কনির বিজ্ঞাপন বেরোবার পর থেকেই রসিকমহলে সত্যি বেশ সাড়া পড়ে গিয়েছিল। বোসদা বলেছিলেন, বিজ্ঞাপনের ভাষাটা এর জন্যে অনেকটা দায়ী। নারীর সৌন্দর্য বর্ণনার জন্যে অভিধানে যত ভাষা ছিল, তা সিনেমা-ওয়ালা এবং আমরা খতম করে দিয়েছি। যতরকম উত্তেজক শব্দই ব্যবহার করো না কেন, আর তেমন উত্তেজনা সৃষ্টি হয় না। পোলাও, মুরগির দোপিঁয়াজা বিরিয়ানি ইত্যাদির মধ্যে কিছুদিন ড়ুবে থাকবার পর যা ভালো লাগে তা হল শুক্তো আর মাগুর মাছের ঝোল। তাই বিজ্ঞাপনে সোজা ভাষায় লিখে দিয়েছিলাম, কনি দি উয়োম্যান, মেয়েমানুষ কনি, কলকাতায় আসছে।
বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হবার পরেই টেলিফোনে অনেক অনুসন্ধান এসেছিল। কলকাতায় যাঁদের বাবাদের অনেক টাকা আছে, যে-সব কনট্রাক্টরদের অনেক কাজের প্রয়োজন আছে, যে-সব সেলস অফিসাররা পারচেজ অফিসারদের খুশি করতে চান, তাঁদের অনেকেই ফোন করেছেন। সেই সব ফোনের অনেক কলই আমাকে ধরতে হয়েছে।
হ্যালো, শাজাহান হোটেল?
গুড আফটারনুন, শাজাহান রিসেপশন কথা বলছি।
কনি দি উয়োম্যান সম্বন্ধে কিছু বলতে পারবেন? উনি এই শনিবারেই শো আরম্ভ করছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
প্রথম দিনেই একটা টেবিল বুক করতে চাই।
স্যরি। প্রথম দিনে সব বোঝাই। মাত্র সাড়ে তিন শো সিট, বুঝতেই পারছেন।
হ্যালো, শাজাহান হোটেল? কনি দি উয়োম্যান। অ্যাডমিশন ফি কত?
অ্যাডমিশন ফি সেই পাঁচ টাকাই রাখা হয়েছে। আর ডিনার সাত টাকা আট আনা।
ড্রেস?
হ্যাঁ, ড্রেসের রেসট্রিকশন আছে। ইভনিং অথবা ন্যাশনাল।
ফোকলা চ্যাটার্জিও ফোন করেছেন। হ্যালো, বোস নাকি? আমি ফোকলা চ্যাটার্জি কথা বলছি।
মিস্টার বোস এখন নেই, স্যর। আমি শংকর কথা বলছি।
শোনো, ওপনিং ডেটে আমার তিনখানা টিকিট চাই। মিস্টার রঙ্গনাথনের নামে।
একটাও টিকিট নেই স্যর। সব বিক্রি হয়ে গেছে।
বলো কী হে? নিশ্চয় ব্ল্যাক হচ্ছে?
বললাম, না স্যর, আমরা পাঁচখানার বেশি কাউকে দিই নি।
ফোকলা চ্যাটার্জি ছাড়নেওয়ালা নন। বললেন, বাই হুক অর কুক, আমার টিকিট চাই-ই। রঙ্গনাথন তার পরের দিনই চলে যাবেন। তোমার টেবিল কারা কারা বুক করেছে, নাম বলো দেখি। তোমরা বেঙ্গলি বয়, তোমাদের কাছে সব সময় আমরা ফেসিলিটি আশা করি। এই ক্যালকাটার সব আমোদই নন-বেঙ্গলিরা এনজয় করবে, এটা কি ভালো? ফোকলা চ্যাটার্জি কাতর আবেদন করলেন।
বললাম, আমার হাতে কিছুই নেই, স্যর। আমি নাম পড়ে যাচ্ছি। মিস্টার খৈতান, মিস্টার বাজোরিয়া, মিস্টার লাল, মিস্টার ম্যাকফারলেন, সাহা, সেন, চ্যাটার্জি, লোকনাথন, যোশেফ, ল্যাং চ্যাং সেন। আরও অনেক আছেন, সিং, শর্মা, আলী, বাসু, উপাধ্যায়, জাজোদিয়া, মতিরাম, হীরারাম, চুনিরাম, ছাতাওয়ালা, হুইস্কিওয়ালা।
ফোকলা রেগে উঠে বললেন, সব শালা ফোটে ফুর্তি করছে। আর আমরা জেনুইন পার্টি টিকিট পাচ্ছি না।
মানে? আপনি কী বলছেন, স্যর?
সব শালা এক্সপেন্স অ্যাকাউন্টওয়ালা। মেয়েমানুষের ফুর্তির বিলও কোম্পানিরা কাছে সাবমিট করবে। অথচ আমরা নিজের পয়সায় যেতে চাই, তবু জায়গা যাচ্ছি না। গবরমেন্ট আজকাল নাকডেকে ঘুমোচ্ছে। আচ্ছা দেখ লে আগরওয়ালার নাম আছে কিনা।
বললাম, আছে স্যর, পাঁচখানা করে দুটো টেবিল আছে।
যাক বাঁচালে ভায়া, ওঁকেই বলি একটা টেবিল ছেড়ে দিতে। ব্যাটারঙ্গনাথন, তেঁতুল। বাঙ্গালোরে তেঁতুল গোলা খায়, আর বুড়ি বউ-এর আঁটা হজম করে। বেচারা বিজনেসের কাজে কয়েকদিনের জন্যে এখানে এসেছে। একটু মনটাকে তাতিয়ে নেবার ইচ্ছে। অথচ একেবারে নিউম্যান।ক্যালকাটার কিছুই জানে না। তার উপর ভীতু মানুষ। প্রাণের ভয়, মানের ভয়, রোগের ভয়। যেখানে সেখানে যেতে সাহস পায় না। তাই আমি গাইডের কাজ করছি।
ফোনটা নামিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মিস্টার চ্যাটার্জি এবার এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যা আমি কখনও শুনিনি। বললেন, হ্যাঁ মশাই, মোস্ট ইম্পর্টান্ট পয়েন্টটাই ভুলে যাচ্ছিলাম। স্ট্যাটিসটিকসটা বিজ্ঞাপনে দেননি কেন?
আজ্ঞে স্ট্যাটিসটিকস?
আচ্ছা, আপনি বোসকে জিজ্ঞাসা করে রাখবেন, আমি পরে জেনে নেব। ফোকলা চ্যাটার্জি এবার ফোনটা ছেড়ে দিলেন।
স্ট্যাটিসটিকস শব্দের অর্থ বোসদার কাছে শুনেছিলাম। বোসদা বলেছিলেন, ছিঃ, তুমি না হাইকোর্টে কাজ করেছ। সভ্যতার মাপকাঠি জানো না? আজকের সভ্যতায় পুরুষকে মাপা হয় ব্যাংকের ফিগার দিয়ে, আর মেয়েদের মাপা হয় দেহের ফিগার দিয়ে। ৩৬-২২-৩৪, ৩৪-২০-৩৪-এতেই আমাদের পৃষ্ঠপোষকেরা সব বুঝে নেন।
কনির স্ট্যাটিসটিকস তখন আমাদের জানা ছিল না। মার্কোপোলো বলেছিলেন, ছমাসের পুরনো স্ট্যাটিসটিকস আমার কাছে আছে। কিন্তু তা দেওয়া যায় না।
ফোকলা চ্যাটার্জি আবার ফোন করেছিলেন। বোসদা টেলিফোন ধরে বলেছিলেন, হা স্যর, লেটেস্ট স্ট্যাটিসটিকসের জন্যে আমরা রিপ্লাই-পেড় টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছি, এখনও উত্তর আসেনি। বোসদা আরও বলেছিলেন, এবার খুবই সুন্দর জিনিস হবে। শুধু নাচ নয় স্যর, সঙ্গে অন্য জিনিসও আছে।
কী জিনিস মশাই? একটু হিন্ট দিন না। রঙ্গনাথনকে গরম করে রাখি। পুওর ফেললা—ওঁর বউ ভদ্রলোককে ডেলি বঁটা মারে!
বোসদা বললেন, স্যরি, এখন বলবার হুকুম নেই। ওখানেই বুঝতে পারবেন।
রাত আটটা থেকে শাজাহান হোটেলের সামনে গাড়িতে গাড়িতে জম-জমাট। যেন কোনো বিশাল জালে দেশের সব সুন্দর গাড়িগুলোকে মাছের মতো টানতে টানতে কেউ শাজাহান হোটেলের সামনে এনে জড়ো করেছে। গাড়ি আসছে, গেটের সামনে মুহুর্তের জন্য থামছে, দারোয়ানজি দরজাটা খুলে স্যালুট দিয়ে সরে দাঁড়াচ্ছে। সায়েব নেমে পড়ছেন।
