হাইড্রান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল;
অথবা সে-হাইড্রান্ট হয়তো বা গিয়েছিল ফেঁসে।
এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে।
নিতান্ত নিজের সুরে তবুও তো উপরের জানালার থেকে
গান গায় আধো জেগে ইহুদি রমণী;
ফিরিঙ্গি যুবক কটি চলে যায় ছিমছাম।
থামে ঠেস দিয়ে এক লোল নিগ্রো হাসে;
হাতের ব্রায়ার পাইপ পরিষ্কার করে
বুড়ো এক গরিলার মতন বিশ্বাসে।
নাগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয়
লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।
তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব–অতিবৈতনিক,
বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত।
হুজুর, আপনি এখানে?
আমি চমকে উঠে দেখলাম, আমাদেরই হোটেলের দুজন ওয়েটার দাঁড়িয়ে রয়েছে। তোমরা এখানে? আমি প্রশ্ন করলাম।
আমরা এখানে ঘুমোই। রান্নাঘরে একটুও জায়গা নেই। কুকের মেটরা সেখানে কাউকে ঢুকতে দেয় না।
হোটেলের লাউঞ্জে অনেক জায়গা পড়ে আছে, কার্পেটের উপর ইচ্ছে করলেই কয়েকটা লোক ঘুমিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তাতে হোটেলের সৌন্দর্য নষ্ট হবে! সেখানে কাউকে শুতে দেওয়া যায় না। বাইরের গাড়িবারান্দাও নিষিদ্ধ। সেখানে হোটেলের কর্মচারী পড়ে থাকলে হোটেলের সম্মানের ক্ষতি হয়। তাই স্যর আশুতোষ এবং ভিক্টোরিয়া হাউসের পদতলে আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
তোমরা খেয়েছ? প্রশ্ন করলাম।
হ্যাঁ, ছোট শাজাহানের সঙ্গে পাকা ব্যবস্থা করা আছে। প্রত্যেক মিল চৌদ্দ পয়সা। শুধু মায়াধর খায়নি।
কেন মায়াধর, তুমি খাওনি কেন? আমি প্রশ্ন করলাম। মায়াধর তখন ঘাসের উপর বসে পড়েছে : যন্ত্রণায় পায়ের ডিমটা সে চেপে ধরে আছে। বেয়ারাদের একজন বললে, ওর পায়ের ব্যথা বেড়েছে। পায়ের শিরাগুলো আজকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।
হাঁটু গেড়ে বসে ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের বিনা পয়সার আলোয় দেখলাম, ওর পায়ে নীল শিরাগুলো দড়ির মতো ফুলে ফুলে উঠেছে। যেন অনেকগুলো নীল সাপ একসঙ্গে ওর পা জড়িয়ে ধরেছে। সত্যদার কাছে শুনেছি, এর নাম ভেরিকোজ ভেন।
বেয়ারাদের একজন বললে, হুজুর, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়। পা দুটোকে কেটে ফেলে দিই। আমাদের শেষ ওতেই। বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শিরাগুলো ফুলতে আরম্ভ করে। সায়েবেদের কাছে লুকিয়ে রাখতে হয় হুজুর। স্টুয়ার্ড জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে তাড়িয়ে দেবে।
ডাক্তার দেখাও না তোমরা? আমি জিজ্ঞেস করেছি।
সুই লাগাতে হয়, অনেক টাকা লাগে। আর ডাক্তার বলে, পা দুটোকে বিশ্রাম দাও। তা হুজুর, হোটেলের কাজ করব আবার পা-কে বিশ্রাম দেব তা তো হয় না।
মায়াধরকে বললাম, তুমি এখনও ডাক্তার দেখাওনি?
মায়াধর বললে, বোসবাবু এক জানাশোনা ডাক্তারের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়া হয়নি। টাকা জমাচ্ছি—অনেক সুই দিতে হবে যে। এবার যেতেই হবে। নইলে ভরতের মতো হবে। এর পরেই সমস্ত পায়ে ঘা হবে। সে ঘা ফেটে রক্ত পড়বে। আর দাঁড়িয়ে থাকবার মতো অবস্থা থাকবে না। চাকরি যাবে। ছেলেপুলে নিয়ে না খেতে পেয়ে মারা যেতে হবে হুজুর।
রাত অনেক হয়েছে, তোমরা শুয়ে পড়ো। এই বলে আমি হাঁটতে আরম্ভ করলাম।
কোথায় যাব আমি? আমি নিজেই তা জানি না। রাত্রের অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে কার্জন পার্কে এসে ঢুকলাম। সেখানেও অনেকে ঘুমিয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যেও শাজাহান হোটেলের আমার সহকর্মীরা আছে কিনা কে জানে। স্যর হরিরাম গোয়েঙ্কার পদতলে পাথরবাঁধানো লোভনীয় জায়গাটা কয়েকজন ভাগ্যবান অনেক আগেই দখল করে নিয়েছে। রেলিংয়ের পশ্চিমদিক থেকে রাস্তার আলো এসে স্যর হরিরাম গোয়েঙ্কার পা ধুইয়ে দিচ্ছে। সেই আলোর অত্যাচার থেকে রক্ষে পাবার জন্যে হরিরাম ধর্মশালার অতিথিরা বেশ সুন্দর বুদ্ধি খাটিয়েছে। চোখের উপর বড় বড় শালপাতা চাপিয়ে তারা একটা আবরণ সৃষ্টি করেছে। কর্পোরেশনের বিনা পয়সার বিতরিত আলো শালপাতার উপর এসে আটকে গিয়েছে। তার তলায় অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই যেন ঘুমিয়ে রয়েছে আমার ভারতবর্ষ।
০৯. ঘুরতে ঘুরতে যখন আবার হোটেলে
ঘুরতে ঘুরতে যখন আবার হোটেলে ফিরে এলাম, তখন রাত অনেক। আমার জন্যে অপেক্ষা করে করে ইংরিজি ক্যালেন্ডারের পুরনো তারিখটাও শেষ পর্যন্ত বিদায় নিয়েছে। কেন জানি না, জনহীন কলকাতার রাজপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, এতদিনে আমি সাবালক হয়ে উঠছি। এতদিন অনভিজ্ঞ বালকের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখেছি আমি; পরিপূর্ণ হইনি আমি। আজ রাত্রে আমি পরম পূর্ণতা লাভ করেছি। জ্ঞানবৃক্ষের ফল আস্বাদন করে এতদিনে যেন নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করছি আমি।
হোটেলে ঢোকার পথে দেখলাম, সত্যসুন্দরদা তখনও রিসেপশন কাউন্টার আলো করে বসে আছেন। শাজাহানের কাউন্টারে এখন কোনো লোক নেই। পৃথিবীর সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে, সত্যসুন্দরদা একা জেগে রয়েছেন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সত্যসুন্দরদা যেন কিসের ইঙ্গিত পেলেন। চোখ দুটো বোধহয় একটু লাল হয়েছিল। হাত দুটো চেপে ধরে সত্যসুন্দরদা বললেন, শরীর খারাপ হয়েছে নাকি? কোথায় গিয়েছিলে? রাত্রে কিছুই খাওনি। জুনো সায়েবকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বললে তোমাকে খেতে দেখেনি। শেষে বুড়োর কাছ থেকে গোটা কয়েক স্যান্ডউইচ আদায় করে, এই ড্রয়ারের মধ্যে রেখে দিয়েছি। এখন শাজাহানে কেউ আসবে না। সুতরাং নিয়ম মানবার দরকার নেই। এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইস্কুলের ছেলেদের মতো খেয়ে নাও। . সত্যসুন্দরদা যেন বুঝতে পারছেন আমার মধ্যে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। আমার মনের সুবোধ সুশীল ইস্কুলবয়টাকে তাড়িয়ে দিয়ে, একটা অপরিচিত ভয়াবহ পুরুষ সেখানে আসর জাঁকিয়ে বসেছে। কোনোরকমে বললাম, সত্যসুন্দরদা, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।
