ফোকলা চ্যাটার্জিকে বার-এ বসিয়ে আবার যখন ফিরে এলাম, তখন সভাপতি পৃথিবীর সব মানুষকে ভালোবেসে, উপস্থিত ভদ্রমহোদয় এবং মহোদয়াগণ যে মহান আদর্শ স্থাপন করলেন, তার জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছেন। প্রেম, প্রীতি ও ত্যাগ তিতিক্ষার এই পথেই যে দেশের মানুষরা সার্থকতার দিকে এগিয়ে যাবেন সে-সম্বন্ধে তার কোনো সন্দেহ রইল না।
এবার ডিনার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আইনত সাপারও বলা যেতে পারে। চালের কোনো সংস্রব না থাকায়, আড়াই টাকা করে চার্জ বেশি নেওয়া হয়েছে। সাড়ে তিনশ লোকের মধ্যে তিরিশটা বেয়ারা এবং আমাদের পাঁচজন ছোকরা ঘুরে ঘুরে হিমশিম খেয়ে যাবার অবস্থা।
সভাপতি তার মধ্যেই চিৎকার করে আমাকে বলেছিলেন, কী হে ছোকরা, এতগুলো লোক তোমরা, অথচ এই কটা গেস্টকে তাড়াতাড়ি সার্ভ করতে পারছ না?
আমি চুপ করে দাড়িয়ে ছিলাম। সভাপতি বললেন, ইন-ইন্ডিয়া চারটে পাঁচটা ছোকরা চার পাঁচশ লোককে খাইয়ে দেয়।
মুরগির উপর অস্ত্রোপচার করতে করতে মাধব পাকড়াশী গম্ভীরভাবে বললেন, এর নাম ইংলিশ-সার্ভিস।
তাহলে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, অনেক বিষয়ে ওয়েস্ট ক্রমশ আমাদের পিছনে পড়ে থাকছে।
নগেন পাল বললেন, আপনি স্যর একটা বই লিখুন—ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অফ দি ওয়েস্ট।
লিখলেই হয়। জওহরলালের ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া যারা পাবলিশ করেছে তারা বহুবার আমাকে রিকোয়েস্ট করেছে।
সভাপতির ছবি আমি অনেকবার কাগজে দেখেছি। ওঁর বক্তৃতা শ্রদ্ধার সঙ্গে বহুবার পড়েছি। তাই ওঁর বকুনিকে আমার বকুনি বলেই মনে হল না। শ্রদ্ধেয় সভাপতি প্রথমে বলেছিলেন তিনি ভেজিটারিয়ান কিন্তু ডিম খাবেন। হঠাৎ মুরগির ঘ্রাণে বোধহয় তার মত পরিবর্তন হল। পাকড়াশীকে প্রশ্ন করলেন, মাংসটা নরম?
বেশ নরম। ক্যালকাটার মাংসের তুলনা নেই। এত জায়গায় তো যাই, কিন্তু এত নরম, এত সুস্বাদু কোথাও নেই! পাকড়াশী মৃদু হেসে বললেন।
সভাপতি বললেন, ওহে ছোকরা, যাও তো, একটু চিকেন নিয়ে এসো তো আমার জন্যে।
একটা ট্রে নিয়ে ওঁর সামনে ধরলাম। কোনোরকম কথাবার্তা না বলে সমস্ত ট্রেটাই নিজের প্লেটে ঢেলে নিলেন তিনি। কাঁটা চামচ ফেলে দিয়ে সভাপতি ভারতীয় প্রথায় ডান হাত দিয়ে ধরে মাংসের হাড় মড় মড় করে চিবোতে লাগলেন। সেই হাড়ভাঙা শব্দে, তার পাশের বিদেশি কনসালদের কয়েকজন অবাক হয়ে ঘাড় ফেরালেন। নাকের সিকনিটা বাঁ হাতের রুমালে মুছতে মুছতে তিনি বললেন, গতবারে ফরেন ট্যুরে গিয়ে আমি এইটে আরম্ভ করি। ওদের তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছিলুম। বম্বের ওই আধামেমসায়েব রাইটার মিস পোস্তওয়ালা আমার পাশে বসে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমি খাঁটি ভারতীয়, আমি কেন শুনতে যাব? আমি চেটেপুটে ঝোল পর্যন্ত খেয়েছিলাম।
ওদিকে তখন আইসক্রিম দেওয়া আরম্ভ হয়েছে। একসঙ্গে দুটো আইসক্রিম টেবিলের উপর তুলে নিয়ে, সভাপতি বললেন, এগুলো হজমিকারক। এসব পরে খাচ্ছি। তুমি ছোকরা চটপট আর একটু চিকেন নিয়ে এসে দেখি। ঠ্যাং আনবার চেষ্টা করবে, হাড় যেন কম থাকে।
পিছনে ফিরে চিকেনের খোঁজে যেতে যেতে শুনলাম, জাতীয়তাবাদী সভাপতি নগেন পালকে বলছেন, এটা বিদেশি কনসার্ন। এখানে কোনো মায়াদয়া করবেন না। ব্যাটারা গলায় গামছা দিয়ে দাম নেবে, লাভ করবে। লাভ বিদেশে পাঠাবে, আমাদের ফরেন একচেঞ্জ চলে যাবে। যতটা পারি উসুল করে নিই। কোনো ভয় নেই, আমার কাছে সব ব্যবস্থা আছে। জোয়ানের আরক পাবেন, সোডামিন্ট ট্যাবলেট পাবেন, কিচ্ছু ভয় নেই।
চিকেনের আর একটা প্লেট যখন ওঁর দিকে এগিয়ে দিলাম, তখন তিনি করুণ সুরে বললেন, চাট্টি ভাত না-হলে এসব জিনিস জমে না। কিন্তু কী করা যাবে, ইন্ডিয়ার জন্যে, ওয়ার্লডের জন্যে এটুকু স্যাক্রিফাইস আমাদের করতেই হবে।
একটা ঢেকুর তুলে আগরওয়ালা বললেন, তোবে যাই বলুন স্যর, আপনার স্পিচটা বহুত বড়িয়া হয়েছে।
সভাপতি তখন সশব্দে আরও বিকট একটা ঢেকুর তুলে বললেন, তা বটে। কিন্তু তার থেকে ঢের ভালো হয়েছে আজকের ডিনারের মেনু! বেটারা গলায় গামছা দিয়ে দাম নেয় বটে, কিন্তু জিনিস ভালো দেয়। ফরেন ফার্মগুলো ইন্ডিয়াতে এইজন্যেই এত এগিয়ে যাচ্ছে। . করবী দেবী ইতিমধ্যে কাজ শেষ করে ফেলেছেন। মাধব পাকড়াশীর
অতিথিদের জন্য আগরওয়ালার অতিথি সদনে পাকা ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু উনি ফিরে যেতে পারেননি। আগরওয়ালার অনুরোধে ডিনারে বসে গিয়েছিলেন। করবী দেবীর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। গোমেজের দল তখন বাজনা শুরু করে দিয়েছে। এই বাজনার একটা সুবিধে, একটা টেবিলের কথা আর একটা টেবিলে পৌছয় না। সবাই প্রাইভেসিতে নিরাপদ বোধ করেন। করবী দেবী চেয়ার থেকে উঠে পড়ে হ-এর দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসলেন। তারপর আমার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, আপনাদের সভাপতির ভড়ং দেখলে বাঁচিনে। সুইটটা ওঁর থাকবার জন্যে ঠিক করে রাখা হয়েছিল। আমার ছবি দেখতে চেয়েছিলেন। বললেন, ওখানে ওঠা তো ভালো দেখায় না। যেখানে প্রত্যেক বার উঠি, সেখানেই উঠব। তবে রাত্রে কয়েক ঘন্টা আপনাদের হোস্টেসের ঘরে বিশ্রাম করে নিতে আপত্তি নেই।
করবী দেবী এবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন। এবং আমি কিছু বোঝবার আগেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, যাই। সম্মানিত অতিথিকে স্বাগত জানাবার ব্যবস্থা করিগে যাই!
০৮. সম্মানিত অতিথিকে স্বাগত
সম্মানিত অতিথিকে স্বাগত জানাবার অর্থ কী, সেদিন করবী দেবীর বিষণ্ণ অথচ কর্তব্যপরায়ণ মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে আমার কষ্ট হয়নি। আমারই চোখের সামনে ব্যাংকোয়েটে নিমন্ত্রিত কলকাতার সম্মানিত অতিথিরা একে একে বিদায় নিয়েছিলেন। ঘোমটার আড়ালে মিসেস পাকড়াশী স্বামীর সঙ্গে মানবতার আলোচনা করতে করতে অপেক্ষমান গাড়িতে উঠে বসেছিলেন। মিস্টার আগরওয়ালা এবং তার ইংরেজ সঙ্গীও কালবিলম্ব করেননি। শুধু যিনি রয়ে গিয়েছিলেন তিনি মাননীয় সভাপতি। কর্তব্যে ক্লান্ত শরীরটাকে দু-নম্বর সুইটের শান্ত শীতল আশ্রয়ে একটু পুনরুজ্জীবিত করার জন্যই তিনি থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে থাকাও কিছু বেশিক্ষণের জন্যে নয়। ক্যালেন্ডারের দিন পরিবর্তনের আগেই তিনি দ্রুতবেগে হোটেল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। রিসেপশন কাউন্টার থেকে তার দ্রুত নিষ্ক্রমণের যে দৃশ্য সেদিন দেখেছিলাম, তা আজও ছবি হয়ে আমার স্মৃতির অ্যালবামে সাজানো রয়েছে। প্রভাতের সংবাদপত্রে তার যে ফটো প্রকাশিত হয়েছিল, তার সঙ্গে এই ছবির সামান্যতম সাদৃশ্য খুঁজে না পেয়ে আমি মুহুর্তের জন্যে চমকে উঠেছিলাম। মনের মধ্যে সন্দেহ হয়েছিল, কে জানে, এই এমনি করেই সংবাদের জন্ম হয় কিনা, এই এমনি করেই অনেক স্মরণীয়দের বরণীয় নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয় কিনা।
