পাকড়াশী কেবল ফ্রেশ অক্সিজেনের আশায় কাউন্টারে এসে দাঁড়াননি। আরও দরকার ছিল। এবার সেই প্রসঙ্গে এলেন, হ্যাঁ যা বলছিলাম, জার্মানি থেকে দুজন ভদ্রলোক বোধহয় সামনের সপ্তাহে কলকাতায় আসবেন। ওঁদের জন্য দুটো সুইট চাই। বেস্ট রুম। ক্লাবে রাখতে পারতাম, কিন্তু ওখানে বড্ড জানাজানি হয়ে যায়। ওঁরা যে কারণে আসছেন, সেটা আমি এখন কাউকে জানতে দিতে চাই না।
বোসদা আমাকে বললেন, রেজিস্টার খোললা।
রেজিস্টার খুললাম। সুইট নেই। সব অ্যাডভান্স বুকিং হয়ে রয়েছে। বললাম, মুশকিল হয়ে গিয়েছে। ফরেন কালচারাল মিশন আসছে, তারা দু-মাস আগে থেকে সুইটগুলো নিয়ে নিয়েছে।
তাহলে উপায়? মিস্টার পাকড়াশী জিজ্ঞাসা করলেন।
কী হয়েছে? কী হয়েছে? মিস্টার আগরওয়ালা হঠাৎ সেখানে এসে দাঁড়ালেন।
দুটো সুইট চাইছিলাম। কিন্তু ক্যালকাটার হোটেলগুলোর এমন অবস্থা যে মাসখানেকের নোটিশ না দিলে একটা খাটিয়াও পাওয়া যায় না। পাকড়াশী বললেন।
আমি থাকতে আপনি সুইট পাবেন না, সে হোয় না। মিস্টার আগরওয়ালা বললেন। আমাদের পার্মানেন্ট গেস্ট হাউস রয়েছে।-বাই ইস্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট উইথ শাজাহান। আমাদের হোস্টেসকে ডাকছি।
বোসদা আমাকে বললেন, তাড়াতাড়ি করবী দেবীকে দুনম্বর সুইট থেকে ডেকে নিয়ে এস। আমি সেদিকেই ছুটলাম।
করবী গুহ তখন ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বোধহয় প্রসাধন করছিলেন। যখন দরজা খুললেন, তখনও শ্রীমতী গুহর প্রসাধন শেষ হয়নি। খোঁপাতে একটা বেলফুলের মালা জড়াচ্ছিলেন। আমাকে দেখেই কাজলকালো চোখ দুটি বিকশিত করে তিনি মৃদু হাসলেন।
মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাঁদের বয়স নির্ধারণ করবার যে বিরল শক্তি ভগবান কাউকে কাউকে দিয়ে থাকেন, আমি তার থেকে বঞ্চিত। সাহিত্যের প্রয়োজনে, কম অথবা বেশি এই দুটি শব্দ দিয়েই আমি কাজ চালিয়ে নিই। ওইটুকুও বলতে না হলে আমি খুশি হতাম। পুরুষ চরিত্রের বয়স নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। অথচ মেয়েদের ক্ষেত্রে যুগযুগান্তর ধরে এটি একটি প্রয়োজনীয় তথ্য বলে সম্মানিত হয়ে এসেছে। করবী দেবীর বয়স বেশি নয়। এবং তার যুবতী শরীর যে বয়সকে গ্রাহ্য করে না, একথা জোর করে বলতে পারি! করবী দেবীর দেহের কোথাও কোথাও যেন ভাস্কর্যের ছাপ আঁকা। আয়ত চোখ, সুতীক্ষ্ণ নাক, মসৃণ গণ্ড। একটু হয়তো কমনীয়তার অভাব। করবী দেবীর গ্রীবাটি সুন্দর। আর সমান্তরাল কঁধ। বক্ষদেশ ঈষৎ স্কুল। কোমরটা তীক্ষ্ণ শাসনে ক্ষীণ রেখেছেন।
মৃদু হেসে করবী দেবী বললেন, আপনি না বোসের অ্যাসিস্ট্যান্ট?
বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনাকে একবার তিনি ডাকছেন।
মিস্টার বোস ডাকছেন? ভদ্রমহিলা যেন একটু বিরক্ত হলেন।
বললাম, মিস্টার আগরওয়ালা এবং মিস্টার পাকড়াশীও ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
ও, তাই বলুন। করবী দেবী এবার যেন ব্যাপারটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে শরীরের গাড়িতে স্টার্ট দিলেন। ঝকঝকে নতুন গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার মধ্যে যেমন একটা প্রচেষ্টাহীন ছন্দ আছে, করবী দেবীর চেয়ার থেকে উঠে পড়ার মধ্যেও তেমন একটু চটুল ছন্দ ছিল।
কাউন্টারে এসে দেখলাম উইলিয়ম একা দাঁড়িয়ে রয়েছে। বললে, বোধহয় সভার কাজ আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। ওঁরা সবাই ওদিকে চলে গিয়েছেন।
আমরা দুজনও হন্তদন্ত হয়ে সেদিকে ছুটলাম। করবী দেবী বললেন, মিস্টার আগরওয়ালা নিজে ডাকলেন? বেলা তিনটের সময় তো ওঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে, তখন কিছুই তো বললেন না।
মাধব পাকড়াশী, মিসেস পাকড়াশী এবং মিস্টার আগরওয়ালা তখন ব্যাংকোয়েট হ-এর একটা টেবিল দখল করে বসেছেন। বোসদা ঘরের কোণ থেকে মাইকটা টেনে এনে সভাপতির মুখের সামনে হাজির করলেন। মাননীয় সভাপতি শুধু মানবসেবার মহান উদ্দেশ্যে এরোপ্লেনযোগে কলকাতায় হাজির হয়েছেন। ন্যাশনাল ড্রেসে সজ্জিত সভাপতি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন। মাথার টুপিটা তিনি এবার ঠিক করে নিলেন।
তাঁর দিকে তাকিয়ে করবী দেবী ফিক করে হেসে ফেললেন। নিজের মনেই বললেন, ও-হরি! ইনি! তাই বলি, দুপুরে ওকে এত খাতির কেন?
করবী দেবীর কথা শোনবার আগেই সভাপতির বক্তৃতা আরম্ভ হয়ে গেল। কলকাতার বরেণ্য নাগরিকবৃন্দ, আপনাদের অমূল্য সময় ব্যয় করে এই সন্ধ্যায় এখানে সমবেত হবার যে কষ্ট আপনারা স্বীকার করেছেন, তার জন্য আমি আপনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। ভারতবর্ষে আমরা এতদিন কেবল জাতির কথাই চিন্তা করে এসেছি। কিন্তু এখন বৃহত্তর পরিধিতে মানুষের কথা ভাববার সময় এসেছে, বিশেষ করে এই ক্যালকাটারই একজন সন্তান যখন বলে গিয়েছেন, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।
সভাপতির বক্তৃতা একটা আলাদা টেবিলে বসে সাংবাদিকরা লিখে নিচ্ছিলেন। তারা হঠাৎ পেন্সিল থামিয়ে নিজেদের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। সভাপতির পাশে প্রখ্যাত সাহিত্যিক নগেন পাল বসেছিলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সভাপতির কানে কানে কী যেন বললেন। সভাপতি একটু থেমে বললেন, ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম ভরসা মাননীয় নগেন পাল আমাকে মনে করিয়ে দিলেন, কবি চণ্ডীদাসের সঙ্গে ক্যালকাটার কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু আমি বলি, মিস্টার দাস তো এই বাংলা দেশেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কলকাতাকে বাদ দিয়ে কে বেঙ্গলের কথা চিন্তা করতে পারে?
এবার মৃদু হাততালি পড়ল। এবং সভাপতি ঘোষণা করলেন, বিশ্বের প্রধান সমস্যা হল খাবার সমস্যা। বিশেষ করে অন্ন। পৃথিবীতে যে চাল উৎপন্ন হচ্ছে, তাতে প্রতিটি মানুষকে পেট ভরে খেতে দেওয়া সম্ভব নয়। এবার সভাপতি একটি কাগজের টুকরো থেকে জনসংখ্যা সম্বন্ধে বিভিন্ন স্ট্যাটিসটিকস মাইকের মধ্য দিয়ে সমাগত অতিথিদের ছুড়ে দিতে লাগলেন।
