ব্যাংকোয়েট সম্বন্ধে খোঁজখবর এলে সবচেয়ে যিনি খুশি হন, তিনি আমাদের ম্যানেজার। তিনি কাস্টমারকে সোজাসুজি বলে দেন, এত বড় পার্টিকে ম্যানেজ করা শাজাহান হোটেল ছাড়া আর কোথাও সম্ভব নয়। আমাদের চার্জ সামান্য একটু বেশি পড়ে, কিন্তু যারা পার্টিতে আসবেন তাদের আনন্দ; আর যারা পার্টি দিচ্ছেন তারাও নিশ্চিন্ত।
সপ্তাহে এক-আধটা ব্যাংকোয়েট শাজাহান হোটেলে লেগেই থাকে। আগে আরও হত। সত্যসুন্দরদা বললেন, আগে এমন সময় গিয়েছে, যখন পর পর পাঁচ দিন ব্যাংকোয়েট। দেড় মাস, দু মাস আগে থেকে ব্যবস্থা না-করলে হল্ পাওয়া যেত না।
সত্যসুন্দরদার কাছেই শুনলাম, এখন আর সেদিন নেই। তার কারণ যে কলকাতায় ফুর্তি করবার লোক কমে গিয়েছে, বা সামাজিক মেলামেশা কমে গিয়েছে তা নয়; আসলে কলকাতার ক্লাবগুলো জাঁকিয়ে বসেছে। সেখানে মদ সস্তা, খাবার সস্তা, লাভের তাড়নাটাও তেমন নেই। অথচ ইজ্জত কম নয়; বরং বেশি। ক্লাবের প্রাইভেসিতে পার্টি দিতে কলকাতার উঁচু মহলের নাগরিকরা পছন্দ করেন। ক্লাবের ম্যানেজমেন্টও খুশি হন। নতুন স্টাফ রাখতে হচ্ছে না, অথচ ক্লাবের তহবিলে কিছু আসছে। দেশের যা হালচাল, কিছুই বিশ্বাস নেই, কোনদিন সকালে খবরের কাগজে দেখা যাবে বোম্বাইয়ের মতো কলকাতারও বারোটা বেজে গিয়েছে। ভিজে কলকাতা রাতারাতি ড্রাই হয়ে গিয়েছে। মদের লাইসেন্সবিহীন ক্লাব অনেকটা পাতাবিহীন বাঁধাকপির মতো। বিধাতা করুন, সেই দুর্দিন যেন সুদূরপরাহত হয়। কিন্তু সত্যিই কখনও সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বোম্বাই-এর শুকনো তেজস্ক্রিয় মেঘ যদি দিল্লি ঘুরে কলকাতায় এসে হাজির হয় তখন সেই দুর্দিনে ব্যাংকোয়েট ছাড়া ক্লাবের কিছুই থাকবে না। সেইজন্য এখন থেকেই তারা সতর্ক হয়েছেন।
কিন্তু ব্যাংকোয়েট কি আর অতই সহজ! বিশেষ করে সে ব্যাংকোয়েটে যদি সাড়ে-তিনশ চারশ অতিথি আসেন। শাজাহানে এমন সব লোক আছে, এসব কাজে যাদের তুলনা নেই। প্রয়োজন হলে সরকারি মহলেও তাদের ডাক পড়ে। আন্তর্জাতিক অতিথিদের কাছে ভারতবর্ষের ক্ষণভঙ্গুর মান-সম্ভ্রম তারাই রক্ষে করে আসে। আমাদের পরবাসীয়ার কথাই ধরা যাক না কেন। নাইনটিন টোয়েন্টিফোরে ব্রিটিশ এম্পায়ার এগজিবিশনে যে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছিল, সেখানে কাজ করবার জন্য সে বিলেত গিয়েছিল। তারপর কতবার যে সে-লাট-বেলাটদের ব্যাংকোয়েটদায় উদ্ধার করেছে তার হিসেব নেই। ব্যাংকোয়েটের খবরে পরবাসীয়ারা খুশি হয়। দিন দুই যা একটু বেশি খাটতে হয়। পিঠে ব্যথা হয়, পাগুলো টনটন করতে আরম্ভ করে, কিন্তু তবু ভালো লাগে।
ব্যাংকোয়েটের ব্যবস্থা হলেই মার্কোপোলো খুব ঘোরাঘুরি আরম্ভ করেন। কিন্তু তার মেজাজটা হঠাৎ খুব নরম হয়ে যায়। বাড়ির রাশভারি কর্তা যেমন বিয়েবাড়ির কাজের চাপে অনেক সময় ছেলেপিলেদের সঙ্গে বন্ধুভাবে কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করেন, মার্কোপোলোও তেমনি বলেন, জিমি, এটা খুবই ইম্পর্টান্ট ব্যাংকোয়েট, এই পুওর কান্ট্রির প্রেস্টিজ নির্ভর করছে এর সাফল্যের উপর।
জিমি বলে, এমন ব্যাংকোয়েটের ব্যবস্থা করব, যা কোনোদিন কলকাতায় হয়নি।
মার্কোপোলো জুনোর দিকে মুখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করেন, তুমি কী বলো?
জুনো বলে, স্যর, নো-নো, দিজ আর সিম্পল পার্তিজ, নো ব্যাংকোয়েত! ব্যাংকোয়েট বলে লজ্জা দিচ্ছ কেন, এ-সব আসলে পার্টি। জুনোর ধারণা, ব্যাংকোয়েট কাকে বলে তা ক্যালকাটার লোকরা জানে না। জুনো বলে, এটা হাড়কঞ্জুস স্কচ সিটি। প্যারিসে কাজ শিখে, এই পিঁপড়ের পশ্চাৎ-টেপা শহরে এসে অর্ধেক রান্নাই ভুলে গেল। জুনো তো যে-সে লোকের পায়ের তলায় বসে রান্না শেখেনি। খোদ মঁসিয়ে হারবদু-দুনিয়ার যত হোটেলের যত সেফ আছে, তার নাম শুনে মাথা নত করে তাকে নিজে হাতে কুকিং শিখিয়েছেন। মঁসিয়ে হারবদু যাঁর শিষ্য, তিনি রান্নার জগতের বীঠোফেন। তাঁর নাম মঁসিয়ে একফিয়ারয়। একফিয়ারয় বলতেন, টু কু ইজ টু সার্চ গড়। হারবদুর কাছে জুনো কতবার শুনেছে, নয় কোর্সের কম ব্যাংকোয়েট ডিনার হয় না।
হোয়াট? মার্কোপোলো সায়েব চিৎকার করে উঠেছিলেন।
জুনো তার অ্যানে হাতটা ঘষতে ঘষতে বললে, হ্যাঁ, প্রথমে অডিভোর, তারপর স্যুপ, ফিশ, Entree, রিমুভস, রোস্ট এনট্রিমেন্ট, ডেসার্ট এবং শেষে কফি।
মার্কোপোলো এবার গম্ভীরভাবে বললেন, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, আমাদের এই ব্যাংকোয়েটটা ছেলেমানুষের ব্যাপার নয়। যতদূর শুনেছি, অভ্যাগতরা দেশের এবং পৃথিবীর অনেক গুরুতর সমস্যা সম্বন্ধে আলোচনা করবেন। ন্যাচারালি তাঁরা চান প্লেন অ্যান্ড সিম্পল ডিনার। অ্যাবাউট পনেরো টাকা পার হেড।
নয় কোর্সের ডিনার রান্নার সুযোগ হারিয়ে জুনো বললে, আপনার যা খুশি হুকুম করুন, আমি বেঁধে খালাস। আপনি বলুন, আমি শুধু কোল্ড মাটন এবং ব্রেড দিচ্ছি। তবে এটা আমি বলবই, প্যারিস ছাড়া আর কোথাও বেঁধে সুখ নেই। দুনিয়ার আর কোথাও রান্নার সমঝদার নেই। সেইজন্যেই কলকাতায় হালুইকর বাউন পাওয়া যাবে; কিন্তু কলকাতা কোনোদিন একটা মঁসিয়ে হারবদু বা একটা মঁসিয়ে একফিয়ারয়কে সৃষ্টি করতে পারবে না।
মার্কোপোলা উঠে পড়লেন। বললেন, তোমরা একটু বসো, আমি একটা টেলিফোন করে আসছি। মেনুটা ওঁদের সঙ্গে আলোচনা করে নিই।
বোসদা তখন জুনোকে বললেন, পুওর জুনো! তুমি দুঃখ করো না। আমার বিয়ের সময় তোমাকে মনের সুখে রান্নার সুযোগ দেব। তখন দেখব কি মেনু তোমার মাথায় আছে।
