তাদের জামা-কাপড় তো হবেই স্যার, ন্যাটাহারি যতক্ষণ রয়েছে। কিন্তু, আমি তাই বলে গোমেজের বাজনার জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারব না। ধাড়ি ধাড়ি পাঁচটা ছোড়া স্যর, একবার লাঞ্চের সময় কেঁকুঁ কেঁকুঁ করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল, আবার রাত্রে গিয়ে ঘণ্টাখানেক কেঁকু কেঁকু করলে। অন্য সময়ে ভোঁসভোঁস করে নাক ডেকে ঘুমোবে। যন্তর হচ্ছে নিজের সন্তানের মতো। তার জামা-কাপড় তার মায়েরা দেখবে, আমাকে দেখতে হবে কেন?
মার্কোপোলো, কেন জানি না, নিত্যহরিকে একটু প্রশ্রয় দেন। মুখ ফিরিয়ে একটু মৃদু হেসে বললেন, মিস্টার বোস সব ব্যবস্থা করবেন। তুমি এখন যাও। তারপর আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, আমাকে একটু বেরোতে হবে। বায়রন একটা স্লিপ পাঠিয়েছে। হয়তো সুশানের কোনো খবর জোগাড় করতে পেরেছে। বোসকে বলল, ব্যাংকোয়েটের সব ব্যবস্থা যেন ঠিক করে রাখে।
হোটেলে সারাদিন উত্তেজনার মধ্যে কেটে গেল। কারুর এক মুহূর্ত নিশ্বাস ফেলবার সময় নেই। বোসদা আজ রিসেপশনে উইলিয়মকে বসিয়ে রেখে, ব্যাংকোয়েটের কাজে আমাকে নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। ওয়েটাররা প্যান্ট্রিতে বসে ফর্সা কাপড় দিয়ে ছুরি, কাঁটা, চামচ মুছে চকচক করছে। পরবাসীয়া তাদের বলছে, প্রত্যেকটি জিনিস আমি গুনে তুলব। হারালেই মাইনে থেকে দাম যাবে।
আর এমনি উদ্বেগের মধ্যে আমাদের শাজাহান হোটেল ক্রমশ সেই মোহনায় হাজির হল, দিনের নদী যেখানে রাত্রের পারাবারে এসে মেশে। সত্যসুন্দরদা ততক্ষণে ঘর সাজিয়ে ফেলেছেন। ন্যাটাহারিবাবুর কাপড়ে তৈরি সাড়ে তিনশ বুনো শুয়োরের মাথা তখন ব্যাংকোয়েট হল-এ অপেক্ষা করছে।
মানবপ্রেম সমিতি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। আজ যাঁদের নৈশ ভোজসভা, তারা সম্প্রতি কলকাতায় এই আন্তর্জাতিক সমিতির একটি শাখা গড়ে তুলেছেন। অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্য মিস্টার আগরওয়ালা, মিস্টার ল্যাংফোর্ড এবং খানবাহাদুর হক কাউন্টারের সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মিস্টার আগরওয়ালা পরেছেন জাতীয় পোশাক, গলাবন্ধ কোট ও চুস্ত। মিস্টার ল্যাংফোর্ড সান্ধ্য ইউরোপীয় পরিচ্ছদ। আর খানবাহাদুর তার মোগলাই ট্রাডিশনকে অবজ্ঞা করেননি। মানবসেবার জন্য এঁদের সকলেরই দুশ্চিন্তার অবধি নেই। এঁদের সকলেরই অনেক কাজ আছে; অনেক সমস্যা আছে; সুখ উপভোগ করবার অনেক জায়গা আছে। কিন্তু সে-সব ছেড়ে দিয়ে তারা যে সন্ধে থেকে হোটেলে এসে দাঁড়িয়ে আছেন তার একমাত্র কারণ সমাজের জন্য, দেশ ও জাতির বৃহত্তম স্বার্থের জন্য তারা ত্যাগ করতে চান।
একটু খাতির কোরো, আগরওয়ালাকে দেখিয়ে বোসদা ফিসফিস করে বললেন। ত্রিমুর্তির মধ্যে মধ্যবয়সী আগরওয়ালাকে খাতির করতে যাব কেন, প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই বোসদা বললেন, দু নম্বর সুইটটা ওঁরাই সব সময়ের জন্যে ভাড়া করে রেখেছেন। ওঁদের কোম্পানিরই অতিথিশালা। করবীকে চেনো তো? ওঁদেরই হোল-টাইম হোস্টেস। মাইনে ছাড়াও করবী বোনাস পায়।
এতদিন খবরের কাগজে স্বদেশি সংগ্রাম, বিদেশি শোষণ, হিন্দু-মুসলমানের পার্থক্য ইত্যাদি সম্বন্ধে যা পড়েছি দেখলাম তার সবই মিথ্যে। মিস্টার আগরওয়ালা অতিথিদের লিস্ট হাতে ল্যাংফোর্ডের কানে কানে কী বললেন। ল্যাংফোর্ড খিল খিল করে হাসতে হাসতে আগরওয়ালার ঘাড়ে গড়িয়ে পড়লেন। সেই হাসির ঢেউ খানবাহাদুরের উপর পড়তে দেরি হল না। তিনটে সভ্যতা মিলে মিশে আমারই চোখের সামনে একাকার হয়ে গেল।
এবার অতিথিরা আসতে আরম্ভ করেছেন। মার্কোপোলো বাইরে থেকে ফিরে এসে একটা ধোপভাঙা সার্কস্কিনের স্যুট পরে হ-এর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ওঁকে খুবই উদ্বিগ্ন মনে হল। কিন্তু এত লোকের ভিড়ের মধ্যে কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না।
আমরাও ধোপভাঙা স্যুট পরেছি। বোসদা একসময় আমার প্রজাপতি টাইটা একটু টেনে সোজা করে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন, স্টাইলের মাথায় চলতে হবে। হাঁদাগঙ্গারাম হলেই বিপদ।
কলকাতার কলকাতাত্ব যাঁদের নিয়ে, তাঁদের সবাইকেই বোসদা বোধহয় চেনেন। একজনকে দেখিয়ে বললেন, উনি মিস্টার চোখানিয়া, কটন কিং। চোখানিয়া একলাই এসেছেন, মিসেসকে উনি কখনও আনেন না।
মানবপ্রেম সমিতির তিনজন সদস্যই চোখানিয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। চোখানিয়া এবার আগরওয়ালার পিঠে একটা মৃদু থাপ্পড় দিয়ে হ-এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। মানুষের সেবার মহৎ উদ্দেশ্যে চোখানিয়া তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে দ্বিধা করেননি। তিনি শাজাহান হোটেলে ছুটে এসেছেন।
বোসদা বললেন, আমি মুখস্থ বলে দিতে পারি, কে কে আসবেন। কলকাতায় যত পার্টি হয়, তাতে সব কটা লোকই এক। কারণ সবাই এক লিস্ট দেখে ছাপানো কার্ড পাঠায়। একই লোকের কাছে রোজ নেমন্তন্ন যায়। রোজই তিনি জামা-কাপড় পরে সন্ধেবেলায় বেরিয়ে পড়েন। বিভিন্ন হোটেলে যান, না হয় বিভিন্ন ক্লাবে, না হয় আলিপুর কিংবা বর্ধমান রোডের বাড়িতে।
বোসদা ফিসফিস করে বললেন, কলকাতাকে এবং মানবপ্রেমিক নাগরিকদের নিজের চোখে দেখে নাও। কারণ কাল যখন খবরের কাগজে এই অধিবেশনের রিপোর্ট পড়বে, তখন আসল জিনিসের কিছুই থাকবে না। সেখানে শুধু বক্তৃতার রিপোর্ট থাকবে। কে কী বলবেন, তার সামারি কাগজের অফিসে চলে গিয়েছে। রাম না জন্মাতেই রামায়ণ লেখা হয়ে গিয়েছে!
রোগামতো এক ভদ্রমহিলা এবার ক্যামেরা হাতে একা ঢুকলেন। বোসদা বললেন, শম্পা সান্যাল, শীর্ণ ফরাসি সৌন্দর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী! আগে ছিলেন ঘোষ, তারপর বোধহয় ভ্যালেংকার না কোন এক মারাঠিকে বিয়ে করেছিলেন। তারপর বোধহয় সাহা, তারপর মিত্তির! এবার আবার পুরনো কুমারী নামে ফিরে এসেছেন। মিস শম্পা সান্যাল। সোসাইটি রিপোর্টার।
