নেই। বললাম, ঘুমোবেন না?
মদের বোতলটা হাতে করে ল্যামব্রেটা এবার সোজা আমার সঙ্গে চলে এল। অনুমতি না-নিয়েই ঘর খোলামাত্রই সে আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ল্যামব্রেটার চোখ দুটো দেখলে ভয় লাগে। যে আমুদে ক্লাউন কিছুক্ষণ আগেও কলকাতার সাড়ে তিনশো লোককে হাসিয়ে এসেছে, সে যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে।
ল্যামব্রেটা বললে, আমি শুনলাম, তুমি এখানেই ঘুমোও। তোমার জন্যেই আমি অপেক্ষা করছিলাম। তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি, কাল থেকে ক্যাবারেতে অন্য কাউকে তুমি কনির কোলে বসতে ডাকবে না। তাহলে বিপদ হবে।
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। লোকটা কি মদে চুর হয়ে আছে? আমার উত্তরের অপেক্ষা না-করে, ল্যামব্রেটা বললে, কলকাতার লোকরা তোমরা জানোয়ার। তোমাদের বাবা, মা, ঠাকুমা, দিদিমা কেউ মানুষ ছিলেন না। সব জানোয়ার। বলেই ল্যামব্রেটা তার বিশিষ্ট ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল। সঙ্গে গান। সে গানের অর্থ—আমাদের এই দুনিয়ায় সবাই জানোয়ার। যদি বিশ্বাস না-হয়, আমার সঙ্গে রাত্রে খারাপ পাড়ায় চলো, না-হয় অন্তত হোটেলে এসো।
আমার চোখে ঘুম নেমে এসেছে। এই সময় কোন পাগলের হাতে পড়লাম! বললাম, মিস্টার ল্যামব্রেটা, রাত অনেক হয়েছে। ল্যামব্রেটা এবার কুৎসিত গালাগালি শুরু করল। রাত হয়েছে তো কী হয়েছে? কী তোমার সতী-সাবিত্রী হোটেল। এখানে রাত নটা বাজলেই সব ব্যাটাছেলে যেন ঘুমিয়ে পড়েন!
বললাম, মিস্টার ল্যামব্রেটা, সারাদিন কাজ করে ক্লান্তি অনুভব করছি। বিছানার উপর উঠে নাচতে নাচতে ল্যামব্রেটা বললে, কনির কোলে বসে পড়বার সময় তো সে-কথা মনে থাকে না? বললাম, আমাকে এসব বলে লাভ কী? আমি তো কনির কোলে বসিনি।
না, তোমরা বসবে কেন? তোমরা রোমের পোপ, তোমরা ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ, তোমরা লর্ড বুড়ার ডাইরেক্ট ডিসেনডেন্ট! কনির যে একটা কোল আছে, তাই তোমরা ক্যালকাটা সিটিজেনরা জানো না।
ল্যামব্রেটার হাবভাব দেখে মনে হল, মদের ঘোরে সে এবার আমার ঘরের জিনিসপত্তর ভাঙতে আরম্ভ করবে।
নিরুপায় হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে গুড়বেড়িয়ার খবর করলাম। গুড়বেড়িয়া ঘুমোচ্ছিল। ধড়মড় করে উঠে পড়ে বললে, কী হয়েছে? দেবতা কিছু গণ্ডগোল করছে নাকি?
