সেটা কী জিনিস? আমি বোকার মতো প্রশ্ন করলাম।
সোসাইটি জার্নাল বেরোয় না? কে কোথায় পার্টি দিচ্ছেন, কে কোথায় সমাজসেবা করছেন, কী করে পশম বুনে বাচ্চাদের জামা করতে হয়, ঘর সাজাতে হয়, রাঁধতে হয়, এইসব যেখানে লেখা থাকে। ওঁর কাগজের হাজার হাজার বিক্রি। কলকাতার সব পার্টিতে ওঁকে পাবে। ইন ফ্যাক্ট, ওঁকে না হলে পার্টিই হয় না। কারণ পার্টি দিলে, অথচ সোসাইটি জার্নালে রিপোর্ট বেরুল না, তাহলে সব বৃথা।
শম্পা সান্যাল হাতের ক্যামেরাটা দোলাতে দোলাতে কাউন্টারে এলেন। বোসদা মাথা দুলিয়ে বললেন, গুড ইভনিং।
শম্পা বললেন, এবার আপনারই একটা ফটো ছাপিয়ে দেব। কলকাতায় যত সুন্দর পার্টি হয়, তার অর্ধেক শাজাহানেই হয়।
বোসদা বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ। শম্পা বললেন, আমার মোটেই ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছে না। আমার কী ইচ্ছে করছে জানেন? ইচ্ছে করছে কোনো ঘরে বসে বসে আপনার সঙ্গে একলা গল্প করি।
বোসদার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কিছু না বলে তিনি চুপ করে রইলেন। মিস সান্যাল বললেন, আপনার ঘর কোথায়? কোন তলায়?
বোসদা বোধহয় ভদ্রমহিলার প্রশ্নে বিপদের ইঙ্গিত পেলেন। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কায়দায় বেমালুম বললেন, ছাদের উপর। আমরা তিনজনে একটা ঘরে থাকি। আমি, শংকর, আর একজন। সে বেচারা আবার আমাশায় শয্যাশায়ী হয়ে সর্বদা ঘরেই রয়েছে।
মিস সান্যাল একটু স্রগ করলেন, পুওর বয়! একটা আলাদা ঘরও দেয় না।
সবই ভাগ্য, শম্পা দেবী। প্রাইভেসি বলে কোনো বস্তু ভগবান আমাদের মতো হোটেল কর্মচারীদের কপালে লেখেননি। বোসদা গভীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তারপর মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, আর কোনো পার্টি ছিল নাকি?
হ্যাঁ, দুটো ককটেল সেরে আসছি। মিষ্টি ফাংশন। আরও মিষ্টি লাগত যদি আপনার মতো কোনো হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যান আমার পাশে থাকত। সত্যি বলছি, বিলিভ মি।
উইলিয়ম ঘোষের দিকে বোসদা কি ইঙ্গিত করলেন। উইলিয়ম বললেন, মিস সানিয়েল, চলুন আমরা হ-এ যাই।
উইলিয়মের হাতে ক্যামেরাটা দিয়ে সোসাইটি রিপোর্টার মিস সান্যাল সামনে এগিয়ে চললেন।
বোসদা গম্ভীরভাবে বললেন, ক্রিমিনাল। বাঙালি মেয়েদের কেন যে ওরা হুইস্কি খেতে অ্যালাউ করে। ভদ্রমহিলার আজ মাথার ঠিক নেই।
আজকের পার্টিতে আছেন ব্যারিস্টার সেন, রেডিওথেরাপিস্ট মিত্র, গাইনোকলজিস্ট চ্যাটার্জি, ক্রীড়া-রাজনীতিক বসু, রাজনৈতিক ক্রীড়াবিদ পাল। আর আছেন রাজারা—পাটের রাজা, তেলের রাজা, ঘিয়ের রাজা। লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, কাপড়ের রাজরাজড়ারাও বাদ যাননি। অতীতের স্পেসিমেন হিসেবে বিলীয়মান জমিদারদের দুএকজন প্রতিনিধিও আছেন।
এবার যে ভদ্রলোক শাজাহান হোটেলে ঢুকলেন তাকে দেখেই বোসদা ফিসফিস করে বললেন, চিনে রাখো। লক্ষ্মীর বরপুত্র, শিল্পজগতে আমাদের আশা-ভরসা মাধব পাকড়াশী। গরিবের ছেলে শ্রীমাধব অতি সামান্য অবস্থা থেকে সাফল্যের পর্বতশিখরে উঠেছেন।
ভদ্রলোক একেবারে সোজা আমাদের কাউন্টারে হাজির হলেন। তাঁর পাশের ভদ্রমহিলাকে দেখেই আমি চমকে উঠলাম, মিসেস পাকড়াশী! মোটাপাড় শান্তিপুরী সাদা খোলের শাড়ি পরেছেন। সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে সিঁদুর।
মাধব পাকড়াশী ইভনিং স্যুট পরেছেন। তাকে দেখেই বোসদা বললেন, নমস্কার স্যর। পাকড়াশী তার অমায়িক ব্যবহারের জন্যে বিখ্যাত। মিষ্টি করে বললেন, আমি ভালো। ওঁর শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছে না। প্রায়ই নানারকম অসুখে ভুগছেন।
লজ্জাবতী গৃহবধূর মতো মিসেস পাকড়াশী মাথা নাড়লেন। তোমার যেমন কথা। সারাদিন খেটে খেটে তুমিই শরীরটাকে নষ্ট করছ।
মাধব পাকড়াশী হেসে বললেন, গত তিন সপ্তাহে একটা দিন যায়নি যেদিন ডিনারের নেমন্তন্ন নেই। তাছাড়া বারোটা ককটেল, চোদ্দটা লাঞ্চ। তাও গোটা পনেরো রিফিউজ করেছি। কিন্তু সব সময় রিফিউজ করাও মুশকিল।
বোসদা মাথা নেড়ে বললেন, আপনারা হলেন স্যর ক্যালকাটা সোসাইটির ফাদার-মাদার। লোকে তো আপনাদের আশা করবেই।
মুশকিল তো আমার স্ত্রীকে নিয়ে। পুজোআচ্চা নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকবেন। বাইরে বেরোতে চাইবেন না। অথচ এভরিহয়ার, এমনকি বোম্বাইতেও স্ত্রীরা স্বামীর পাবলিক রিলেসন্স অফিসারের কাজ করেন। আমাকে প্রত্যেক ফাংশনে উনি কেন এলেন না এক্সপ্লেন করতে হয়। আমার খোকার সঙ্গে কোনো শাই গার্ল অর্থাৎ কিনা লাজুক মেয়ের বিয়ে দেব না।
মিসেস পাকড়াশী তখন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। চলো, সভার কাজ বোধহয় আরম্ভ হয়ে যাবে।
মাধব পাকড়াশী বললেন, আঃ আমাকে একটু অর্ডিনারি লোকদের সঙ্গে থাকতে দাও। একটু ফ্রেশ অক্সিজেন মনের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে দাও। ওখানে আবার আগরওয়ালা রয়েছে, এখনই মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার অ্যালটমেন্ট সম্বন্ধে কথা বলতে আরম্ভ করবে।
তা হলে আমি একটু এগিয়ে যাই। একে তো ইন্ডাস্ট্রি তোমাকে নাক উঁচু লোক বলে ভাবতে শুরু করেছে।
যাও, প্লিজ। এই তো প্রকৃত পি আর ওর কাজ। মাধব পাকড়াশী স্ত্রীকে উৎসাহ দিলেন।
মিসেস পাকড়াশী বোসদার দিকে একবার তাকিয়ে হ-এর দিকে চলে গেলেন। সেই চকিত দৃষ্টির মধ্যে বোসদা নিশ্চয়ই তার ইঙ্গিত খুঁজে পেলেন। আমারও মনে হল, এই কদিনে আমিও অনেক চালাক হয়ে উঠেছি। অনেক চকিত চাহনির গোপন সংকেত আমার কাছে সহজেই বোধগম্য হয়ে উঠছে। স্ত্রীর গমন-পথের দিকে তাকিয়ে মাধব পাকড়াশী বললেন, আমার স্ত্রী না হলে, এই সাম্রাজ্য আমি গড়ে তুলতে পারতাম না। রিয়েলি ওয়ান্ডারফুল ওয়াইফ।
