করবী দেবী তখনও দরজার গোড়ায় আমার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমাকে বললেন, বেশ বিপদে ফেললেন। এমনভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি বলুন তো?
আমি বললাম, বক্তৃতা শেষ হলেই মিস্টার আগরওয়ালার কাছে চলে যেতে পারবেন। করবী দেবী মুখ ভেঙচিয়ে বললেন, এ বক্তৃতা কি আর এখন শেষ হবে!
আমি বললাম, এটা তো আর মনুমেন্টের তলা নয়। হোটেলের ব্যাংকোয়েট হল, বক্তৃতা এখনই শেষ হয়ে যাবে।
সভাপতি বললেন, স্বল্প সম্পদ সবার প্রয়োজনমতো বিতরণ করার মধ্যেই রয়েছে মানব-সভ্যতার সাফল্যের চাবিকাঠি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের লোকদের এবং আমাদের নিজের দেশের ভাইবোনদের—যে দেশে বুদ্ধ, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী জন্মেছেন—আত্মত্যাগ করতে হবে। মানবসেবা সমিতির কোনো ভোজসভায় আমরা চাল ব্যবহার করব না। তাছাড়া আরও কুড়িজন সদস্য আগামী কয়েক বছর বাড়িতেও চাল খাবেন না বলে ঘোযণা করেছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন মিস্টার এ আগরওয়ালা, মিস্টার… সভাপতি নাম পড়ে যেতে লাগলেন। করবী দেবী আবার ফিক করে হেসে ফেললেন, দূর মশাই, আপনি কোথায় নিয়ে এলেন? এখানে সবারই কি ডায়াবিটিস?
মানে? আমি ফিসফিস করে প্রশ্ন করলাম।
আগরওয়ালা ভাত খাবেন কী? ওঁর তো ডায়াবিটিস। আমার ঘরেও তো সিরিঞ্জ আর ইনসুলিন ইঞ্জেকশন আছে। যেদিন এখানে রাত্রের জন্য একটু বিশ্রাম করতে আসেন, সেদিন নিজেই একমাত্রা নিয়ে নেন।
মেনুকার্ডগুলো প্রত্যেকটা টেবিলেই দুখানা করে দেওয়া আছে। সবাই একমনে সেটা দেখছিলেন। একজন বেশ টাইট গুণ্ডাধরনের বেঁটে ও মোটা ভদ্রলোক টেবিলে জনাতিনেক বন্ধু নিয়ে বসেছিলেন। ভদ্রলোক আমাকে ডাকলেন। আমি মাপা স্টেপে ওঁর সামনে এসে মাথা নিচু করে অভিবাদন করলাম। ডান হাতের মেমোবই ও মেনুকার্ডটা বাঁ হাতে চালান করে দিয়ে, ফিসফিস করে বললাম, ইয়েস স্যর।
ভদ্রলোক বললেন, এ কি নিরামিষ ডিনার নাকি?
বললাম, না, স্যার। আমিষ আইটেমও অনেক রয়েছে।
আঃ, তা বলছি না, ভদ্রলোক বিরক্ত কণ্ঠে বললেন। বলছি, দেশে–হয় চালের অভাব রয়েছে। তাতে না-হয় ধেনোটা খাওয়া উচিত হবে। কিন্তু অন্য মালের ব্যবস্থা হয়েছে কি?
আমি আমতা আমতা করতে লাগলাম। বোসদা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে কোথা থেকে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, এক্সকিউজ মি স্যর, আমি মিস্টার ল্যাংফোর্ড অথবা মিস্টার আগরওয়ালাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
একটা ঠ্যাং অন্য পায়ের উপর তুলতে তুলতে ভদ্রলোক বললেন, ল্যাংফোর্ডে আর কাম নেই, ওই আগরওয়ালাকেই পাঠিয়ে দিন।
এক কোণ দিয়ে মিস্টার আগরওয়ালার দিকে যেতে যেতে বোসদা বললেন, ডেঞ্জারাস লোক, ফোকলা চ্যাটার্জি। আসল নাম আর এন চ্যাটার্জি, নামকরা বক্সার ছিল। তখন ঘুষি মেরে কে ওঁর সামনের দুটো দাঁত ভেঙে দিয়েছিল। পাঁড়মাতাল। চোখগুলো সবসময় লাল জবা ফুলের মতো হয়ে আছে। ছোট করে ছাঁটা মাথার চুলগুলো বুরুশের মতো খাড়া হয়ে থাকে।
কলকাতার সব পার্টি আর ককটেলে ওঁর নেমন্তন্ন হয়। অন্তত চ্যাটার্জি নাকি খুব লাকি বয়। উনি এলে পার্টি জমতে বাধ্য। অন্তত অনেকের তাই বিশ্বাস। শুধু সিনেমার পার্টিতে এখন আর কেউ ওঁকে ডাকে না। অভিনেত্রী শ্রীলেখা দেবীর শাড়িতে সেবার এইখানেই উনি বমি করে দিয়েছিলেন। শ্রীলেখা দেবী সেই থেকে বলেছেন, ফোকলা চ্যাটার্জি যে পার্টিতে আসবে, সেখানে তিনি আর যাবেন না।
বোসদাকে আসতে দেখেই আগরওয়ালা উঠে পড়েছিলেন। ফিসফিস করে বোসদা বললেন, মিঃ চ্যাটার্জি ডাকছেন।
ও মাই লর্ড! বলে আগরওয়ালা ফোকলার টেবিলের দিকে চললেন।
ফোকলা চ্যাটার্জি বললেন, আগরওয়ালা, এ কেমন ধরনের রসিকতা? মানবসেবা করা হবে; অথচ এতগুলো কেষ্টর জীবনে কষ্ট দিচ্ছ। মেনুতে কোনো মালের নাম নেই।
সভাপতি তখন বক্তৃতা করে যাচ্ছেন। আগরওয়ালা বেশ বিপদে পড়ে গিয়েছে। ফোকলা চ্যাটার্জি আগরওয়ালার হাত চেপে ধরে বললেন, পালাচ্ছ কোথায়? এখনি আমি সীন ক্রিয়েট করতে পারি জানো? আমি সভাপতি-টতি কাউকে কেয়ার করি না। কথায় বলে, ফোকলার নেই ডেন্টিস্টের ভয়।
আগরওয়ালা বললেন, মাই ডিয়ার ফেলল, আমাদেরও ককটেল দেবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সভাপতি রাজি নন। উনি সোজা বলে দিয়েছেন, অ্যালকহলিক বীভারেজ সার্ভ করা হলে উনি বক্তৃতা করতে পারবেন না।
অশ্লীল গালাগাল দিয়ে ফোকলা বললেন, ব্যাটাছেলে কি ভাটপাড়ার বিধবা পিসিমা! ওঁর অমন গুড়ের নাগরির মতো চেহারা মাল না-টেনেই হয়েছে বলতে চাও?
আগরওয়ালা ফোকলাকে সামলাবার জন্য বললেন, পাবলিকলি ওঁদের পক্ষে ড্রিঙ্ক করা!
ফোকলা এবার উঠে পড়ে বললেন, তাই বলো। বেশ, প্রাইভেটলিই আমি ড্রিঙ্ক করব। আমি মমতাজ-এ চলে যাচ্ছি।
বোসদা বললেন, বার দশটা পর্যন্ত ভোলা আছে। ওখানে সবরকম ড্রিঙ্কস পাওয়া যাবে।
গোটাপঞ্চাশেক টাকা এখন ছাড়ো দেখি। মানিব্যাগ আনতে ভুলে গিয়েছি। আর না-হয় বলে দাও, আমার মালের টাকাটা তোমাদের এই বিলের সঙ্গে যেন ধরে নেয়।
আগরওয়ালা বললেন, বেশ তাই হবে। ফোকলা চ্যাটার্জি চেয়ার থেকে উঠে পড়ে বার-এর দিকে চললেন। যেতে যেতে বললেন, শ্লা, দু-দুটো ককটেল-এ নেমন্তন্ন ছিল। নিরিমিষ জানলে কোন ব্যাটাচ্ছেলে এই হরিসভার কেত্তন শুনতে আসত।
বোসদা আমাকে বললেন, বার-এ বলে দিয়ে এসো, ওঁর কাছে যেন। টাকা না চায়।
