আমি অবাক হয়ে নিত্যহরিবাবুর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। বালিশ বেশি চাইতে হলে আগে চাই ড্রিঙ্কস্-আমাদের মুনি-ঋষিরা যাকে বলেন মাল। শাজাহানের শুড়িখানায় যাতায়াত করেন তো?
বললাম, ওখানে এখনও আমার ডিউটি পড়েনি।
উনি বললেন, মেয়েদের বলি, মা লক্ষ্মী, কর্তাদের সব স্বাধীনতা দেবে। কিন্তু বাড়ি ছাড়তে দেবে না। খুঁটি থেকে ছাড়া পেলেই বিপদ। কার বেড়া ভাঙবে, কার ক্ষেতে ঢুকবে কিছুই ঠিক নেই।
নিত্যহরিবাবুর মধ্যে আমি এক অদ্ভুত মানুষকে দেখতে পাচ্ছি। আস্তে আস্তে তিনি বললেন, সাপ! আমি এতদিনে বুঝেছি, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটা কেউটে সাপ ঘুমিয়ে আছে। কারুর মধ্যে সেই চিরকালই ঘুমিয়ে থাকে। আর কারুর কারুর বাড়ি ছাড়লেই ভিতরের সেই সাপটা ফোস করে ওঠে। লক লক করে ওঠে জিভটা।
আমার কেমন ভয় ভয় করছিল। ওই ঘরে আর থাকতে ইচ্ছে করছিল। নিত্যহরিবাবুরও বোধহয় ভালো লাগছিল না। তাই এক নম্বর সুইটের বিছানা থেকে উঠে পড়ে বললেন, চলুন, আমার ঘরে যাওয়া যাক।
বালিশ, বিছানা, চাদর-এর পাহাড়ের এক কোণে নিত্যহরিবাবু শুয়ে থাকেন। বললেন, এইখানেই আমি থাকি; আর ছোটো শাজাহানে খাই।
ছোট শাজাহান! সে আবার কোথায়? আমি প্রশ্ন করলাম।
বড় শাজাহানের পিছনে। বলুন তো, শাজাহানের একটা ডিনারের সবচেয়ে বেশি চার্জ কত? নিত্যহরিবাবু প্রশ্ন করলেন।
আমি বললাম, এ তো সবাই জানে। পঁয়ত্রিশ টাকা।
আর ছোট শাজাহানে চোদ্দ পয়সা। চোদ্দ পয়সায় ফুলকোর্স ডিনার। ভাত, ডাল, তরকারি। মধ্যিখানে দাম বাড়িয়ে চার আনা করবে বলেছিল। শাজাহানের স্টাফরা একসঙ্গে প্রতিবাদ করি। চার আনা আমরা কোথা থেকে দেব? তখন বাধ্য হয়ে চোদ্দ পয়সায় রেখেছে, শুধু ডালটা একটু পাতলা হয়েছে; আর থালাটা যে-যার ধুয়ে দিতে হয়। নিত্যহরিবাবু বললেন, আপনার কথাই আলাদা। গাছে না উঠতেই এক কাদি। চাকরিতে না-ঢুকতেই বড় শাজাহানের ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ আর ডিনার।
আমি চুপ করে রইলাম। কী উত্তর দেব? ন্যাটাহারিবাবু নিজেই বললেন, আপনাদের অবশ্য জুনো সায়েব অনেক কম দেয়। গেস্টরা লাঞ্চের সময় যা খান, তার বাড়তিগুলো দিয়ে আপনাদের ডিনার। আর ডিনারের বাড়তি দিয়ে আপনাদের পরের দিনের লাঞ্চ। আজ লাঞ্চে সায়েব আপনাদের কী খাওয়াবে জানেন?
নিত্যহরিবাবুর খবর সংগ্রহের ক্ষমতা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
ম্যাড্রাস কারি। খেতে চমৎকার, কিন্তু খবরদার খাবেন না। আপনার পেট কেমন? লোহা খেলে হজম হয়ে যায়?
মোটেই না, পেটটা একেবারেই আমার ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট নয়।
তা হলে ম্যাড্রাস কারিটা একদম বাদ দিয়ে খাবেন। ওটা লন্ডনের বীরস্বামী সায়েবের আবিষ্কার। বীরস্বামী, গোল্ড মেডালিস্ট, অনারারি কুকিং অ্যাডভাইসার টু দি সেক্রেটারি অফ্ স্টেট ফর ইন্ডিয়া। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ এম্পায়ার এগজিবিশনে গিয়েছিলেন, তারপর লন্ডনে রেস্টুরেন্ট খুলেছিলেন। তার কাছেই তো জুনো ইন্ডিয়ান রান্না শিখেছিল বলে। কিন্তু আসলে বীর স্বামী ওকে ঘাড় ধরে বার করে দিয়েছিলেন। আমাদের দেবেন কুক না থাকলে, জুনোর জারিজুরি এতদিনে বেরিয়ে পড়ত। যা বলছিলাম—প্রথম দিন মাংস কিনে এনে হয় কোল্ড মিট। দ্বিতীয় দিনেও তাই। তৃতীয় দিনে বিরিয়ানি। আজকে সেই মাংসই ম্যাড্রাস কারি ফর দি স্টাফ।
নিত্যহরিবাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসছিলাম। উনি বললেন, একটু থামুন। আপনি ছেলেমানুষ। আপনাদের মনে যাতে দাগ না পড়ে, আর একটু দাগ পড়লেই যাতে ধরা পড়ে, তার ব্যবস্থা করছি। রোজি তো আপনার ঘর অকুপাই করে নিয়েছে। আপনার মালপত্তর সব পাশের ঘরে চালান হয়ে গিয়েছে। ওখানে আমি সবকিছু সাদার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
এক বান্ডিল কাপড়-চোপড় নিয়ে উনি জোর করে ছাদে আমার সঙ্গে চলে এলেন। রোজি নিজের ঘরে বসে তখন দাঁত বার করে হাসছে। আমাকে দেখেই বললে, আমার কাজকর্ম সব শেষ। এখন ছাদে বসে বসে শরীরটাকে সূর্যের আগুনে মচমচে টোস্ট করব। তারপর লাঞ্চ খাব। তারপর জানো কী করব? ম্যাটিনি শোতে সিনেমায় যাব। জিমিরও যাবার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকোয়েটে কাজ পড়ে গিয়েছে! ওর টিকিটটা রয়েছে। তুমি যাবে?
আমি অবাক হয়ে গেলাম, রোজি আমাকে সিনেমায় নেমন্তন্ন করছে। বললাম, অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমারও ডিউটি রয়েছে।
রোজি বললে, অল রাইট, তাহলে আমার বোনকে নিয়ে যাই। তবে বিনা নোটিশে ওকে সিনেমায় নিয়ে গেলে ওর বয়ফ্রেন্ডরা দুঃখিত হয়, ডাকতে এসে তারা ফিরে যাবে।
আর-এক দফা ধন্যবাদ জানিয়ে, নিজের ঘরে ঢুকলাম। নিজের মুখভঙ্গিকে ন্যাটাহারিবাবু এতক্ষণ বোধহয় কোনোরকমে চেপে রেখেছিলেন। ঘরে ঢুকেই তিনি নিজমূর্তি ধারণ করলেন। বললেন, অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন মনে হল! কিন্তু মনে রাখবেন, অতিবাড় বেড়ো না ঝড়ে ভেঙে যাবে। আরও মনে রাখবেন, চারদিকে বিষ। সবসময় ভালো করে হাত না ধুলে মরবেন।
ঘরের চারদিক খুঁটিয়ে দেখে বললেন, আপনার এ-ঘরে সব সাদা করে দিচ্ছি। সাদা পর্দা, সাদা চাদর, সাদা তোয়ালে, সাদা টেবিলক্লথ। দরকার হয়, আমি রোজ পাল্টাবার ব্যবস্থা করব। পাঁচটা ধোপ এই নিত্যহরির কথায় ওঠে বসে। একটু বসেই নিত্যহরিবাবু আবার উঠে পড়লেন।আমি চলি। অনেক কাজ। ব্যাংকোয়েটে তিনশ গেস্ট। তিনশ ন্যাপকিনের ফুল তৈরি করতে হবে।
ন্যাপকিনের ফুল কাকে বলে জানতাম না। ওঁর কাছেই শুনলাম, আগে শাজাহান হোটেলে প্রতি কোর্সে ন্যাপকিন পাল্টানো হত। এখন একবারই হয়। অতিথিরা হ-এ ঢোকবার আগেই গেলাসের মধ্যে ন্যাপকিন সাজিয়ে রাখা হয়। নিত্যহরিবাবু বললেন, কত রকমের ন্যাপকিন মুড়েছি-পাখা, বিশপ, নৌকো, পদ্মফুল, ফণিমনসা। এবারে অন্য একভাবে মুড়ব। তাতে আমার পরিশ্রম বেশি, তবু করব। কেবল নামটির জন্যে। ইংরিজিতে বলে দি বোরস হেড। শুয়োরের মাথা-হোটেলের ব্যাংকোয়েটে প্রতিবারই এবার থেকে আমি শুয়োরের মাথা ছাড়া আর কিছু করব না। আপন মনে বকতে বকতে নিত্যহরিবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
০৭. ক্রিকেটে যেমন টেস্ট
ক্রিকেটে যেমন টেস্ট, ফুটবলে যেমন শিল্ড ফাইন্যাল, হোটেলে তেমনি ব্যাংকোয়েট। এই ব্যাংকোয়েট বস্তুটি আসলে যে কী, হোটেলের চাঁইদের কেউই তা জানেন না। জানবার সময়ও নেই কারুর।
