জুনো হেসে বললে, স্যাটা, তোমার বিয়েতে ফ্রেঞ্চ ইংলিশ, স্প্যানিশ, ইটালিয়ান, পোলিশ, আফ্রিকান, টার্কিস, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান সব রকম এক-একটা ডিশ করব।
হে পরম করুণাময়, হে প্রভু, মঁসিয়ে জুনোকে তুমি দীর্ঘজীবী করো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ইউ-এন-ও থেকে একটি মনের মতো কনে আমার জন্যে পাঠিয়ে দিও। বোসদা হাঁটু গেড়ে, জোড়হাতে সকৌতুকে ভগবানের উদ্দেশে প্রার্থনা জানালেন।
জুনো খুশি হয়ে বললে, তোমার ফুলশয্যার রাত্রে যে স্যুপ করব, তার নাম La Soupe des Noces oy Tourin Aux Tomates!
বোসদা হাসতে হাসতে একটু সরে এসে বললেন, নামটা তো বেজায় লম্বা-চওড়া। আসল জিনিসটা কি, জুনোদা?
জুনো বললে, ছোট করে আমরা বলি মধুযামিনী স্যুপ। এই স্যুপ অনেকখানি তৈরি করতে হবে। তারপর আমাদের দেশে যা হয়, তাই করা হবে।
জিমি বললে, প্রেম করা আর খাওয়া ছাড়া আর কোনো চিন্তাই তো তোমাদের ফরাসি জাতের মাথায় আসে না।
জুনে রেগে গিয়ে জিমিকে বললে, বাজে বোকো না।
তারপর বোসদার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে, তোমার ফুলশয্যার দিন আমরা বহু রাত পর্যন্ত খানাপিনা করব, হই-হই করব। তারপর গভীর রাত্রে দু পাত্র গরম মধুযামিনী স্যুপ নিয়ে তোমার বদ্ধঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে আরম্ভ করব। যতক্ষণ না তোমরা দরজা খুলে দাও, ততক্ষণ আমরা বাজনা বাজাব, চিৎকার করব, ধাক্কা দেব। তারপর আমাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে যেমনি তুমি বা তোমার গিন্নি দরজা খুলবে, অমনি হই-হই করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ব। জোর করে তোমাদের দুজনকে ওই স্যুপ খাওয়াব। ঠিক আমরা খাওয়াব না। মিসেস বোসকে খাওয়াবে তুমি, আর মিসেস বোস খাওয়াবেন তোমাকে। যতক্ষণ না তোমরা ওই স্যুপ শেষ করবে, ততক্ষণ আমরা ঘর থেকে বেরুব না।
বোসদা হেসে বললেন, তা না হয় নাই বেরুলে। কিন্তু স্যুপটা কিসের তৈরি শুনি। কলকাতায় সব জিনিস পাওয়া যাবে তো?
জরুর। আমার চাই বারোটা টমাটো, ছটা পেঁয়াজ, কিছু মরিচ, আর এক আউন্স মাখন!
অ্যাঁ! কেবল পিয়াজ আর টমাটো দিয়ে La Soupe des Noces oy Tourin Aux Tomates! আমি ওর মধ্যে নেই। আমি বিয়েই করব না। মুখ দিয়ে ভকভক করে পিঁয়াজের গন্ধ বেরুচ্ছে, এমন স্বামীকে কোনো মেয়েই সহ্য করবে না।
জুনো যে সত্যসুন্দরদাকে ভালোবাসে, তা তার কথাতেই বোঝা যায়। সে এবার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মার্কোপোলো ফিরে এলেন। বললেন, কথাবার্তা সব হয়ে গিয়েছে। আমি মেনুটা এখনই রোজিকে ডিক্টেট করে দিচ্ছি। শুধু কজন ভেজিটারিয়ান, আর কজন নন-ভেজিটারিয়ান তা জানা যাচ্ছে না।
জিমি বললে, সে তো কখনই জানা হয়ে ওঠে না। শতকরা দশটা নিরামিষ করে দিই।
জুনো রেগে বললে, হেল! প্যারিস যদি স্বর্গ হয়, ক্যালকাটা তাহলে রাঁধুনিদের নরক। পার্টিতে না এসে কলকাতার লোকেরা বাড়িতে বসে বসে ফল খায় না কেন? মঁসিয়ে হারবদু কি ভাবতে পারেন যে, একই ডিনার টেবিলে একদল ভেজিটারিয়ান, আর একদল নন-ভেজিটারিয়ান! একদল নিরামিষাশী হয়েও ডিম খায়। আর একদল নন-ভেজিটারিয়ান হয়েও বীফ খায় না। আর একদল গোরু খায়, কিন্তু শুয়োরের নাম শুনলে বমি করতে আরম্ভ করে।
বোসদা জুনোকে রাগাবার জন্যে বললেন, এখন বল মা তারা, দাঁড়াই কোথায়?
হোয়াট? জুনো প্রশ্ন করলেন।
এই জন্যেই তো আমাদের গ্রেট রামপ্রসাদঠাকুর বলেছন—টেল মাদার স্টার হোয়্যার ড়ু আই স্ট্যান্ড? বোসদা বললেন।
জুনোর মুখে হাসি ফুটে উঠল, স্যাটা, মিস্টার প্রসাদ কি একজন গ্রেট কুক ছিলেন?
ভেরি ভেরি গ্রেট রাঁধুনি। ওনলি গডের জন্যে তিনি কুক করতেন।
পরবাসীয়া আসরে বসেছিল। সে এবার ম্যানেজার সায়েবের কানে কানে কী যেন বললে। ম্যানেজার জিমিকে প্রশ্ন করলেন, ওয়েটারের কী হবে? মেন ডাইনিং হল-এ কজনকে দিয়ে তুমি চালিয়ে নিতে পারবে?
কুড়িজনের কমে অসম্ভব, স্টুয়ার্ড বললেন।
ব্যাংকোয়েটের সময় লোকের অভাব হয়। যেখানে যত লোক আছে, সবাইকে উর্দি পরিয়ে ওয়েটারের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। কোন হোটেলে একবার নাকি ঝাড়ুদারদেরও কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবাসীয়া চুপি চুপি খবরটা আমাকে জানিয়েছিল। তাছাড়া পুরনো লোকদেরও খবর দেওয়া হয়। যারা অনেকদিন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে (অর্থাৎ জিমি যাদের অবসর নিতে বাধ্য করেছে), কলকাতার কাছাকাছি থাকলে তাদেরও ডাক পড়ে।
জিমি বললেন, পরবাসীয়া, তুমি এখনই বেরিয়ে পড়ো, আবদুল গফুর, মায়াধর, জয়া এদের সব খবর দিয়ে এসো। দুটাকা করেই দেওয়া হবে।
পরবাসীয়া উঠে পড়ল। আর মার্কোপোলো বললেন, যাবার আগে ন্যাটাহারিকে একটা খবর দিয়ে যাও।
চটি ফটর ফটর করতে করতে নিত্যহরিবাবু যখন আসরে হাজির হলেন, তখন আরও অনেকেই উঠে পড়েছেন। জুনো তার কিচেনে চলে গিয়েছে। জিমি কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে মার্কেটের ব্যবস্থা করতে বেরিয়ে গেলেন। মার্কোপোলো বললেন, ন্যাটাহারি, ব্যাংকোয়েট।
ন্যাটাহারি তাতেই সব বুঝে গেলেন।কটা বাড়তি লোক নিয়ে আসছেন স্যর?
প্রায় কুড়িটা।
চল্লিশটা উর্দি, আর আশিটা দস্তানা আমি রেডি করে রেখে দেব। মাথার পাগড়িও দিয়ে দিই স্যর? রাজ্যের বড় বড় লোক আসছেন। লাটসায়েব আসছেন নাকি?
আসতে পারেন। কিছুই বলা যায় না। বোসদা বললেন।
নিত্যহরি বললেন, তা হলে তো বাজনদারদেরও সাজাতে হয়।
হ্যাঁ, তাদেরও জামা-কাপড়ের ব্যবস্থা যেন ঠিক থাকে।
