প্রাত্যহিক সংবাদপত্রে আমাদের সে বিজ্ঞাপন হয়তো আপনারা অনেকেই দেখে থাকবেন।
সত্যসুন্দরদা অনেকগুলো ছবি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বললেন, ডিসপ্লের কাজ শেখো। তোমাকে তো একাই একশ হতে হবে।
ছবিগুলো সবই কনির। ঢোকবার পথে দুটো বোর্ডে কায়দা করে ছবিগুলো টাঙিয়ে দিয়েছিলাম-কনি ইজ কামিং।
আমার টাঙানো দেখে বোসদা খুব খুশি হলেন। বাঃ, চমৎকার হাত। যেন গতজন্মেও তুমি শাজাহান হোটেলে ক্যাবারে গার্লদের অর্ধ-উলঙ্গ ছবি ডিসপ্লে করতে।
প্রত্যুত্তরে হেসে বললাম, আমি পূর্বজন্মে বিশ্বাস করি না। আসলে ভালো গুরু পেলে ছাত্ররা খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারে।
বোসদা জিজ্ঞাপনটা আবার পড়লেন-কনি ইজ কামিং। তারপর বললেন, শমিং। কিন্তু কোথা থেকে কামিং জানো?
ওঁর মুখের দিকে তাকালাম। হেসে বোসদা বললেন, অনেকে ভাবে এই সব সুন্দরীরা একেবারে নীল আকাশ থেকে শাজাহানের নাচঘরে নেমে আসে। উনি এখন মধ্যপ্রাচ্য জয় করে পারস্যের এক হোটেলে শো দিচ্ছেন। ওখান থেকে সোজা চলে আসবেন আমাদের শাজাহানে।
বোসদার মন-মেজাজ তখন বেশ ভালো ছিল। ওঁর মুখেই শুনলাম, কনি অনেক টাকা নিচ্ছে। ক্যাবারে গার্লরা নিয়েই থাকে-তিনি বললেন। কত নিয়ে থাকে, তা শুনলে তোমাদের অনেক হোমরাচোমরা ব্যারিস্টার এবং এফ-আর-সি-এসধারী সার্জেন মাথায় হাত দিয়ে বসবেন। তাদের সব গর্ব, সব সাধনা, সব বিদ্যা ক্যাবারে সুন্দরীদের নৃত্যরত পদযুগলের ধাক্কায় উল্টে গিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাবে!
বাধা দিয়ে বললাম, তুলনাটা তো ঠিক নাচের হল না, ফুটবলের মতো শোনাচ্ছে!
ঠিকই বলেছ। বোসদা বললেন। নৃত্যপটীয়সীরা তো দামি দামি মাথা নিয়ে ফুটবলই খেলেন!
বোসদা আমাকে সাবধান করে দিলেন, অনেক সময় গেস্টরা কাউন্টারে এসে জিজ্ঞাসা করবে, মেয়েরা কত পায়? সব সময় বলবে, মাপ করবেন, জানি না। ক্যাবারের চিঠিপত্তর একেবারে কনফিডেন্সিয়াল।
ক্যাবারে গার্লদের নেপথ্য সমাচার বোসদার কাছেই শুনেছিলাম। ছমাস-আট মাস আগে থেকে এনগেজমেন্ট ঠিক হয়ে থাকে। প্যাবিসে এমন কোম্পানি আছে যাদের কাজ হল এইসব প্রোগ্রাম ঠিক করে দেওয়া। আমাদের হোটেলভাষায়—চেন প্রোগাম; যেমন উত্তরা-পূরবী-উজ্জ্বলাতে সারারণত একই ছবি এসে থাকে। ক্যাবারে গার্লরাও সেই ভাবে নেচে বেড়ায়। পৃথিবীর ম্যাপে ওরা যেন কয়েকটা শহরের উপর লাল ফেঁটা দিয়ে দেয়। হয় পশ্চিম দিক দিয়ে, কিংবা পূর্ব দিক দিয়ে যাত্রা শুরু করে। কোথাও তিন সপ্তাহ, কোথাও দুসপ্তাহের প্রোগ্রাম থাকে। এক শহরের প্রোগ্রাম শেষ হবার আগে থেকেই পরের শহরে ছবি চলে যায়। বিজ্ঞাপন ছাপা আরম্ভ হয়। এই ভাবে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর অন্য প্রান্ত দিয়ে তারা দেশে ফিরে আসে।
আজকাল পৃথিবীটা ছোট হয়ে গিয়েছে। একটা বিরাট ভূখণ্ড, যার নাম চিন, ক্যাবারে ম্যাপ থেকে সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে। ওখানেই আগে মাস পাঁচেক লেগে যেত। এখন ভরসা কেবল মাত্র হংকং। সেখানে আর কদিনই বা থাকা যায়? তাছাড়া ফ্রি পোর্ট। সব কিছুতেই প্রচুর স্বাধীনতা। তাই ওখানকার রাত্রের অতিথিরা অনেক বেশি আশা করেন। ফ্রি পোর্টের অতিথিদের সন্তুষ্ট করা, অনেক মেয়ের পক্ষেই বেশ শক্ত হয়ে ওঠে।
ক্যাবারে-বাজারের সবচেয়ে মূল্যবান পণ্যটির নাম যৌবন। ওই তরল পদার্থটির জোয়ার-ভাটা অনুযায়ী নর্তকীদের দাম ওঠা-নামা করে। তিন মাস অন্তর তাই ছবি তোলাতে হয়। ছবি যে খুব পুরনো নয়, তার সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হয় এবং সেই ছবি খুঁটিয়ে দেখে জহুরীরা দর ঠিক করেন। মার্কোপোলোই কতবার বলেছেন, বড় ট্রেচারাস লাইন। চার-পাঁচ বছর আগের পুরনো ছবি চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ আছে খুব। সেই জন্যে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটা নামকরা ছবির দোকান বেঁধে দিয়েছি। সেখান থেকে ছবি তুলিয়ে, পিছনে ছবি তোলার তারিখটা লিখিয়ে নিতে হয়। কলকাতার এক আধটা দোকানও শুনেছি এই লিস্টে আছে। এখান থেকে ছবি তুলে কুয়ালালামপুর, টোকিও, কিংবা ম্যানিলায় পাঠিয়ে দিতে হয়; এমন কি প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পারে সুদূর আমেরিকায় সে ছবি যায়।
বোসদা হেসে বলেছিলেন, হোটেলের রজনীগন্ধাদের দাম অনেক। তোমাকে দুএকটা লিস্টি দিচ্ছি। হাইড্রোজেন বোমা বলে যে জার্মান মেয়েটি এসেছিল, তার রেট প্রতি সপ্তাহে একহ আশি পাউন্ড। থাকা খাওয়া অবশ্যই ফ্রী। আর প্যাসেজ খরচা তো আছেই। তার পর ইজিপসিয়ান ফরিদা, মাখনবক্ষ (বাটার-ব্রেস্টেড) সুন্দরী বলে কাগজে বিজ্ঞাপন লেখা হয়েছিল। তার এবং তার বোন-এর জন্যে প্রতি মাসে তিন হাজার পাউন্ড অর্থাৎ কিনা প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা। লোলা দি টমাটো গার্ল, কিউবার মেয়ে। সে রোজ দশটা করে টমাটো সর্বাঙ্গে ঝুলিয়ে রাখত। একশ টাকা করে এক-একটা টমাটো বিক্রি করেছে। দাম দিয়ে দিলেই, নিজের পছন্দ মতো একটা টমাটো দেহ থেকে ছিড়ে নিতে পারো। সে তখন দাঁত দিয়ে টমাটো ফুটো করে, নিজে একটু রস চুষে নিয়ে তোমাকে দেবে। তুমি তারপর একটু চুষে তাকে আবার ফেরত নিতে পারো। সে নিত পাঁচশো ডলার প্রতি সপ্তাহে। কিন্তু মার্জরি, অত বড় গায়িকা, সে পেত মাত্র একশ ডলার সপ্তাহে। তার গান শোনবার জন্যে তেমন ভিড়ও হয়নি। মার্জরি নিগ্রো মেয়ে—এমন অপরূপ কণ্ঠ আমি কখনও
শুনিনি।
এই যে ক্যাবারে সুন্দরীদের এত টাকা দেওয়া হয়, এও বিরাট এক জুয়া। কলকাতার রসিক নাগরিকরা খুশি হয়ে প্রচুর মদ খেয়ে, বার বার এসে হোটেল জমজমাট রেখে, দাম তুলে দেবেন কিনা কে জানে। সপ্তাহে ছদিন তারা কলকাতার রাত্রিকে দিন করে রাখবে। শুধু ড্রাই-ডেতে, অর্থাৎ যেদিন মদ বিক্রি হয় না, সেদিন কোনো শো নেই। সেদিন শুকনো গেলাস নিয়ে কে আর নাচ দেখতে কিংবা গান শুনতে চাইবে? তার পরিবর্তে রবিবারের লাঞ্চের দিন দুপুরে স্পেশাল প্রোগ্রাম। সে প্রোগ্রাম অবশ্য অনেক সংযত। অনেক ভদ্র।
