আজও আমি অবিশ্বাসী নই; আজও আমি মানুষের মহত্ত্বে আস্থাশীল। তবুও কোনো অলস অবসরে যখন সেই রাত্রের কথা স্মৃতির পটে ভেসে ওঠে, তখন নিজের চোখদুটো ছাড়া আর কোনো কিছুকেই বিশ্বাস করতে সাহস হয় না। মনে পড়ে যায়, করবী দেবী সম্মানিত অতিথিকে হোটেলের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিলেন। যাবার পথে তিনি একবার আমাদের দিকে তাকিয়েছিলেন–সে দৃষ্টিতে কেতাদুরস্ত এক হোস্টেসের ছবিই দেখেছিলাম। কিন্তু ওঁকে বিদায় দিয়ে, একলা ফিরে আসবার পথে করবী গুহ আর একবার থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। কেন যে তিনি আমার দিকে অমন ভাবে তাকিয়েছিলেন, তা আজও আমি ভেবে পাই না। সেদিন আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় সব কিছু বোঝবার মতো বুদ্ধি ছিল না—কিন্তু করবী দেবীর কাজলকালো চোখে যেন যুগযুগান্তের পুঞ্জীভূত ক্লান্তি আবিষ্কার করেছিলাম। আমি কিছুই তেমন বুঝিনি; কিন্তু করবী দেবীর অভিমানিনী চোখ দুটো যেন ভেবেছিল আমি সব বুঝে নিয়েছি; আমার নীরবতাই যেন করবী দেবীর অত্যাচারিত দেহকে প্রকাশ্যে অপমানিত করেছিল।
সন্ধ্যার সেই সদ্যপ্রস্ফুটিত লাবণ্য তার দেহ থেকে কখন বিদায় নিয়েছে। সেই অবস্থায় আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে করবী দেবী প্রশ্ন করছিলেন, আর কতক্ষণ?
আমি যেন তাঁর মধ্যে আমার পরম আপন-জনকে আবিষ্কার করে বলেছিলাম, অনেকক্ষণ। আজ রাত্রে আমাকে জেগে থাকতে হবে।
বেচারা! অস্ফুট স্বরে করবী দেবী উচ্চারণ করেছিলেন। তারপর যেন টলতে টলতে নিজের ঘরের দিকে চলে গিয়েছিলেন।
সেই রাত্রির কথা মানসপটে ভেসে উঠলে আজও আমি লজ্জিত হই। অভিজ্ঞ বুদ্ধিমান পাঠক, সেদিনের শাজাহান হোটেলের এক অপরিণতবুদ্ধি কর্মচারীকে ক্ষমা করুন। সেই রাত্রে মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আমি বেচারা নই। আমি পরম ভাগ্যবান। বিধাতার আশীর্বাদে মানুষের এই সংসারে আমি আমি হয়েই জন্মেছি—করবী গুহ হইনি। আর যা মনে হয়েছিল, তা ভাবতে আজও আমি লজ্জিত হই। কিন্তু লিখতে বসে আজ যে লজ্জার সুযোগ নেই। সেদিন মনে হয়েছিল, বিধাতার সৃষ্টি-পরিকল্পনায় পুরুষকে তিনি অনেক ভাগ্যবান করে সৃষ্টি করেছেন। নারীর স্রষ্টা যে-বিধাতা, তিনি আর যাই হোন, সমদর্শী নন।
এই একই কথা আর একবার আমার মনে হয়েছিল। সেদিন করবী গুহকে শ্ৰীমতী পাকড়াশী বলেছিলেন, হে ঈশ্বর, এমন মেয়েমানুষও তুমি সৃষ্টি করেছিলে!
কিন্তু মাধব পাকড়াশীর ইউরোপীয় অতিথিদের শাজাহান হোটেলের দু-নম্বর সুইটে আতিথ্য গ্রহণ করতে এখনও দেরি রয়েছে। তারা এসে হাজির হোন, তারপর যা হয় হবে।
তাঁরা আসবার আগেই যিনি হোটেলে এসেছিলেন, যার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, তার নাম কনি। কনিকে না দেখলে, শাজাহান হোটেলকেই আমার জানা হত না। অন্তত, কনিকে বিয়োগ দিলে আমার শাজাহান হোটেলের অঙ্কে বিশেষ কিছুই থাকে না। আজও যখন কোনো অপরিচিতার সংস্পর্শে আসি, আজও যখন কাউকে বিচার করবার প্রয়োজন হয়, তখন আমি কনিকে মনে করবার চেষ্টা করি। কনিকে আজ আর রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না—সে যেন এক দীর্ঘস্থায়ী রঙিন স্বপ্ন। কিংবা কে জানে, তাকে হয়তো অন্য কোনোভাবে বর্ণনা করা উচিত ছিল। নগর-সভ্যতার অন্ধকার জনারণ্যে সে যেন আমার অভিজ্ঞতা-ক্যামেরায় ফ্ল্যাশ বাবের কাজ করেছিল—তার মুহূর্তের ঝলকানিতেই সমাজের প্রকৃত রূপকে আমি মনের ফিল্মে ধরে রাখতে পেরেছিলাম।
কনি যে কে, আমি জানতাম না। তার নামও কোনোদিন আমি শুনিনি। মার্কোপোলাই ওর একটা ফটোগ্রাফ নিয়ে একদিন আমার কাউন্টারে এসেছিলেন। রোজি তখন আমার পাশে বসে নেল-কাটার দিয়ে নখ কাটছিল। কাটতে কাটতে বলছিল, একটুও ধার নেই।
আমি বলেছিলাম, ব্লেড় দিয়ে নখ কাটলেই পারো।
রোজি জিভ কেটে বলেছিল, কোথাকার ইয়ংম্যান তুমি? একজন ইয়ং লেডি তোমাকে বলছে, তার নেল-কাটারটা ভোতা হয়ে গিয়েছে, কোথায় তুমি টুক করে কোনো স্টেশনারি দোকানে গিয়ে একটা নতুন কাটার কিনে এনে তার হাতে দিয়ে দেবে, তা নয়, বলে দিলে ব্লেডে কাটো।
মাই ডিয়ার গার্ল, এই ইয়ংম্যান তোমাকে ভালো অ্যাড়ভাইস দিয়েছে। ব্লেড় দিয়ে কাটলে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। মার্কোপোলার গলার স্বরে আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, উনি যে কখন ওখানে এসে পড়েছেন বুঝতে পারিনি। মার্কোপোলো মৃদু হাসতে হাসতে বললেন, রোজি, এয়ারওয়েজের চিঠিটা আমি এখনই চাই। ওরা কলকাতা থেকে যে নতুন সার্ভিস ইনট্রোডিউস করবে, তাতে ঘরের সংখ্যা আরও বেশি লাগবে। ডেলি রিজার্ভেশন! চিঠিটা আপিসে রয়েছে, তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো তো।
রোজি তড়াং করে লাফিয়ে উঠে কাউন্টার থেকে বেরিয়ে পড়ল। মার্কোপোলো তখন হেসে বললেন, এবার কাজের কথায় আসা যাক। স্ট্রিক্টলি স্পিকিং, এটা তোমার কাজ নয়—রোজির কাজ। কিন্তু জিমির কাছে শুনেছি, ও মেয়েদের একদম বরদাস্ত করতে পারে না। শাজাহান হোটেলে অন্য কোনো মেয়ে আসবে শুনলে ওর গা জ্বলতে আরম্ভ করে।
মার্কোপোলো আমার হাতে একটি ফটোগ্রাফ দিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, এই সব ছবি ইয়ংম্যানদেরও দেখা উচিত নয়। তবে হোটেলে যখন চাকরি করো তখন আলাদা কথা। আদর্শ হোটেল ওয়ার্কারের জেন্ডার ম্যাসকুলাইনও নয়, ফেমিনিনও নয়। সে হল নিউটার!
মার্কোর মুখেই শুনলাম, ছবিতে যাঁকে দেখা যাচ্ছে তিনি নীল-নয়না সুন্দরী। তাঁর মাথার চুল নাকি প্ল্যাটিনামের মতো। মার্কোপোলো বললেন, কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসোকনি দি উয়োম্যান ইজ কামিং।
