এক নম্বর সুইটের চাবি খুলে ভিতরে ঢুকে দেখা গেল একটা মাত্র বালিশ পড়ে রয়েছে। দেখে নিত্যহরিবাবু প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেন। পরমুহূর্তেই চিৎকার করে বলে উঠলেন, অসম্ভব! নিশ্চয়ই নেশার ঘোরে মেঝেতে খেলাধুলো করেছে, তারপর ভুলে গিয়েছে।
আমি বললাম, গতকাল ড্রাই-ডে ছিল।
নিত্যহরিবাবু কিন্তু আমল দিলেন না। হ্যাঁ। ড্রাই-ডেতে কলকাতা একেবারে বাউনের ঘরের বিধবা হয়ে যায়!
নিত্যহরিবাবু হঠাৎ মেঝেতে বসে পড়ে খাটের তলায় উঁকি মারলেন। তারপর আবিষ্কারের আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায় ঢুকে পড়ে তিনটে বালিশ বার করে বললেন, দেখুন স্যার। একটু হলেই আমার চাকরি যাচ্ছিল। কেউ বিশ্বাস করত না যে, আমি বালিশ দিয়েছি এবং সেই বালিশ ওঁরা মেঝেতে নিয়ে খেলাধুলা করছিলেন। লাটসায়েবের বালিশ সাপ্লাই করেও, এই আটটি ইয়ার সার্ভিসের পর নিত্যহরি ভটচায্যির চাকরি যাচ্ছিল।
আমি দেখলাম, সত্যিই ঘরের মধ্যে খাটের তলায় বালিশ ছিল। আমার মুখের অবস্থা দেখে নিত্যহরিবাবুর বোধহয় একটু দয়া হল। বললেন,
আপনার বয়স কম। হোটেলের কিছুই দেখেননি আপনি। নেশা কি শুধু মদে হয়! একদম বাজে কথা! বেশি বয়সের মেয়েমানুষের মাথায় যখন ভূত চাপে তখন চোখে নেশা লেগেই থাকে। তা বাপু, পয়সা দিয়ে হোটেলের ঘর ভাড়া করেছ। বালিশ নিয়ে খেলা করো। নিত্যহরিবাবু ঢোক গিললেন। কিন্তু বালিশও নিচেয় ফেলে দেব, আবার ন্যাটাহারিকে বাম্বু দেব, সে কি কথা!
গতিক সুবিধে নয় বুঝে পরবাসীয়া কখন আমাকে একলা ফেলে রেখে কেটে পড়েছে। এবার আমিও অ্যাবাউট টার্ন করে পালাবার চেষ্টা করব ভাবছিলাম।
নিত্যহরিবাবু তখন বলছেন, আপনি হয়তো ভাবছেন ধেড়ে। মোটেই নয়। রং লাগলে ধেড়েরাও খোকাখুকু হয়ে যায়। ন্যাটাহরির এই স্টেটমেন্ট সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত চলবে, জেনে রাখবেন। ন্যাটাহারি পরের মুখে ঝাল খায় না, সে নিজের হাতে তিরিশ বছর ধরে বালিশ সাপ্লাই করছে।
এবার পালানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু নিত্যহরিবাবু হাতটা চেপে ধরে বললেন, যাচ্ছেন কোথায়?
আমি বললাম, নিচেয়।
অত সহজে নয়। অত সহজে আমার হাত থেকে কেউ ছাড়া পায় না। মনে হল সেই ভোরবেলাতেও নিত্যহরিবাবুর চোখ-দুটো ধক ধক করে জ্বলছে।
কেন, কী করতে হবে? নিত্যহরিবাবুকে আমি প্রশ্ন করলাম।
তার দুটো চোখের তেজ এবার কমে এল। মনে হল, নিত্যহরিবাবু নিজেকে শান্ত করবার চেষ্টা করছেন। আস্তে আস্তে তিনি বললেন, আমার হাতে একটু জল দিন।
বললাম, জল কী করবেন?
পাপ! পাপ ধুয়ে ফেলতে হবে না?
বাথরুমে বেসিন রয়েছে। কল রয়েছে। কিন্তু নিত্যহরিবাবু এক নম্বর সুইটের কলে হাত দেবেন না। যেন এ-ঘরের সর্বত্র পাপ ছড়ানো রয়েছে। বাথরুমে গিয়ে একটা মগ আবিষ্কার করলাম এবং সেই মগে জল বোঝাই করে নিত্যহরিবাবুর হাতে ঢালতে লাগলাম। বেসিনের উপরেই একটা পাত্রে লিকুয়িড সোপ ছিল। কিন্তু নিত্যহরিবাবু সেদিকে হাত বাড়ালেন। না। পকেট থেকে একটা সাবানের টুকরো বার করলেন। কোথায় কখন বালিশ ঘেঁটে হাত ধুতে হবে ঠিক নেই; তাই পকেটে কয়েক টুকরো সাবান নিত্যহরিবাবু সব সময়েই রেখে দেন। কার্বলিক সাবানে হাতটা ভালো করে ধুতে ধুতে নিত্যহরিবাবু বললেন, গত জন্মে নিশ্চয় হাজার হাজার ধোপার লাখ লাখ কাপড় আমি চুরি করেছিলাম।
নিত্যহরিবাবু আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, এই হোটেলের স্ট্যাটিসটিকস জানেন? বলুন তো কটা বালিশ আছে?
আমি বললাম, আমি কী করে জানব?
উনি ফিস্ফিস্ করে বললেন, সাড়ে নশ। আগে হাজারটা ছিল। পঞ্চাশটা ছিড়ে গিয়েছে। তার তুললাগুলো আমার ঘরের এক কোণে জমা হয়ে আছে। পাপ! আমার কানের কাছে এগিয়ে এসে নিত্যহরিবাবু মুখটা ভেংচে বললেন, হাজারটা পাপ!
নিত্যহরিবাবু যেন আমার মনের মধ্যে ক্রমশ গেঁথে বসছেন। নিজের অজ্ঞাতেই প্রশ্ন করে বসলাম, কেন? পিপ কেন?
আপনার বাবা কি আপনাকে লেখাপড়া শেখাননি? তিনি কি মাস্টারের মাইনে বাকি রাখতেন? নিত্যহরিবাবু আমাকে ধমক দিয়ে প্রশ্ন করলেন।
বললাম, মাইনে তিনি সময়মতো দিয়েছেন। তাঁর সাধ্যমতো কাউকে তিনি ফাঁকি দেননি।
তবে? আপনার মাস্টার তাহলে কী শিখিয়েছে আপনাকে? জানেন না, হোটেলে, সরাইখানায়, শুড়িখানায় প্রতিমুহূর্তে হাজার হাজার লাখ লাখ পাপ সৃষ্টি হচ্ছে?
এখানে হাজার হাজার লোক আসেন নিজের কাজে। তারা কী পাপ করছেন? আমি ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করলাম।
আলবত করছে। পাপ না করলে কাউকে কি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়? না, ঘরের বাইরে রাত কাটাতে হয়? নিত্যহরিবাবুর চোখ দুটো আবার জ্বলতে আরম্ভ করেছে। বললেন, কদ্দিন চাকরি করছেন?
এই দিনকতক হল। আমি উত্তর দিলাম।
বয়ে গিয়েছেন? ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন।
মানে?
রোজির সঙ্গে আলাপ হয়েছে? নিত্যহরিবাবু নিজের প্রশ্নটি সরল ভাষায় উত্থাপন করলেন।
চিনি, কিন্তু তেমন কোনো পরিচয় নেই।
ও ছুঁড়িও আমার কাছে একবার একস্ট্রা বালিশ চেয়েছিল। আমি স্রেফ না বলে দিয়েছিলাম। তারপর ভাবলাম, আমি না বলার কে? যে বালিশ চাইবে, তাকে বালিশ দাও। যত খুশি চাইবে, ততো দাও। আমার কী? আমি নিজে হাতে করে ওর ঘরে বালিশ দিয়ে এসেছিলাম। তা ছুঁড়ি পরের দিন ভোরবেলাতে বালিশ দুটো ফেরত দিয়েছিল।
দুটো লোককে আপনাদের বুঝলাম না। আপনাদের সত্যসুন্দর বোস। একবার ভুল করেও একস্ট্রা বালিশ চাইল না। আর মার্কো সায়েব। রসিক লোক মাল টেনে টইটম্বুর হয়ে থাকেন। কিন্তু ওই পর্যন্ত—কোনোদিন বাড়তি বালিশ নিলে না। মেয়েমানুষ যেন বাঘ।
